উপজেলা নির্বাচনও প্রমাণ করলো আ’লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’

0
54
Print Friendly, PDF & Email

আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে খুব একটা আশা না থাকলেও বেশি আশাবাদীরা ধারণা করেছিলেন, পরপর চার দফায় ভোট ডাকাতি ও ভোটকেন্দ্র দখলসহ সম্ভাব্য সকল উপায়ে বিরোধী দলের বিজয় ছিনিয়ে নিলেও দেশে-বিদেশে প্রবল নিন্দা-সমালোচনার মুখে উপজেলা নির্বাচনের শেষ দফায় ক্ষমতাসীনরা ‘ক্ষ্যান্ত’ দেবেন। তাদের আশার গুড়েই বালু ছিটিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। এজন্যই সর্বশেষ ৭৩ উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পরদিন, গতকাল ‘পিসফুল’, ‘প্রতিরোধহীন শান্তিপূর্ণ ভোট ডাকাতি’, ‘ব্যাপক সহিংসতা ও জবরদখল’, ‘দখল উৎসবে ভোট বর্জন’ এবং ‘আওয়ামী সন্ত্রাসীদের তা-ব’ ধরনের শিরোনামে প্রধান খবর প্রকাশিত হয়েছে দেশের সংবাদপত্রগুলোতে। সবচেয়ে নিরীহ শিরোনাম যে দৈনিকটি দিয়েছে সেটাও না লিখে পারেনি যে, ‘শেষটাও ভালো হলো না’। ভালো হবেই বা কিভাবে? কারণ, এদেশেরই এক প্রবাদে বলা হয়েছে, কোনো কাজের শুরুটা ভালো না হলে শেষটাও ভালো হয় না। হতে পারে না। উপজেলা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রবাদটি শতভাগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আসলেও শেষটা অর্থাৎ ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত ৭৩ উপজেলার নির্বাচনে সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতি সকল সীমা অতিক্রম করেছে সরকার। গণতন্ত্রসম্মত আচরণ বা কর্মকা-ের ধারেকাছেই থাকেননি ক্ষমতাসীনরা। সিংহভাগ উপজেলায় শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়ম, কেন্দ্রের পর কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই এবং বিএনপি-জামায়াতসহ ১৯ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী এজেন্টদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়ার মতো ভয়ংকর কর্মকা- না ঘটেছে। শুধু শুরু থেকেই বা বলা কেন, অনেক এলাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে সিল শুরু তো হয়েছিল আগের রাত থেকেও। রাতভর ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছে আওয়ামী লীগের লোকজন। দিনে তারা ভোটকেন্দ্রে ভোটার আসতে দেয়নি। এ ব্যাপারে মজার হেডিং এসেছে পত্রিকায়। যেমন ‘শুরুর আগেই ভোট শেষ’,‘রাতেই কেন্দ্র দখল করে ভোট’, ‘ভোটার তাড়াল পুলিশ’ ইত্যাদি। নির্বাচনের দিনও প্রকাশ্যে হাজার হাজার জালভোট দিয়েছে তারা। এ প্রসঙ্গে চমকে ওঠার মতো অন্য একটি তথ্য হলো, আওয়ামী লীগের লোকজনই শুধু নয়, লক্ষ্মীপুরের মতো কোনো কোনো এলাকায় নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অনেককেও সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে সিল মারতে দেখা গেছে। এ ধরনের ছবি প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোসহ কয়েকটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায়। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতেও জালভোট দেয়ার দৃশ্য দেখানো হয়েছে নির্বাচনের দিন Ñ এমনকি ভোটগ্রহণ চলাকালেই। টিভি চ্যানেলগুলোতে অনেক ব্যালট বইও দেখানো হয়েছে Ñ যেগুলোর কোনো একটির মুড়িতেই নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর ছিল না। এসব মুড়িতে ভোটারের স্বাক্ষর বা টিপসইও দেখা যায়নি। আওয়ামী সন্ত্রাসের মুখে অসহায় হয়ে পড়া নির্বাচনী কর্মকর্তারা খোলামেলা ভাষাতেই সবকিছু স্বীকার করেছেন। সাংবাদিকদের বলেছেন, আপনারা তো সবই দেখতে পাচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই ভোট ডাকাতিতে সরকারি দলের সহযোগী হয়েছেন বা হতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে মোতায়েনকৃত সেনাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে না দেয়ায় তারা কোনো কাজেই আসেনি। টিভি ক্যামেরার সামনেও ধরা পড়ে গেছে অনেক আওয়ামী সন্ত্রাসী ও ভোট ডাকাত। কারো হাতে, কারো আবার পকেটে দেখা গেছে অসংখ্য ব্যালট বই। তাদের কাউকে এমনকি সামান্য লজ্জিত হতেও দেখা যায়নি। দিব্যি বুক ফুলিয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছে তারা। জাল ভোট দেয়া ও কেন্দ্র দখল করাসহ সন্ত্রাসী কর্মকা-েও রেকর্ড করেছে আওয়ামী লীগের লোকজন। বহু কেন্দ্রে মিনিটে ছয় থেকে দশটি পর্যন্ত ভোট দিয়েছে তারা। কোনো কোনো উপজেলায় এত দ্রুত জাল ভোট দেয়া হয়েছে যে, সকাল দশটা-এগারোটার মধ্যেই ব্যালটের সব বই শেষ হয়ে গেছে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ৩৫ কেন্দ্রে তো আগের রাতেই ভোট দেয়ার কাজ-কারবার চুকিয়ে ফেলেিেছল আওয়ামী কীর্তিমানেরা। বাকি ৬৪ কেন্দ্র থেকেও  বিরোধী দলের সমর্থিত  প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের ঘাড়ে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে ১০ জন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় একই রকমের ঘটনা ঘটেছে আরো বহু এলাকায়। প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ফেনীর ছাগলনাইয়ার মতো বহু উপজেলায় দিনের বেলায় কষ্ট এড়াতে রাতেই ব্যালট পোপারে সিল মেরে তৈরি রাখা হয়েছে। দিনের শুরুতে সেগুলো কেবল গুছিয়ে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়েছে আওয়ামী লীগের লোকজন। এভাবে সব মিলিয়েই ৩১ মার্চের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অবৈধ দখল ও রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। ফলাফলও তারা নিজেদের ইচ্ছামতোই বানিয়ে ছেড়েছেন। ৭৩ উপজেলার ৪৮টিতেই চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন! বিএনপিকে মাত্র ১২টি আসন দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে এবং জামায়াতে ইসলামীকে তিনটি আসনসহ তৃতীয় স্থানে ঠেলে পাঠনো হয়েছে। এর প্রতিবাদে ২১টি উপজেলায় নির্বাচন বর্জন করেছে ১৯ দলীয় জোট। কয়েকটি উপজেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালও ডেকেছে তারা।

ঘটনাপ্রবাহে বেশি আপত্তি উঠেছে নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকর্তাদের ন্যক্কারজনক কার্যক্রমের কারণে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সমর্থনে প্রকাশ্যেই ভূমিকা রেখেছেন তারা। অনেকে শত শত জাল ভোট পর্যন্ত দিয়েছেন। অনেকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ধাইয়ে বেড়িয়েছেন। পাশাপাশি ছিল র‌্যাব ও পুলিশসহ যৌথবাহিনী। নির্বাচনের দিন ও তার আগের দিন তো বটেই প্রকৃতপক্ষে বিরোধী দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছিল নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই। অধিকাংশ উপজেলাগুলোতে বিরোধী দলের প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচারণা ও তৎপরতা চালাতে পারেননি। তাদের প্রায় সকলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করানো হয়েছিল। বেশ কিছু প্রার্থীকে গ্রেফতারও করেছিল পুলিশ। অন্যরা পালিয়ে থেকেছেন। এতেও রেহাই মেলেনি তাদের। যৌথবাহিনী তাদের বাসাবাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সন্ত্রস্ত রেখেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী-ক্যাডাররাও হামলা চালিয়েছে। ফলে প্রার্থীরা তো বটেই, তাদের সমর্থক নেতা-কর্মীরাও নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেননি। তার ওপর আবার নির্বাচনের দিন কায়েম করা হয়েছিল ভয়াবহ ত্রাসের রাজত্ব। সব মিলিয়েই পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, সবচেয়ে নিরীহ দৈনিকটিকেও ‘নির্বাচনী জুলুমের ষোলকলা’ শিরোনামে পৃথক একটি খবরই প্রকাশ করতে হয়েছে। আসলেও জনগণ অবাধে ভোট দিতে পারেনি, বিরোধী দলের প্রার্থীরা বাধাহীনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাননি। কথাটার প্রমাণ দেয়ার জন্য ভোটার জনগণ তো বটেই, গণমাধ্যমের হাজার হাজার কর্মী ও সাংবাদিক এবং বেসরকারী টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার ফুটেজই যথেষ্ট। এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কেও বলা দরকার। কারণ, নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু, নিরেপেক্ষ এবং বাধাহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে মোটেও সততার প্রমাণ দেয়নি। জনগণকে স্তম্ভিত করে নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে ‘অবকাশ’ যাপনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি থাকলেই যে আহামরি ধরনের কিছু ঘটতো না তার প্রমাণ অবশ্য সংসদ নির্বাচনের সময়ই পাওয়া গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও ঠিক এ সময়ে তার বিদেশে চলে যাওয়া ছিল ক্ষমতাসীনদের জন্য সরাসরি একটি ‘ব্ল্যাংক চেক’ পাওয়ার মতো ব্যাপার। এ অবস্থার সুযোগে কমিশনের অন্য কর্তারাও সরকারের পক্ষে ‘আদা-জল খেয়ে’ কাজ করেছেন। এর প্রমাণ, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছেও লিখিত অভিযোগ পেশ করে দেখেছেন বিরোধী দলের প্রার্থীরা। কিন্তু অভিযোগেরই মীমাংসা করেনি কমিশন। দায়িত্ব যেখানে ছিল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে সরকারকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা এবং প্রভাব বিস্তার থেকে নিবৃত্ত রাখা, কমিশন সেখানে উল্টো ক্ষমতাসীন দলের জন্য ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীনদের অস্ত্রের প্রকাশ্য মহড়া এবং কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেয়ার মতো কর্মকা-ের পরিপ্রেক্ষিতেও সামান্য নড়াচাড়া করেনি কমিশন। এসবের পাশাপাশি বিশেষ করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কিছু বক্তব্যের উল্লেখ করা দরকার। তিনি ১৯ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে ‘নাকে খত দিয়ে’ নির্বাচনে অংশ নেয়ার মতো এমন কিছু কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত সিইসি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা শুধু মেরুদ-হীনই নন, ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহও। একই কারণে জনগণকেও বিশ্বাস করতে হয়েছে, এই কমিশনের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। কথাটা গত ১৯ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের পরই বলা হয়েছিল। ৩১ মার্চের সর্বশেষ দফার নির্বাচনেও একই চিত্র দেখা গেছে। জোর করে হারিয়ে দেয়া হয়েছে বিরোধী দলের প্রার্থীদের। আর সমগ্র এ কর্মকা-ে র‌্যাব পুলিশ ও প্রশাসনের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও ছিল সীমা ছাড়ানো। ফলে উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল যা হওয়ার ঠিক সেটাই হয়েছে। পঞ্চম দফা নির্বাচন  শেষে আওয়ামী লীগের ‘বিজয়ী’ চেয়ারম্যানদের সংখ্যা পৌঁছে গেছে ২২০-এ। অন্যদিকে বিএনপি অনেক কষ্টে পেয়েছে ১৫৩টি আসন। জামায়াতের পক্ষেও ৩৬টির বেশি আসনে ‘বিজয়ী’ হওয়া সম্ভব হয়নি।

সবশেষে বলা দরকার, উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, ব্যালট ছিনতাই, ভোটকেন্দ্র দখল এবং বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের ওপর হামলা ও তাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আসলে বিএনপি-জামায়াতসহ ১৯ দলীয় জোটের বক্তব্যই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তো বটেই, বর্তমান নির্বাাচন কমিশনের অধীনেও সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা। এ উদ্দেশে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নির্বাচনের নামে এ ধরনের ভয়াবহ সন্ত্রাস-সহিংসতা, প্রহসন এবং জবর দখলের অভিযান চলতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই শুধু অকার্যকর হয়ে পড়বে না, দেশে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসন টিকিয়ে রাখাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

শেয়ার করুন