শেয়ার কেলেঙ্কারির নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকল

0
79
Print Friendly, PDF & Email

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির নায়কদের বিচারের আওতায় আনার কোনো পদক্ষেপ নেই। তারা এখনো রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুঁজিবাজার কারসাজিতে জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তির সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিলেও ওই রিপোর্ট পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিও এ ব্যাপারে কখনো সোচ্চার ছিল না। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্বস্তি রয়েই গেছে। এর জেরে এখনো চাঙ্গা হচ্ছে না শেয়ারবাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারসাজির নায়কদের বিচারের আওতায় না আনলে শেয়ারবাজার চাঙ্গা হবে না।

১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ কারসাজির ঘটনা ঘটে শেয়ারবাজারে। ২০১০ সালে শেয়ার কেলেঙ্কারির পর বিগত মহাজোট সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহীম খালেদকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি পুঁজিবাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করে তাদের শেয়ারবাজার থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে কারসাজিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থারও সুপারিশ করা হয়। তবে যাদের পুঁজিবাজার থেকে দূরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তাদেরই কেউ কেউ এখন নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় কেলেঙ্কারির নায়করা আবারও পুরনো খেলায় মেতে উঠেছেন। ফলে বাজার স্বাভাবিক গতি পাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ সালের নভেম্বরে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় বাজার থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল সিন্ডিকেট। তারা এখনো বাজার প্রভাবিত করছেন। খলনায়কদের বিচার না হওয়ায় কারসাজির তিন বছর পরও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটেনি। শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালনে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন (এসইসি) পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল বলে মনে করে তদন্ত কমিটি। এমনকি কারসাজির নায়কদের প্রভাব ঠেকাতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তাও বাস্তবায়ন করেনি সরকার। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করে বিএসইসি। ওই মামলা এখন ফাইলবন্দী অবস্থায় রয়েছে। ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে করা মামলারও কোনো অগ্রগতি নেই। ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর দৃশ্যমান বেশকিছু পদক্ষেপ নেয় সরকার। বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি, কর্মকর্তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে ব্যতিক্রম থাকল শুধু শেয়ারবাজার। শেয়ারবাজারে ভয়াবহ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো কিছুই চোখে পড়েনি। এদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলন সংগ্রাম করলেও শেয়ারবাজারে এত বড় কারসাজির কোনো প্রতিবাদ করেনি। কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে কখনই সোচ্চার ছিল না দলটি। দলটি সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির কথা তুলে ধরলেও শেয়ার কেলেঙ্কারির খলনায়কদের বিষয়ে নীরব। ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের কারসাজির ঘটনা ঘটে। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারই ১৫টি মামলা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। পরে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এসব খলনায়কের বিরুদ্ধে।

পুঁজিবাজার কারসাজি মামলার সর্বশেষ অবস্থা : গত বছরের শেষ দিকে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন বিএসইসি থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে দায়ের করা ১৫টি মামলার মধ্যে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ৭টির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। একটি মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন। আরেকটি আপিল বিভাগ থেকে ১২ জানুয়ারি, ২০০৪ সালে কমিশনের অনুকূলে রায় পাওয়া যায় এবং আরও পাঁচটি মামলা হাইকোর্ট কর্তৃক খারিজ হয়। তবে ৩০ এপ্রিল, ২০১৩ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর নথি বিচারিক আদালতে পৌঁছায়নি বলে বিএসইসির প্রতিবেদনে জানানো হয়। ১৯৯৬-৯৭ মেয়াদে দায়ের করা অন্য একটি মামলা আসামির মৃত্যুর কারণে ৩০ মার্চ, ২০১১ সালে বিচারিক আদালত নিষ্পত্তি করলেও উচ্চ আদালতে এ-সংক্রান্ত কোনো আবেদন পেঁৗছায়নি বলে জানায় বিএসইসি। এ ছাড়া পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে ২০১১ সালে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে দুটির কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে বলেও অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে ওই সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, ১৯৯৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কোনো শেয়ার কেলেঙ্কারি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এর কারণ হচ্ছে বিচারিক আদালতে মামলার আধিক্য, বিচারকস্বল্পতা, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কিংবা হাইকোর্ট বিভাগে পৃথক বেঞ্চ না থাকা এবং বিচারিক আদালতের বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে আসামি পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একাধিকবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশের কারণে পুঁজিবাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে ২০১০ সালে গঠিত শেয়ারবাজার কারসাজি তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বাংলাদেশ প্রতিদিন বলেন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সময় যারা বাজারে প্রভাব বিস্তার করতেন অর্থাৎ মার্কেট প্লেয়াররা এখনো মার্কেটে রোল প্লে করছেন। বাজার এখনো তাদেরই দখলে। আমার রিপোর্টের সুপারিশগুলোর কিছু বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হলেও অভিযুক্ত মূল হোতাদের বিচারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। শেয়ারবাজারে যেসব অনিয়মের ক্ষেত্র রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অমনিবাস অ্যাকাউন্ট অন্যতম। সরকার অবশ্য সেগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া দরকার ছিল।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়- নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি, ফলে বাজারও চাঙ্গা হচ্ছে না, তবুও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনতে সরকারের করণীয় কী আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের জরুরি ভিত্তিতে ও তড়িৎ গতিতে বিচার শুরু করা উচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় দেশে আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার কারণে সুশাসন আমরা দেখতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতের জন্য তা বড় ধরনের খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে

শেয়ার করুন