৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিক হলেও অস্বাভাবিক : ডানকান

0
46
Print Friendly, PDF & Email

একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ অপরিহার্য। সহিংসতা এবং ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে গণতন্ত্র হয় না। গত ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন সাংবিধানিক হলেও অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সফররত বৃটিশ উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ্যালান ডানকান। সেই সাথে তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যাবশ্যকীয়। গতকাল বিকেলে বৃটিশ হাইকমিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডানক্না একথা বলেন। এসময় তার সঙ্গে বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট গিবসন এবং ডিএফআইডি’র বাংলাদেশ প্রধান সারাহ কুক উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই ডানকান বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনা বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এ দেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কারখানার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। ইউকে এইডের অর্থায়নে ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নেরও ঘোষণা দেন তিনি। এগুলো হলো: পোশাক শ্রমিক, মালিক ও ক্রেতাদের সবাইকে নিয়ে কারখানার কর্ম পরিবেশের মান উন্নয়নে এবং অগ্নি নিরাপত্তার জন্য কাজ করা,  কারখানার কাজের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করা।
তিনি বলেন, আমি আশা করি সরকার উপজেলা নির্বাচন শেষে দেশের পোশাক শিল্পের উন্নয়নের জন্য দৃষ্টি দিবে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পোশাক খাত এ দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়নে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। এ খাতে যারা কাজ করে তাদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নারী। এটি দেশের ২৫ মিলিয়ন লোককে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে এখাত।
ডানকান বলেন, এমডিজি’র লক্ষ্য বাস্তবায়নের পরও বৃটেন সবসময় বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তা করবে। কারণ বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ৫ লাখ মানুষ বৃটেনে বসবাস করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে এ্যালান ডানকান বলেন, বিগত সংসদ নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক গোলযোগে এদেশে প্রায় ৫ শ’ মানুষ নিহত হয়েছে। কোন গণতান্ত্রিক সমাজে এটা হতে পারে না। এখানে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত। বিগত কয়েক বছরে গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকা- বেড়েছে। এরকম বিচারবর্হিভূত হত্যাকা- ও গুম কখনোই সমর্থন যোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারীর ওই নির্বাচন ছিল আশ্চর্য ধরনের একটি নির্বাচন। যাতে দেশের অধিকাংশ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। এমনকি ঐ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে বিরোধীদল তৈরী হয়েছে তাও অস্বাভাবিক। তবে এগুলো অস্বাভাবিক হলেও সাংবিধানিক।
এ সময় ‘জিয়াউর রহমান দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট’ তারেক রহমানের দেয়া এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎকালে তিনি কোন মন্তব্য করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা বাংলাদেশের বিষয়। এখানকার ইতিহাসের বিষয়। এ ব্যাপারে আমার চেয়ে আপনারাই ভাল জানেন। এ নিয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই।
তারেক রহমানকে ফেরত পাঠানো হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের বিষয়ে বলাটা আমাদের পলিসি নয়। কোন দেশের সাথে এক্সট্রাডিশন চুক্তি থাকলে সে হিসেবে আমাদের আদালত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে ডানকান বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে ব্যালটবাক্স পূর্ণ হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে। উপজেলা নির্বাচনে যে প্রাণহানি ও অনিয়ম দেখেছি তা প্রকৃতপক্ষেই উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের রাজনীতির পদ্ধতি এ দেশের জনগণকেই ঠিক করতে হবে জানিয়ে ডানকান বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, একটি সুষ্ঠু সমাধানের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হওয়া উচিত। দেশের একটি বড় পক্ষ সমঝোতার অভাবে নির্বাচন বর্জন করলে তাতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশের অতিথি। তাই কোন ফর্মুলা বাতলে দেয়া আমার কাজ নয়। তবে বৃটেন কোনভাবেই সহিংসতাকে সমর্থন করে না। আমরা এদেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র চাই। তবে অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি অন্যতম বিষয়।
বৃটেনের নাগরিক বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত চৌধুরী মঈনুদ্দিনকে এদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তর করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৃটেন মনে করে এ ধরনের যে কোন বিচার প্রক্রিয়া হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী এবং স্বচ্ছ। এ বিষয়টি অবশ্যই আমাদের প্রথম বিবেচ্য। তাছাড়া বৃটেন যে কোন অপরাধের জন্য সবসময় মৃত্যুদ-ের বিরোধী। সুতরাং এসব বিষয় বিবেচনা করেই আমাদের সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এসময় ক্রিমিয়া ইস্যুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভোটাভুটির বিষয়ে বাংলাদেশের ভূমিকায় বৃটেনের ধন্যবাদ জানানোর কারণ জানতে চাইলে বৃটিশ রাষ্ট্রদূত রবার্ট গিবসন বলেন, ক্রিমিয়া ইস্যুতে প্রস্তাবের পক্ষে একশত ভোট পড়ে। বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থাকে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে আমরা ব্যাখ্যা পেয়েছি। তারা বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্র কৌশলের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ এ অবস্থান নিয়েছে। আমরা এতে সন্তুষ্ট এবং সেই সাথে এ ইস্যুতে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট না দেয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকায় আমরা সন্তুষ্ট।  
উল্লেখ্য, এ্যালান ডানকান তিনদিনের সফরে গত সোমবার বাংলাদেশে এসেছেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মহিত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া গতকাল তিনি সাভারে পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) তে চিকিৎসাধীন রানা প্লাজার আহত শ্রমিকদের দেখতে যান এবং রানা প্লাজা ধ্বংসস্থল পরিদর্শন করেন। সেই সাথে পুনর্বাসিত কয়েক শ্রমিকের অবস্থাও স্বচক্ষে দেখতে যান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম  খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

শেয়ার করুন