সংস্কারের অভাবে নিস্তেজ প্রশাসন

0
88
Print Friendly, PDF & Email

সংস্কারের অভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে প্রশাসন। এ সংস্কার নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে কমিশন বা কমিটি গঠনসহ নানান উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়ছে। প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা এ তথ্য জানিয়েছেন। সচিবালয়ে কর্মরত এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবকণ্ঠকে বলেন, সরকার প্রশাসন সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না। ফলে সংস্কার কার্যক্রম বারবার ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হচ্ছে। কর্মকর্তারাও কাজের উদ্যম হারিয়ে ফেলছেন। স্বাধীনতার পর থেকে প্রশাসন সংস্কারের ১৮টি কমিশন/কমিটি গঠন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই কার্যকর হয়নি। এসব সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে কয়েকটি ব্যাচে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ায় প্রশাসন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে আছে নিয়োগবিধির তোয়াক্কা না করে কোনো কোনো ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে শীর্ষপদে বসানো। এসব অতীতেও ছিল, এখনো তা ঘটছে। রাজনেতিক অনুসারী কর্মকর্তারা এর সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে একদিকে গোটা প্রশাসন ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণ কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা পদে পদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসন যন্ত্রই একটি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি। যে দেশের প্রশাসন যত শক্তিশালী ও স্বচ্ছ, সে দেশ তত গতিশীল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রশাসনযন্ত্রকে গতিশীল করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য সরকার ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দায়ী। সাময়িক সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা চুপ থেকেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকার সাহস করে এক্ষেত্রে হাত দেয়নি।
সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের আমলে সারাদেশে উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের মধ্য দিয়ে প্রশাসনে অপরিকল্পিত নিয়োগ শুরু হয়। উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে এক ব্যাচে ৬৫০ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। ৮৩-র এ ব্যাচটি পরে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। এ ব্যাচের কর্মকর্তারা এখন প্রশাসন চালাচ্ছেন। মাত্র ২০০ মার্কের পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়া ম্যাজিস্ট্রেটদের একই পদে অবসর নেয়ার কথা ছিল। পরে সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
এছাড়াও সচিবালয় ক্যাডার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসের (আইএমএস) কর্মকর্তাদেরও প্রশাসন ক্যাডারে সম্পৃক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তাকে প্রশাসন ক্যাডারে সম্পৃক্ত করায় তা বেসামাল হয়ে পড়ে। শুরু হয় পদোন্নতি জটিলতা। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের মধ্যে সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। ক্রমান্বয়ে তা বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে বৈষম্য। দিনে দিনে এ বৈষম্য বাড়তে থাকে। এর থেকে তৈরি হয় আন্তঃক্যাডার বৈষম্য। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এর ফলে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ কমছে। এতে প্রশাসনে অস্থিরতা বাড়তে থাকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত এক যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসনকে গতিশীল করতে হলে প্রশাসনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। আর দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে সিভিল সার্ভিস কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। সব কর্মকর্তা এ কমিশনের অধীনে থাকবেন। পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে প্রতিস্তরে পদোন্নতি হবে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশাসনের সংস্কারের জন্য নানাবিধ উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তার কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। রাজনৈতিক সরকারগুলো ক্ষমতায় এসে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারপর ধীরে ধীরে তা হিমাগারে চলে যায়। প্রশাসনকে গতিশীল করতে নেয়া ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি। এর কারণ নেতাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি না থাকা, প্রভাবশালী আমলাদের অনীহা, সিভিল সোস্যাইটি প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে কথা না বলা।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশ ফাইল ঘুরতে থাকে বৃত্তাকারে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও কিছু কর্মকর্তার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা চাইলেও দাতাদের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো ফাইল বছরের পর বছর ঘুরতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রস্তাবের নাম পরিবর্তন করেও ঘোরানো হচ্ছে। প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের নেয়া প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়ন না করে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকার নজির রয়েছে প্রশাসনে। সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু ফাইল ঘুরতে থাকে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে প্রশাসনকে গতিশীল করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও আস্তে আস্তে তা ঝিমিয়ে পড়ে। প্রথমদিকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অল্পদিনের মধ্যেই তা নীরব হয়ে যায়।

শেয়ার করুন