ধাপে ধাপে হেরেছে বিএনপি অনিয়মও বেড়েছে ক্রমান্বয়ে

0
67
Print Friendly, PDF & Email

উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে ধাপে ধাপে হেরে যাচ্ছে বিএনপি। প্রথম দুটি ধাপে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ভালো করলেও পরবর্তী তিনটি ধাপে ক্রমান্বয়েই খারাপ করেছেন। একইসঙ্গে ধাপে ধাপে বেড়েছে ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা। মোট ছয়টি ধাপে উপজেলা নির্বাচনের পরিকল্পনা নেয় কমিশন। ইতিমধ্যে পাঁচটি ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।

প্রথম ধাপে ৯৮টি উপজেলার নির্বাচন হয়। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থীসহ আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩৫টি আর বিএনপি ৪৪টি। বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে ৯টি চেয়ারম্যান পদ বেশি পায়। দ্বিতীয় ধাপেও বিএনপির সাফল্যের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন ছিল। এই ধাপে ১১৫টি উপজেলা চেয়ারম্যান পদের মধ্যে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি ৬টি চেয়ারম্যান পদ বেশি পেয়েছিল।

কিন্তু তৃতীয় ধাপ থেকে বিএনপি সাফল্য ধরে রাখতে পারছে না। তৃতীয় ধাপে ৮১টির মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ৪২টি আর বিএনপি ২৯টি। চতুর্থ ধাপেও আওয়ামী লীগের জয়ের ধারা অক্ষুণ্ন থাকে। ওই ধাপে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ ৩১টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদ বেশি পায়। বিএনপির শোচনীয় অবস্থা হয় পঞ্চম ধাপে এসে। এই ধাপে ৭৩টির মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ উপজেলায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয় ছিনিয়ে নেন। আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৫৪টি ও বিএনপি পায় মাত্র ১৩টি চেয়ারম্যান পদ।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ৪৮৭টির মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৫৮টির নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে চতুর্থ ধাপে সহিংসতা ও অনিয়মের কারণে কয়েকটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত থাকার কারণে তিনটি উপজেলার ফলাফল ঘোষণা বন্ধ রয়েছে। ৪৫৫টির ফলাফল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৩২, বিএনপি ১৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ৩৫টি এবং অন্যান্য ২৬ জন বিজয়ী হয়েছেন। বিজয়ীদের মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের হিসাব গণনায় নেয়া হয়েছে। বাকি ২৯টি উপজেলার মধ্যে ২১টির নির্বাচন আগামী ৩ মে করার পরিকল্পনা করেছে কমিশন।

ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথম ধাপে অধিকাংশ উপজেলায় উত্সবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় ধাপে সহিংসতা কিছুটা বাড়লেও নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির কিছু অভিযোগ উঠে। কিন্তু তৃতীয় ধাপ থেকে শুরু হয় কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের মহড়া। পঞ্চম ধাপে এসে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে আওয়ামী লীগ পিছিয়ে ছিল। এরপর ধাপে ধাপে সহিংসতা ও জাল ভোট বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে সরকারি দল-সমর্থিত প্রার্থীদের ‘সাফল্য’। কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতি রোধে অনেক স্থানেই নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী পুরো প্রশাসনই নিষ্ক্রিয় ছিল।

প্রথম ধাপে ৯৭টি উপজেলায় নির্বাচন হয়। এর মধ্যে ১৬টি উপজেলার ৬৫টি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দ্বিতীয় ধাপে ১১৫টি উপজেলায় নির্বাচন হলেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল প্রায় ১০০ কেন্দ্রে। মৃত্যু হয় একজনের। তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে মূলত সহিংসতা ও কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটে। তৃতীয় ধাপে তিনজন এবং চতুর্থ ধাপে নির্বাচনের দিন চারজন ও পরে আরো তিনজন মারা যায়।

পঞ্চম দফায় মোট কেন্দ্রের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। পঞ্চম ধাপে ভোটকেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারা, নির্বাচনের সরঞ্জাম ছিনতাই, এজেন্টদের বের করে দিয়ে ভোট জালিয়াতি, দুপুর গড়ানোর আগেই ভোটের বাক্স ভর্তি করে ফেলার ঘটনা আগের চেয়ে বেশি ঘটেছিল। পাঁচ হাজার ৪৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় এক হাজার ১০০ কেন্দ্রে এ ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ২৫টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন। মোট পাঁচ ধাপের নির্বাচনে নোয়াখালী সদরের ১১৭টিসহ ২৫৭টি কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে।

বিএনপি অভিযোগ করেছে যে, ভোট ডাকাতি ও কেন্দ্র দখল না হলে তারা দুই তৃতীয়াংশ উপজেলায় বিজয়ী হতো। তারা নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতকে দায়ী করেছে। এই কমিশনের অধীনে আর কোন নির্বাচনে অংশ নিবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে দলীয়ভাবে বিএনপি যতটা গোছালো ছিল পরবর্তী ধাপে তা তেমনভাবে ছিল না। বিশেষ করে পঞ্চম ধাপে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল বেশি। ৭৩ উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৩১ আর বিএনপির ৩৪ উপজেলায়। বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কার করে দেয়ার কারণে বিএনপির তৃণমূলে অস্বস্তিরতা ও হতাশা ছিল।

আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন, বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে আনতে পারার কারণেই তাদের সাফল্য বেশি এসেছে। তাছাড়াও প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে খারাপ ফলাফলের কারণে সাংগঠনিক তত্পরতা বৃদ্ধি করা হয়। জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান নেয়া হয়। তবে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংগঠনসমূহদের অভিমত হচ্ছে, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে উপজেলা নির্বাচন কলুষিত হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নষ্ট হয়েছে। এতে সরকারি দলের প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল।

এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এর জন্য নির্বাচন কমিশন একা দায়ী নয়। এ কমিশনের অধীনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। এবারের উপজেলা নির্বাচনে কমিশন কেন নিরপেক্ষ প্রশাসন পেল না বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হলো, তা সরকারকেই স্পষ্ট করা উচিত।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে এদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। নির্বাচনের ওপর ইসি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কমিশন এই পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক দলকে দায়ী করছে। অথচ ইসি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। আইনগত অনেক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা প্রয়োগ করেনি।’

উপজেলা নির্বাচনে কেন্দ্র দখল করে অবাধে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা স্বীকার করে এজন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়ী করেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের নির্দেশ মেনে কাজ করেননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমরা যাদের দিয়ে কাজ করিয়েছি তারা সঠিকভাবে কাজ করেননি। যে জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের যে নির্বাচন হয়েছে, তা খুব সুষ্ঠু হয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট হয়েছি- এ কথা বলা যাবে না।’

শেয়ার করুন