জনগণের সেবায় বিএনপি ও আ.লীগ উভয়েই শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ

0
51
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুটি রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। আওয়ামী লীগের বয়স ৬৫ বছর। বিএনপির বয়স ৩৬ বছর। দুটি দলই বিপুল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো দেশের বৃহত্তম এই দুটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনা ও দল পরিচালনায় বিপুল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশ ও জনগণের সেবার ক্ষেত্রে দুটি দলই নিদারুণভাবে ব্যর্থ। উভয় দলই বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের নাড়ির স্পন্দন সঠিকভাবে শুনতে পেরেছে বলে মনে হয় না। প্রতিষ্ঠা লগ্নের আওয়ামী লীগ এবং আজকের আওয়ামী লীগের মধ্যে কি আকাশ পাতাল পার্থক্য। অনুরূপভাবে সূচনা লগ্নের বিএনপি এবং ৩৫ বছর পরের বিএনপির মধ্যেও কি আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতের একটি হোটেলে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হলে পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৪ সালের ২৫ই জানুয়ারি মওলানা তর্কবাগিশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। একই বছর ১লা মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
আদর্শবাদ ও আওয়ামী লীগ
জন্মের পর থেকেই আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন, আইনের শাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিকভাবে লড়াই করে। যতই দিন যায় ততই স্বায়ত্তশাসনের দাবীটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার লাভ করে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন যার মধ্যে পাকিস্তানকে একটি কনফেডারেল রাষ্ট্রে রূপান্তরের রূপরেখা ছিলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক আদর্শে একদিকে ছিলো যেমন আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ অন্যদিকে তেমনি ছিলো ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা। তাই বক্তৃতা বিবৃতিতে এবং নির্বাচনী ঘোষণাপত্রে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন যে, কোরআন সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন পাস করা হবে না। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ধর্ম নিরপেক্ষ আদর্শ প্রচার করেন নি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং রেসকোর্স ময়দানে ঘোড় দৌড়ের মত জুয়ার রেস বন্ধ করেন।
জনসম্পৃক্ততা
রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লড়াই করেছেন অসীম ক্ষমতাধর পাকিস্তানী সামরিক শাসক জেঃ আইয়ুব খান এবং জেঃ ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে। উল্লেখযোগ্য যে, তার এই সংগ্রাম ছিলো অতন্ত কঠিন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো জনগণ। তার ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাবের পেছনে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠীকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং গভর্নর মোনায়েম খানের জেলখানায় যখন তিনি বন্দী ছিলেন তখন জেলের বাইরে রাজপথে জনতার আওয়াজ ছিলো ‘জেলের তালা ভাঙ্গবো, শেখ মুজিবকে আনবো’। অনুরূপভাবে বাংলা একাডেমীতে স্থাপিত বিশেষ আদালতে যখন রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিচার চলছিলো, তখন বিচার প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে জনগণ ট্রাইব্যুনালে অগ্নিসংযোগ করে এবং বিচারিক কাগজপত্র জ্বালিয়ে দেয়। মামলা পরিত্যক্ত হয় এবং জনগণের চাপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কারা মুক্ত হন।
সেই আওয়ামী লীগ এখন আর নাই
 সেই আওয়ামী লীগ এবং আজকের আওয়ামী লীগের মধ্যে কি আসমান জমিন তফাৎ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এমন একটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন যেখানে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনই আওয়ামী লীগ পেয়েছিলো। সেই নির্বাচনটি হয়েছিলো প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এবং যেটি ছিলো অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন।
কিন্তু আজ আওয়ামী লীগ এমন একটি নির্বাচনে জিতেছে যেখানে মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোন ভোটই গ্রহণ করা হয় নাই। ৯ কোটি ভোটারের মধ্যে ৫ কোটি ভোটারকে ভোট দেওয়াতো দূরের কথা, ভোট কেন্দ্রেই যেতে হয়নি। আজ দেশে রয়েছে এমন একটি মন্ত্রিসভা যার ৪৯ জন মন্ত্রীর মধ্যে ৩৬ জন মন্ত্রীকে নির্বাচনের জন্য জনগণকে কোন ভোট দিতে হয়নি বা কোন নির্বাচন কেন্দ্রেও যেতে হয়নি। এই মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেক মন্ত্রীকে ইলেকশন ফেস করতে হয়নি।
ক্ষমতার উৎস
আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাসে আর যাই থাকুক ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দলটির কোন প্রকাশ্য এবং গোপন আঁতাত ছিলো না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার জন্য সেনাবাহিনীর সাথে বর্তমান আওয়ামী লীগের অনেক গোপন যোগাযোগও ফাঁস হয়ে পড়ে। এরশাদ যখন সামরিক শাসক ছিলেন তখন থেকেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে একটি সখ্যতা গড়ে ওঠার খবর পাওয়া যায়। ১/১১-এর পর তৎকালীন সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমদের সাথে আওয়ামী লীগের গোপন যোগাযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। ১/১১-এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা যখন তখন কথা বলেন। কিন্তু ১/১১-এর একজন সামরিক নায়কের কেশাগ্রও স্পর্শ করা হয় নাই। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের একটি রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিরুদ্ধে অনেক বিষ উদগীরণ করেছে। কিন্তু জেঃ এরশাদ সবসময় আওয়ামী লীগের পলিটিক্যাল স্ট্রেঞ্জ বেড ফেলো থেকেছেন। জনগণের ওপর ভরসা না করে আওয়ামী লীগ বিশাল প্রতিবেশীর সমর্থনকে ক্ষমতার প্রধান উৎস বলে মনে করে। বামপন্থীদেরকে নিজ নিজ দলের সাইনবোর্ড নামিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগে এবং মন্ত্রিসভায় বামপন্থীদের প্রবল উপস্থিতি এবং প্রাধান্য কারো নজর এড়ায় নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন অতীতের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী সরকার বিগত ছয় বছরে বিদু্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে, যার ফলে ২০০৯ সালের তুলনায় এখন বিদ্যুতের দাম ৫ গুণ বেশি। আওয়ামী লীগ অনেক প্রবীণ ও নবীন নেতায় সমৃদ্ধ একটি দল। অথচ ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের পরিবর্তে আওয়ামী লীগ এখন একটি মেরুদ-হীন ও দুর্নীতিবাজ নির্বাচন কমিশন এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল। এক কথায় জনগণের সেবার এবং তাদের সন্তুষ্টির নিরিখে আওয়ামী লীগ যেমন দল হিসাবে ব্যর্থ তেমনি সরকার হিসাবেও ব্যর্থ।
বিএনপি: মুদ্রার অপর পিঠ
দল হিসাবে দেশের অপর বৃহত্তম দল বিএনপিও দেশ ও জনগণের সেবায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। সরকারে থাকলে একটি দলের পারফরমেন্স খারাপ হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে একটি বিরোধী দলের পারফরমেন্স যে করুণ হবে সেটা কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বিএনপির ক্ষেত্রে বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। এই দলটি অতীতে দুই বার পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলো এবং একবার কয়েক মাসের জন্য ক্ষমতায় ছিলো। দলটি দুইবার পূর্ণ মেয়াদে বিরোধী দলে ছিলো এবং এখন তৃতীয় বার সংসদের বাইরে বিরোধী দলে আছে। সকলেই জানেন এবং রাষ্ট্র বিজ্ঞানও বলে যে, বিরোধী দলের প্রধান ভরসা এবং শক্তি হলো জনগণ। কিন্তু আমাদের প্রধান বিরোধী দলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান ভরসা হলো বিদেশী শক্তি, বিশেষ করে পশ্চিমা দুনিয়া।
অসংখ্য ইস্যু, কিন্তু —-
২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই ৫ বছরে বিএনপি অসংখ্য ইস্যু পেয়েছিলো, যে সব ইস্যু নিয়ে রাস্তায় নেমে রাজনৈতিক অঙ্গনকে একটি যোগ্য ও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে ফাটিয়ে ফেলতে পারতো। ওই সময় যদি আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতো এবং এতগুলো জেনুইন ইস্যু পেতো তাহলে তারা তক্তা উল্টিয়ে দিতো। বিগত ৫ বছরে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ৪ থেকে ৫ গুণ। অথচ মানুষের আয় দ্বিগুণও বাড়েনি। দ্রব্য মূল্যের কষাঘাতে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। অথচ এই দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কোন হরতাল করাতো দূরের কথা, ঢাকা শহরে একটি বড় মিছিলও করেনি। যখন প্রচ- লোডশেডিং ছিলো এবং তার মধ্যেও বিদ্যুতের মূল্য দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছিলো তখনো বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে বিএনপি রাস্তায় নামে নি। গুম এবং খুন বাংলাদেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনকে ভীতিকরভাবে তাড়া করছে। চরে, খালে, সাগরে গুম হয়ে যাওয়া মানুষদের লাশ ভাসছে। সে ব্যাপারেও বিএনপি সক্রিয় কোন আন্দোলন করতে পারে নি। বিএনপির ব্যর্থতার বিস্তারিত ফিরিস্তি দিতে গেলে একটি মহাকাব্য রচনা করতে হয়। দেশের আলেম ওলামাদের ওপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চললো। কিন্তু বিএনপি ছিলো নির্বিকার। কিছু না পেয়েই ভারতকে আংশিক করিডোর দেওয়া হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে কয়েকশ’ মানুষ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে। এই রকম ঘটনা ঘটেছে। সব ব্যাপারে লিপ সার্ভিস দেয়ার বাইরে বিএনপি কিছু করেনি।
কোথায় গেলো সেই আদর্শ?
 মরহুম প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে আদর্শ এবং দর্শনের ভিত্তিতে বিএনপি গঠন করেন, সেই আদর্শ এবং দর্শন জনগণের নিকট এতটাই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে যে, জনগণ দলে দলে বিএনপিতে যোগদান করেন। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের যে দর্শন মরহুম প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উপস্থাপন করেন সেটি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বুল ওয়ার্ক হিসাবে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু ধীরে ধীরে বিএনপির রাজনীতি থেকে আদর্শ স্তিমিত হতে থাকে। ফলে এই দলটি আওয়ামী লীগের মতই হয়ে ওঠে ক্ষমতা কেন্দ্রিক।
এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় জনগণ হয়ে পড়েছেন জিম্মি। রাজনৈতিক ফ্রন্টে জনগণকে জিম্মি দশা থেকে উদ্ধার করার জন্য এখন বিকল্প শক্তির বড় প্রয়োজন। তবে এখনো তার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাই।

শেয়ার করুন