সংকটে সুন্দরী

0
67
Print Friendly, PDF & Email

সাগরের প্রান্ত ছুঁয়ে জেগে ওঠা সুন্দরবন। সুন্দরী বৃক্ষের প্রাচুর্যে একসময় প্রকৃতই সুন্দরী ছিল এ বন। বাড়িয়ে দিয়েছিল অর্থনৈতিক মূল্যও। সেই সুন্দরবনেই আজ প্রকৃতির আঘাত। সময় যত গড়াচ্ছে, আরো বেশি লবণাক্ত হয়ে উঠছে পানি। কিন্তু এ মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করার সামর্থ্য সুন্দরী প্রজাতির নেই। তাই তো সংকটে পড়েছে সুন্দরী। কমে আসছে এর প্রাচুর্য। বিপরীতে বাড়ছে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যবান কেওড়া-গেওয়ার আধিক্য।
সুন্দরী ছাড়াও সুন্দরবনে রয়েছে গরান, গেওয়া, কাঁকড়া, কেওড়া, ধুন্দল, গোলপাতাসহ ৩৫০ প্রজাতির গাছ। এর মধ্যে সুন্দরী গাছের কাঠ সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। সুন্দরী কাঠের দাম গরান, গেওয়া, কেওড়া, ধুন্দলের চেয়ে তিন গুণ বেশি। পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় গত দুই দশকে সুন্দরবনে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে সুন্দরী বৃক্ষ। চলতি ২০১৪-এর মার্চে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘রিভার স্যালাইনিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ: এভিডেন্স ফ্রম কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, লবণাক্ততার বর্তমান মাত্রা থাকলে বা আরো বাড়লে সুন্দরী প্রজাতির গাছ আরো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দুই বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের একদল গবেষক দুই দশকে সুন্দরবনের গাছের প্রজাতির পরিবর্তন সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে খুঁজে পান, ১৯৮৯  থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সুন্দরী বৃক্ষ কমেছে ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনের ২৩ হাজার হেক্টর এলাকায় এ বৃক্ষ থাকলেও ২০০০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৩০৮ হেক্টর। গাছ মরে যাওয়ায় ২০১০ সালে তা আরো কমে হয় ১৬ হাজার ৪০০ হেক্টর।
অন্যদিকে লবণাক্ততার কারণে বেড়েছে গেওয়া, কাঁকড়া ও কেওড়া গাছের আধিক্য। বিশেষ করে কাঁকড়া গাছ বেড়েছে ১৫ গুণ। ১৯৮৯ সালে মাত্র ১৯০ হেক্টর জমিতে এ প্রজাতির গাছ থাকলেও ২০০০ সালে তা বেড়ে হয় ৯০৬ হেক্টর। ২০১০ সালে এ প্রজাতির বৃক্ষের পরিসর দাঁড়ায় তিন হাজার হেক্টর। গেওয়া গাছ ১৯৮৯ সালে ১৫ হাজার ১৮৪ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত থাকলেও ২০০০ সালে তা ১৫ হাজার ৮২৮ হেক্টরে উন্নীত হয়। ২০১০ সালে তা আরো বেড়ে হয় ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর। আর ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কেওড়া গাছ ছিল মাত্র ৪৩ হেক্টর জমিজুড়ে। অথচ ২০১০ সালে তা বিস্তৃত হয় ১০৮ হেক্টরে।
সুন্দরী বৃক্ষের এ বিপন্নতার চিত্র উঠে এসেছে ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায়ও।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, সুন্দরী স্বাদু পানির গাছ। কিন্তু লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় গাছটি মারা যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদ-নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া সুন্দরবন এলাকার পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। মূল্যবান এ গাছ বাঁচাতে হলে নদীতে স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরী স্বাদু পানির গাছ হলেও তা অল্প পরিমাণ লবণাক্ত পানিতে ভালো জন্মায়। জোয়ার-ভাটার মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) লবণাক্ত পানি সুন্দরী গাছের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। সুন্দরবন এলাকায় সময় ও স্থানভেদে পানির লবণাক্ততার পরিমাণ ২ থেকে ২৭ পিপিএম। গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে লবণাক্ততা ১ থেকে ৫ পিপিএমের মধ্যে থাকলেও শীতকালে তা বেড়ে যায়। তখন সাতক্ষীরা এলাকায় পানি বেশি লবণাক্ত হয়ে ওঠে। সুন্দরবন এলাকায় ৪৫০টি নদ-নদী, নালা ও খাল রয়েছে। এর মধ্যে পশুর, রূপসা, শিবসা ও বলেশ্বর নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি। পশুর নদীর হিরণ পয়েন্টে শীতকালে সর্বোচ্চ লবণাক্ততা ২৭ দশমিক ৩ পিপিএম ও একই নদীর মংলা পয়েন্টে তা ২০ দশমিক ৭ পিপিএম। রূপসা নদীর খুলনা পয়েন্টে ১৬ দশমিক ৮ পিপিএম, শিবসায় নদীর নালিয়ান পয়েন্টে ২৩ দশমিক ৪ ও বলেশ্বর নদীর চরদোয়ানি পয়েন্টের পানিতে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৫ পিপিএম লবণাক্ততা থাকে।
সুন্দরবনে গাছের বংশবৃদ্ধির সঙ্গে প্রকৃতিগত সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, সুন্দরবনে একসময় কেওড়া গাছের আধিক্য ছিল। তারপর এ স্থান নেয় সুন্দরী। এখন পর্যন্ত সুন্দরীই এক নম্বরে আছে। এরপর গেওয়া গাছের অবস্থান। সুন্দরবনে এক গাছের জায়গায় অন্য গাছের আধিক্য প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়। তবে এ পরিবর্তন চোখে পড়ে ১০০-১৫০ বছর পর।
সুন্দরবন এলাকার দুই অঞ্চলে চারটি রেঞ্জ রয়েছে। পূর্ব অঞ্চলে শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ। পশ্চিম এলাকায় খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ। চারটি রেঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকার পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি। এ কারণে সেখানে সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন চারা গজানোর হারও কমছে। এ অঞ্চলে সুন্দরী গাছে আগা মরা রোগের প্রকোপও বেশি। অন্যদিকে শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে লবণাক্ততা কিছুটা কম। এ এলাকায় তাই সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার হচ্ছে। মাটিতে নতুন চারা গজাচ্ছে। আগা মরা রোগের প্রকোপও এ এলাকায় কম। ২০০৯ সালে আইলার পর পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও সাতক্ষীরা এলাকায় সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। কিন্তু শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে এ গাছ স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বংশবৃদ্ধিও হচ্ছে।
সুন্দরবনের মূল্যবান প্রজাতির বৃক্ষ সুন্দরী কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করছে বন বিভাগও। তাদের মতে, ৩০ বছর ধরে প্রকৃতিগত পরিবর্তনের কারণে সুন্দরী গাছ আগা মরা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। ফলে এর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বন বিভাগ মনে করছে, পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়াই কেবল সুন্দরী কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ নয়। এর বাইরে আরো কিছু কারণ রয়েছে। জোয়ার-ভাটার সময়ের তারতম্য ও স্থায়িত্বের কারণে এটি হতে পারে। পলি জমে নদী, নালা, খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সুন্দরবন এলাকায় স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় গাছ মারা যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে খুলনা অঞ্চলের সাবেক বন সংরক্ষক আকবর হোসেন বলেন, সুন্দরবন এলাকার পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া সুন্দরী কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। গাছের গোড়ায় পলি জমা, জোয়ারের পানি হেরফের হওয়ার কারণেও সুন্দরী প্রজাতির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

শেয়ার করুন