প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি মমতা

0
58
Print Friendly, PDF & Email

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিঞ্চিৎ উচ্চাভিলাষী। ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটানোর পর দেশে ও বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়ে এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। সেই আশাতেই তিনি ভোটের মুখে আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর সেই সাধের ফেডারেল ফ্রন্ট শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কারণ, জয়ললিতা, চন্দ্রবাবু নাইডু, নবীন পট্টনায়েক, নীতিশ কুমারের মতো আঞ্চলিক দলের নেতারা ভোটের ফল না দেখে আগেভাগে এ রকম কোনো জোটে নাম লেখাতে রাজি হননি। ফলে, এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে এসে মমতা এখন বলছেন, প্রিপেইড নয়, খেলাটা পোস্টপেইড ধাঁচে হবে।
একের পর এক দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের ভাবমূর্তি অনেকটাই কালিমালিপ্ত। বিপরীতে নিজের ভাবমূর্তিতে সাদা রং চড়াতে মমতা এর পরেই আন্না হাজারের শরণ নেন। একদা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বিখ্যাত এই আন্না হাজারে এখন তাঁর ভাবশিষ্য এবং আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল দ্বারা পরিত্যক্ত। ফলে তাঁরও একটা মঞ্চ দরকার ছিল। সম্ভবত সে কারণেই আন্না হাজারেও মমতাকে পাশে বসিয়ে তড়িঘড়ি ঘোষণা করেন, মমতাই প্রধানমন্ত্রী পদের যোগ্যতম দাবিদার। তিনি মমতার প্রার্থীদের হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচারে যোগ দেবেন। সেই মতো মমতাও ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, অসমসহ বিভিন্ন রাজ্যে কিছু প্রার্থী দাঁড় করানোর কথা ঘোষণা করলেন।
ঠিক হলো, দিল্লির রামলীলা ময়দানে আন্না ও মমতার যৌথ জনসভার মধ্য দিয়ে তূণমূল দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবে। কিন্তু এর পরেই মমতা আবারও ধাক্কা খেলেন। রামলীলা ময়দানে একেবারেই লোক হাজির হয়নি খবর পেয়েই আন্না হাজারে সেই জনসভায় হাজির হতে রাজি হলেন না। অপ্রস্তুত মমতা ও তাঁর সঙ্গী নেতারা ফাঁকা মাঠে কয়েক শ কৌতূহলী দর্শকের সামনে কিছুক্ষণ মঞ্চে হাজির থেকে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন। আন্না সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন, তাঁর দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে দিল্লিতে যে লোকসমাগম হতো, তাঁরা এখন তাঁকে ছেড়ে আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে ভিড়েছেন। আর সেই সঙ্গে এটাও দেখতে পেলেন, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মমতার না আছে কোনো মজবুত সংগঠন, না আছে জনভিত্তি। এই অবস্থায় আন্না জানিয়ে দিলেন যে মমতার হয়ে তিনি প্রচারে নামবেন না। মাত্র কদিন আগেই মমতাকে সততার প্রতিমূর্তি এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতম প্রার্থী বলে দরাজ সার্টিফিকেট দেওয়ার পরে আন্নার এ ডিগবাজি ভোট রাজনীতিতে কিঞ্চিৎ কৌতুকের জোগান দিয়েছে।
আন্নাকে পাশে না পেয়ে মমতা এখন রাজনীতির সর্বভারতীয় আঙিনা ছেড়ে নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মনোনিবেশ করেছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যত বেশি আসন নিয়ে ভোট পরবর্তী দর-কষাকষিতে অংশ নেওয়া। মমতার ঘনিষ্ঠ মহল, বিশেষ করে দলে মমতার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন নেতা মুকুল রায়। মুকুল রায়ের হিসাবে দল এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মোট ৪২টি আসনের মধ্যে অন্তত ৩৩ থেকে ৩৫টি আসন জিতবে। এর সঙ্গে ঝাড়খন্ড ও অসম প্রভৃতি রাজ্য থেকে যদি একটি বা দুটি আসন পাওয়া যায়, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস ৩৫টি আসন হাতে নিয়ে ভোটের পরে যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে।
মমতা শিবিরের এ অঙ্কের পেছনে হিসাবটা হলো, নির্বাচনের ফলে যে দল বা জোটই এগিয়ে থাকুক না কেন, মোট ৫৪৩ আসনের লোকসভায় ন্যূনতম প্রয়োজন যে ২৭২টি আসন, তা কোনো দলই পাবে না। এ ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনার কথা তাঁরা মাথায় রেখেছেন। প্রথমত, বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট যদি ভোটের ফলে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে, তাহলেও ২০০ বা তার কাছাকাছি আসন পাবে। ২৭২ থেকে বেশ কমই থাকবে। তখন কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য তাদের নির্ভর করতে হবে অন্য দলগুলোর ওপর। তখন ৩০ থেকে ৩৫ আসন যার হাতে থাকবে, দর-কষাকষিতে তার গুরুত্বও সবচেয়ে বেশি হবে।
দ্বিতীয়ত, এটাও হতে পারে যে বিজেপির জোট ১৫০ থেকে ১৬০ সংখ্যার মধ্যেই আটকে থাকল এবং আঞ্চলিক দলগুলো ভালো ফল করল। তখন শুরু হবে আসল দরাদরি। তামিলনাড়ুর জয়ললিতা, ওডিশার নবীন পট্টনায়েক, বিহারের নীতিশ কুমার, উত্তর প্রদেশের মায়াবতী, অন্ধ্র প্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু, জগমোহন রেড্ডি, প্রস্তাবিত নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাও প্রমুখকে নিয়ে তখন শুরু হবে একদিকে বিজেপির টানাটানি, অন্যদিকে একটি তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার চেষ্টা। কিন্তু তাতেও পেছন থেকে কংগ্রেসের সমর্থন লাগবে। ১৯৯৬ সালে যেমন ভোটের পর এ রকমভাবেই কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে দেবগৌড়া যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যদি সত্যিই বিজেপি জোট ভোটের ফলে সরকার গড়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে, তখন এই আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট সরকার গড়ার চেষ্টা গতি পাবে। আর তখন মমতা (ঝুলিতে যদি ৩৫ আসন থাকে) চেষ্টা করবেন সেই জোটের নেত্রী হওয়ার জন্য। জয়ললিতা, মায়াবতী, নবীনেরা যে সহজে জায়গা ছেড়ে দেবেন, তা নয়। কিন্তু সম্ভাবনাটা থেকেই যাচ্ছে।
আর সেই সম্ভাবনাটা জোরালো করতেই মমতা এখন পশ্চিমবঙ্গের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত প্রচারে ব্যস্ত। আর প্রচারে নেমে বুঝতে পারছেন, এবার লড়াইটা বেশ জটিল। ২০০৯ সালে মমতার জনপ্রিয়তা যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে লড়ে মমতা পেয়েছিলেন ১৯টি, কংগ্রেস ছয়টি আসন। সঙ্গে ছোট বাম দল এসইউসি ছিল, তারাও পেয়েছিল একটি আসন। কিন্তু এবার কংগ্রেস সঙ্গে নেই, এসইউসিও নেই। যদিও গত পাঁচ বছরে কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে আরও দুর্বল হয়েছে। কেন্দ্রে মনমোহন সিংহ সরকারের ব্যর্থতাও কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা আরও কমিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও নদীয়া জেলার একাংশে তাদের এখনো কিছুটা প্রভাব রয়েছে।
অন্যদিকে বামপন্থীরাও এখন যথেষ্ট দুর্বল। সিপিএমের একাংশ গত তিন বছরে ক্ষমতাসীন তৃণমূলে যোগ দিয়েছে।
কিন্তু চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বিজেপি। এই প্রথম বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনেই প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে। ফলে খাতা-কলমে ৪২টি আসনেই লড়াই হতে চলেছে চতুর্মুখী। এবার যেহেতু নরেন্দ্র মোদিকে সামনে তুলে ধরে বিজেপি প্রচারে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, তাই বিজেপির ভোট কিছুটা হলেও পশ্চিমবঙ্গে বাড়বে বৈকি।
মমতার চিন্তার কারণ এটাই। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীয়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় বিজেপির এমনিতেই নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক রয়েছে। এবার সেটা আরও বাড়লে ভোট কাটাকুটিতে একাধিক আসনের ফলই অপ্রত্যাশিত মোড় নিতে পারে। এমনিতেই দার্জিলিংয়ে গোর্খা জনমোর্চাকে ভয় দেখিয়ে ও বুঝিয়ে কোনো লাভ হয়নি। তারা বিজেপির প্রার্থীকে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করেছে। ফলে আসনটি এবারও বিজেপির হাতে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তার ওপর বিজেপির বাড়বাড়ন্ত উত্তর কলকাতা, কৃষ্ণনগর, জঙ্গিপুর, রায়গঞ্জ, আলিপুরদুয়ার প্রভৃতি আসনের ফল উল্টে দিতে পারে। অর্থাৎ বিজেপি নিজে না জিতলেও অন্যের পরাজয়ের কারণ হতে পারে। কোথায় বিজেপি কোন দলের ভোট কতটা কাটতে পারে, সেই হিসাব কষতেই ব্যস্ত এখন তৃণমূলের নেতারা। এই হিসাবের কথা মাথায় রেখেই মমতার কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়ছে।

শেয়ার করুন