স্বপ্নলোকের কল্পযোগে বেগম জিয়ার রাজনীতি!

0
45
Print Friendly, PDF & Email

এমনটি যে হবে তা আমি ভাবতেই পারিনি। ফলে বিস্ময়ের ঘোর কাটানোর জন্য কিছুটা সময় নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকলাম, বেশ সুন্দর পরিপাটি এবং অভিজাত ড্রইং রুম। একটু পরে তিনি এলেন। এই প্রথম তাকে এত কাছ থেকে দেখলাম। সেদিন অবশ্য তিনি গোলাপি শাড়ি পরেননি। হলুদ এবং কমলা রং মেশানো একটি ইটালিয়ান শিপন শাড়ি পরে সোফায় বসলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বিনয়ী ভঙ্গিতে হাত নেড়ে সালাম দিলেন। আর আমি কিঞ্চিৎ দাঁড়ানোর চেষ্টা করে খানিকটা উচ্চৈঃস্বরে তার সালামের জবাব দিলাম।

বাংলাদেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং একাধিকবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আমাকে একান্তে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কথা বলার জন্য, উফ্! ভাবতেই যেন কেমন কেমন লাগছিল। তিনি সম্ভবত আমার মনের কথা বোঝার চেষ্টা করলেন। তারপর নিজেই বললেন, ইদানীং আপনি পত্র-পত্রিকায় লিখছেন। অনেকে আপনার লেখা পড়ছে, আর তাই কেন জানি মনে হলো আপনার সঙ্গে কিছু বিষয় আলাপ করি। আমি কোনো উত্তর না দিয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। মনে মনে ভাবলাম- ভদ্রমহিলা কেন এত নিশ্চুপ থাকেন। আবার মাঝে-মধ্যে নীরব থেকেই কীভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে তাকে নিয়ে এবং তার পরিবার নিয়ে তো তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এহেন আক্রমণ নেই যা করেনি! এহেন নোংরা কথা নেই যা বলেনি, অথচ তিনি নিশ্চুপ। কোনো দিন প্রতিক্রিয়া দেখাননি কিংবা প্রতিপক্ষকে বাজে কথা বলে আক্রমণ করেননি- কারণটা কী হতে পারে?

আমার মনের ভাব বুঝলেন কিনা জানি না। কিন্তু তিনি বলতে আরম্ভ করলেন, রাজনীতিতে আমার আগমন অনেকটা আকস্মিকভাবে। ১৯৪৫ সালে যখন আমার জন্ম হলো তখনো ব্রিটিশদের অধীন ভারত ছিল অবিভক্ত। শিলিগুড়ির একটি চা বাগানের বড় কর্তা ছিলেন আমার আব্বা। আমার চেয়ে ছয় বছরের বড় খুরশীদ জাহান, যাকে আপনারা চকলেট আপা বলেন তার সঙ্গে দিনাজপুর, শিলিগুড়ি এবং জলপাইগুড়ির নির্মল বাতাসে আমি শিশুকাল পেরিয়ে বালিকা হয়েছিলাম প্রকৃতির উদার স্পর্শে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯৬০ সালে আমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মর্যাদাপূর্ণ সামরিক পরিবেশে আমি বড় হতে থাকি। আমি যেমন জন্মের পর থেকে খারাপ পরিবেশ দেখিনি তেমনি আমার বিয়ের পরও খারাপ পরিবেশ পাইনি।

আমার স্বামী বয়সে আমার চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিলেন। তার চেয়ে বড় ছিল তার ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা এবং রুচিবোধ। এটা তিনি পেয়েছিলেন তার পিতা মনসুর রহমানের কাছে। আমার শ্বশুর ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের বড় কর্মকর্তা। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে রসায়নবিদ হিসেবে চাকরি করতেন। বাঙালিদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান কাগজ এবং কালি বিশেষজ্ঞ। পেশায় রসায়নবিদ হলেও তিনি বলতে গেলে রসকষহীন গুরু-গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। নিজের ছেলে-মেয়েদেরও তিনি সেভাবে মানুষ করেছিলেন। ফলে আমি যেমন বাবার বাড়িতে কঠোর পারিবারিক অনুশাসনে বেড়ে উঠেছি, তেমনি শ্বশুরবাড়িতে এসে আরও কঠোর অনুশাসনের মধ্যে পড়লাম।

আমার স্বামী কেবল একজন শিক্ষিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সন্তানই ছিলেন না, তিনি অসাধারণ মেধাবী এবং চৌকস ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। কলকাতার সবচেয়ে নামকরা প্রতিষ্ঠান হেয়ার স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। সেই ব্রিটিশ আমলে, তারপর কলেজ জীবন কাটান পাকিস্তানের সবচেয়ে সেরা প্রতিষ্ঠান, করাচির ডি. জে. কলেজে। তারপর ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমিশন অফিসার হিসেবে যোগদান করেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। ১৯৫৫ সালে তিনি সেরা দশে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ১২তম পিএমএ ক্যাডেট হিসেবে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। পুরো পূর্ববঙ্গে তখন হাতেগোনা ২-৪ জন অফিসার ছিলেন, যারা কিনা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন অফিসার হিসেবে চাকরি লাভের সুযোগ পেয়েছিল। ফলে সারা পাকিস্তানের বাঙালি সমাজে আমার স্বামীর নামডাক ছড়িয়ে পড়েছিল একজন মেধাবী, চৌকস এবং দক্ষ সামরিক কর্তা হিসেবে।

আমার স্বামী নিজে যেরূপ কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে চলতেন তেমনি আমাদেরও বাধ্য করতেন তার আদর্শ অনুসরণ করার জন্য। ফলে পিতার অধীন থেকে যেমন বেয়াদপি শিখিনি তেমনি স্বামীর সংসারেও ওসব করার সুযোগ ছিল না। আমার বিয়ে হয়েছিল ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে। আমার শ্বশুরের ইচ্ছা ছিল ঢাকার একমাত্র পাঁচতারা হোটেলে আমাদের বিবাহ-উত্তর সংবর্ধনার আয়োজন করবেন। কিন্তু হঠাৎ করেই আমার শাশুড়ি করাচিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। ফলে পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬১ সালে ঢাকার শাহবাগ হোটেলে আমাদের বিবাহ-উত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচতারা হোটেলে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করার মতো আর্থিক সঙ্গতি এবং রুচি তৎকালীন সময়ে সারা পূর্ববঙ্গে হাতেগোনা কয়েকটি পরিবারেরই মাত্র ছিল।

দেশের প্রচলিত কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার এবং অশালীন আচরণ করার মতো কোনো শিক্ষা এবং পরিবেশ আমি আমার সুদীর্ঘ ৭০ বছরের জীবনে পাইনি। ফলে চুপচাপ থাকি, আর আল্লাহর কাছে নালিশ করি। অনেকক্ষণ ধরে নিজের কথা বলতে বলতে বেগম জিয়া কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। খেয়াল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন- চা না কফি? আমি বললাম কফি! ব্লাক কফি। কিন্তু ইতোমধ্যেই বেশ কিছু নাশতা এবং কফি চলে এলো। এ বাড়ির লোকজন হয়তো আমাকে গুরুত্বপূর্ণ কেউ ভেবে এসবের আয়োজন করেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। আমার পেট বেশ ভরা ছিল, তাই অন্য কোনো কিছু না নিয়ে আমি কফির মগ তুলে নিলাম এবং গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে তাকালাম। তিনি স্মিত হাস্যে বললেন আপনি বরং কিছু প্রশ্ন করুন যাতে করে আমি জবাব দিতে পারি এবং যা নিয়ে আপনি ইচ্ছা করলে কিছু লিখতেও পারেন। আমার একটা মারাত্দক বদ অভ্যাস, আশকারা পেলে অনেক সময় সীমা অতিক্রম করে বসি। এমন সব প্রশ্ন করে বসি যা কিনা আপাতদৃষ্টিতে শ্রুতিকটু বলে মনে হবে। এক্ষেত্রেও তাই হলো। আমি ফটাফট জিজ্ঞাসা করলাম ৩টি প্রশ্ন- আপনাকে কেন লোকজন ভাবী বা আপা না বলে ম্যাডাম বলে? জামায়াতকে ছাড়ছেন না কেন? ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে গেলেন না কেন?

আমার কথা শুনে মুচকি হাসলেন তিনি। তারপর বললেন, সব বলব, একে একে সবকিছুই বলব। শুনতে শুনতে আপনি যদি প্রয়োজন মনে করেন তবে আরও এক কাপ কফি নিয়ে নিতে পারেন। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালাম। তিনি বললেন, চা বাগানে সাধারণত শত শত কুলি-মজুর কাজ করে। বিলেতি সাহেবদের কড়াকড়ি ও নিয়মকানুনের জন্য এসব কুলি-মজুর এবং তাদের ছেলেমেয়েসহ পরিবার-পরিজন বংশানুক্রমে বাগানের মালিক, ম্যানেজার এবং তাদের সন্তান-সন্ততিকে দেবদেবীর মতো পূজা করত- পূজা মানে ভক্তি-শ্রদ্ধা এই আর কি। বাগানের নিয়মানুসারে সাধারণ ছেলেমেয়েরা আমাদের বাংলোর ধারেকাছে আসত না। আর আমরাও ওদের কলোনিতে যেতাম না। ফলে বিশাল বাগানের অসীম শূন্যতা আর নীরবতার মধ্যে আমার শৈশবকাল কাটত একদম চুপচাপ বসে থেকে। দিনের পর দিন নীরব পরিবেশে চুপচাপ থাকতে থাকতে আমি কখন যে নিজেই চুপচাপ হয়ে গেছি তা টেরই পাইনি।

অন্যদিকে গ্রাম্য বালক-বালিকারা বিশেষ করে খাল-বিল-ঝিল বা নদীপাড়ের বাসিন্দারা সারা দিন হৈ-হুল্লোড় করে বেড়ায়। কারও যদি পিতা-মাতার শাসন না থাকে কিংবা পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে সেক্ষেত্রে সেসব বালক-বালিকারা হয় প্রচণ্ড ডানপিটে, হিংস্র, নিষ্ঠুর এবং ঝগড়াটে প্রকৃতির। এসব লোক বড় হলে না পারে এমন কোনো কর্ম নেই। তাদের পক্ষে চোখ উল্টানো, কথা দিয়ে কথা না রাখা কিংবা হিংস্র হয়ে ওঠা কোনো ব্যাপারই নয়। আমার শৈশবকালটি নিতান্ত গৎবাঁধা প্রকৃতির হওয়ার কারণে সমাজ সংসারের কূটকৌশল ও হানাহানি আমাকে স্পর্শ করেনি। ফলে অকারণ বাচালতা কিংবা কারও সঙ্গে উপযাচক হয়ে ভাব করার মতো অভ্যাস গড়ে উঠেনি।

আমার চরিত্রের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি অর্জিত হয়েছে স্বামীর চাকরির সুবাদে। আমার বিয়ের কিছুকাল পরই তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। তৎকালীন সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর মানে অনেক কিছু। বাঙালিরা একজন সাধারণ হাবিলদার, জমাদ্দার বা দারোগা দেখলে ফিট পড়ত। অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা সর্বোচ্চ ডিসি, এসপির সঙ্গে ভাব রাখতেন। যেখানে সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর ও বাইরে বেশির ভাগ লোকজন তাকে স্যার এবং আমাকে ম্যাডাম ডাকতেন। এরপর তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হলেন। রাষ্ট্রপতি হলেন- আর লোকজন বিশ বছর ধরে আমাকে ম্যাডাম ডাকতে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল। তার সহকর্মীদের ২-৪ জন অবশ্য ভাবী বলতেন। কিন্তু চাকরি জীবনে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যখন শীর্ষ পদে আসীন হলেন তখন তার সহকর্মীরাও তাকে স্যার এবং আমাকে ম্যাডাম সম্বোধন করা শুরু করল। সারা দুনিয়ার সেনাবাহিনীতে এটাই নিয়ম এবং এটাই প্রথা। ফলে আমি যখন রাজনীতিতে এলাম তখন লোকজন দীর্ঘদিনের প্রথা, অভ্যাস এবং পদ্ধতি এড়িয়ে আমাকে ভাবী বা আপা সম্বোধন করতে পারল না।

এবার তিনি জামায়াত প্রসঙ্গে এলেন এবং খানিকটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- জামায়াত নিয়ে সব আলোচনা ও সমালোচনার মূলে রয়েছে এ দেশের নীতিহীন রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের সীমাহীন লোভ-লালসা এবং দূরদর্শিতার অভাব। এ দেশে একশ্রেণীর লোক রয়েছে যারা কখনো ১৯৭৪-৭৫ সালের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা না করেই অন্ধভাবে কুৎসা রটনা করে। তদ্রূপ ১৯৭৬-৭৭ সালের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা না করেই যাচ্ছেতাই বলে। বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নে সব দলকে, সব মতকে এবং পত্র-পত্রিকাকে গণতন্ত্রের পথে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তারই প্রেক্ষাপটে জামায়াত রাজনীতিতে সুযোগ পায়। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, তৎকালীন দেশি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় জামায়াত রাষ্ট্রশক্তির আনুকূল্য লাভ করেছিল। কিন্তু সেটা সম্ভবত ৬-৭ মাসের জন্য। প্রেসিডেন্ট জিয়া যখন ক্ষমতার বলয়ে দেশে-বিদেশে একটি স্থান করে ফেললেন তখন থেকেই জামায়াতকে মদদ দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বরং জামায়াতবিরোধী শক্তিশালী একটি গ্রুপ মাওলানা মান্নানের নেতৃত্বে সর্বদা জামায়াতকে স্তব্ধ করার জন্য সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পেত গোপনে এবং প্রকাশ্যে।

জামায়াত মূলত রাজনীতিতে স্থান লাভ করে এরশাদ আমলে- কখনো সরকারি মদদে আবার কখনো রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯৯১ সালে বিএনপি যখন সরকার গঠন করে তখন পর্যন্ত জামায়াত স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির সঙ্গে দহরম মহরম চালিয়ে যাচ্ছিল। বিএনপির ডানপন্থি একটি গ্রুপ দলকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে থাকে জামায়াতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য। কারণ হিসেবে তারা যুক্তি দাঁড় করায়- প্রতিপক্ষ জামায়াতকে তাদের ঘরে তোলার জন্য তড়িঘড়ি শুরু করেছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে বিএনপির প্রতিপক্ষদের ঘন ঘন বৈঠক এবং নানামুখী তৎপরতার কথা উঠে আসে। এ অবস্থায় আমাদের দলও চেষ্টা করে তাদের সঙ্গে একটি যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য। এ সময় বিএনপি সরকার সদ্য ক্ষমতাচ্যুত এরশাদ এবং তার দল সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বিরোধী দল যে রাজনৈতিক চাল চালল তাতে আমরা জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলাম।

বিরোধী দল জোর দাবি তুলল- জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম আযমকে জেলে নিতে হবে। অন্যদিকে এরশাদকেও গুলশানের একটি বাড়িতে না রেখে কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ কয়েদিদের মতো রাখতে হবে। দুটোই জনপ্রিয় দাবি। সরকার স্পষ্ট বুঝতে পারছিল তারা বিরোধী দলের চক্রান্তের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে কিন্তু করার কিছুই ছিল না। আমরা গোলাম আযম ও এরশাদকে বন্দী করলাম। অন্যদিকে বিরোধী দল জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে যোগসাজশে সম্মিলিতভাবে সরকার বিরোধিতায় নেমে গেল আদাজল খেয়ে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত এবং পতিত স্বৈরাচারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার ফল পেলাম ১৯৯৬ সালে এবং হাড়ে হাড়ে টের পেলাম নীতিহীন রাজনীতির নির্মম পরিণতির সঙ্গে।

এদেশের রাজনীতিতে যে যত নীতি কথাই বলুক না কেন, নিজস্ব প্রয়োজনে কেউ কখনো নীতির ধার ধারেনি। সারা জীবন যে কথা বলে রাজনীতি করেছে, ক্ষমতায় গিয়ে সেসব কথা না রাখা কিংবা সেসব কথার উল্টো কাজ করার অসংখ্য উদাহরণে এদেশবাসী অভ্যস্ত। ১৯৯৬ সালের পর আমরা সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের সমর্থন লাভের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু তৎকালীন সরকারের কারণে সুযোগ আমাদের কাছে চলে এলো। জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ল। আর বিরোধী দল তো সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল।

এরপর বহুদিন চলে গেল, বহু কাহিনী রচিত হলো। পর্দার এপাশে আর ওপাশে বহু দৃশ্য অভিনীত হলো- সব কথা বলা যাবে না, বলা ঠিকও হবে না। বাস্তবতা হলো জামায়াত বিএনপির সঙ্গে আর জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গে আছে। বাংলাদেশের কেউ কি গ্যারান্টি দিতে পারবে যে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করলে অন্য কেউ আর জামায়াতের সঙ্গ লাভ করবে না? কিংবা এই দেশে এমন মহান কেউ কি আছেন যার ডাকে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য হয়ে একটি দলিলে স্বাক্ষর করতে পারে, ‘আমরা সবাই জামায়াতকে সারা জীবনের জন্য পরিত্যাগ করলাম!’ আর যদি সেই রকম হয় তাহলে বিএনপির পক্ষে শুধু জামায়াত নয়, জাতীয় পার্টিকেও পরিত্যাগ করা সম্ভব।

কথাবার্তার একপর্যায়ে আমার সত্যিই কফির তৃষ্ণা পেল। তিনি আমার মানসিক অবস্থা বুঝলেন এবং বেল টিপে গরম কফির অর্ডার দিয়ে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে বলা শুরু করলেন- আমি নিশ্চিত আওয়ামী লীগ এক সময় এই নির্বাচন নিয়ে যখন ভাবতে শুরু করবে তখন দেখবে তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে। ‘৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, বাসন্তির পরনে জাল, ৪র্থ সংশোধনী, রক্ষীবাহিনী, বাকশাল, ভারতের দালালি, স্বৈরাচারের সঙ্গী, যত বদনাম এতকাল আমরা করেছি দলটির বিরুদ্ধে তা সবই ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে এই নির্বাচনের মাধ্যমে। এদেশের মাটিতে একেকটি ঘটনা এবং দুর্ঘটনার মাধ্যমে একেকটি রাজনৈতিক দলের পতন হয়েছে। আওয়ামী লীগের যদি কখনো পতন হয় সে ক্ষেত্রে শুরুটা হলো এই নির্বাচনের মাধ্যমে।

আমি যতটা আওয়ামী লীগের কথা ভাবছি, তার চেয়ে বেশি ভাবছি নিজ দলের কথা। আমাদের আসলে কি কি লাভ হলো, অনেক কথাই বলা যাবে। তবে আসল ঘটনা হলো, বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইত তবে নির্বাচন বানচাল হয়ে যেত এবং ভিন্ন মাত্রার ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে পারত- এমন আশঙ্কা থেকে যখন আমরা নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিই তখন থেকেই মূলত সরকার প্রকৃতির বিচারে একের পর এক ফাঁদে আটকা পড়েছে। আমরা পুরো দুনিয়াকে বুঝাতে পেরেছি দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন সম্ভয় নয়। আমার দলের লোকেরা আগে আমাকে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বলত, আর আওয়ামী লীগ ঠাট্টা মশকরা করত। নির্বাচনের পর আমরা এখন আর অতীতের সেই ঘটনা নিয়ে কারও ঠাট্টা মশকরার পাত্র হই না। আমাদের স্থান দখল করেছে সরকার। সারা বিশ্ব তাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছে।

বর্তমান সময়টা আমাদের দলের দুর্বল ইমানের লোকদের জন্য ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু আমি জানি, মানুষের ভালোবাসা, আস্থা, বিশ্বাস এবং সহযোগিতা ছাড়া কোনো শাসক কোনো দিন টিকতে পারেনি। বিগত নির্বাচনের মাধ্যমে এদেশের শান্তিকামী ভোটারগণ চরমভাবে অপমানিত বোধ করেছেন। তাদের মর্যাদায় আঘাত লেগে গেছে, তাদের মন ভেঙে গেছে। পৃথিবীর সব কিছু জোড়া লাগলেও ভাঙা মন কোনো দিন জোড়া লাগেনি। ফলে লক্ষ-কোটি ভাঙা মনের অগুনিত দীর্ঘশ্বাস যদি কারও ওপর পড়ে তবে সে প্রাকৃতিক নিয়মেই নিজের ভারসাম্য হারিয়ে একের পর এক ভুল করবে আর অস্থিরতায় ভুগবে এবং অস্থিরতম সময়ে যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। তিনি হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু এসময় হঠাৎ করেই আমার ফোনটি বেজে উঠল। কিছুটা বিব্রত বোধ করে আমি তার অনুমতি নিয়ে ফোনকল রিসিভ করতে গিয়ে ধপাস করে আমার ছোট্ট বিছানা থেকে পড়ে গেলাম! একি! আমি তো অফিসে! অভ্যাসমতো দিবানিদ্রায় ঢলে পড়ে কি সব দেখলাম! সম্বিত ফিরে এলে বুঝলাম- অন্যান্য দিন দুপুরে ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোনটির সুইচ অফ করে রাখি। কিন্তু আজ ভুলক্রমে তা করা হয়নি। ফলে অসময়ে রিং টোনের শব্দে আমার অদ্ভুত স্বপ্নযোগের সমাপ্তি হলো!

শেয়ার করুন