এগিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার পিছিয়ে বাংলাদেশ : গভীর সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধান –

0
121
Print Friendly, PDF & Email

সাখাওয়াত হোসেন বাদশা : দ্রুত ফুরিয়ে আসছে দেশে আবিষ্কৃত গ্যাসের মজুদ। নতুন করে কোন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে আগামী এক দশকের মধ্যেই তা ফুরিয়ে যাবে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আমদানি করা গ্যাসের ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে। এ সঙ্কট উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা নতুন করে গ্যাস কূপ খনন এবং এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি সুযোগ দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ভারতের সাথে আন্তর্জাতিক সমুদ্র সীমা নির্ধারণ না হওয়ায় বঙ্গোপসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস ব্লক নিয়ে কোন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে পারছে না পেট্রোবাংলা। আর মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর গ্যাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ব্লকগুলো ওই দেশের ভেতর পড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বাংলাদেশ।
জ্বালানী মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পূর্বের নির্ধারিত ব্লকগুলোর মধ্যে ১৮, ২৩, ২৭ পুরোপুরি এবং ১৭, ২২ ও ২৬-এর অধিকাংশ পড়ে গেছে মিয়ানমারের মধ্যে। জানা গেছে, ইতোমধ্যেই ওই দেশটি এসব ব্লক ইজারার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে এবং প্রতিষ্ঠিত তিনটি আন্তর্জাতিক কোম্পানীর সাথে ইজারা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দেশের গ্যাস সঙ্কট সমাধানে যদি বঙ্গোসাগরে নতুন করে তৈরি করা ব্লকগুলোতে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে না পারে- তাহলে সেদিন আর বেশি দূরে নয়; বাংলাদেশকে আমদানি করা গ্যাসের ওপরই নির্ভর করতে হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. ম. তামীম ইনকিলাবকে বলেছেন, বাংলাদেশকে গ্যাস সঙ্কটের সামগ্রিক সমস্যা সমাধানে শিগগিরই নতুন করে গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান করতে হবে। তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস আহরণের ক্ষেত্রে দ্রুত আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলোর সাথে চুক্তিতে উপনীত হতে না পারলে আমরা পিছিয়ে পড়বো। তিনি জানান, এক্ষেত্রে মিয়ানমার অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। ওই দেশটির সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ হওয়ার পর এখন আর আমাদের দেরি করার কোন সুযোগ নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা তপন চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, আমরা গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অনেক দেরি করে ফেলেছি। আমাদের গ্যাসের মজুদও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলোর সাথে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তিবদ্ধ হওয়া উচিত।
এ নিয়ে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, গ্যাস অবশ্যই তুলতে হবে। তবে বহুজাতিক কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার নামে দেশের সম্পদ যেন বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া না হয়; সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। তিনি সম্প্রতি ভারতের দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানীকে বাংলাদেশের অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়ার সমালোচনা করেছেন। ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড ও অয়েল এ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন (ওএনজিসি বিদেশ) একটি কনসোর্টিয়াম বা জোট গঠন করে গত বছর গ্যাস ব্লকে ইজারার জন্য দরপত্র দেয়। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ায় গত মাসে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সম্পাদিত চুক্তির অধীনে বঙ্গোপসাগরের ৪ ও ৯ নম্বর ব্লকে আগামী ৮ বছর ধরে গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারবে ওএনজিসি। এ-দু\টো গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস পাওয়া গেলে তা ক্রয়ের জন্য প্রথমে পেট্রোবাংলাকে আহবান করবে তারা। তবে ৬ মাসের মধ্যে পেট্রোবাংলা তা কিনতে অসমর্থ হলে ভারতীয় কোম্পানী তৃতীয় পক্ষের কাছে বিনা বাধায় উত্তোলিত গ্যাস বিক্রি করতে পারবে। ভারতীয় কোম্পানী তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। এর অধীনে ১৪ হাজার ২শ’ ৯৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দ্বিমাত্রিক সিস্মিক সার্ভে ও দুটি কূপ খনন করা হবে। বিনিময়ে, তেল পাওয়া গেলে সেখানে ২০ বছর ও গ্যাস পাওয়ায় গেলে ২৫ বছর তাতে কর্মকা- চালাবে তারা।
এছাড়াও পেট্রোবাংলা সান্তোষ ও ক্রিসের সাথে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং মার্কিন কোম্পানী কনকো-ফিলিপস-এর সাথে দু’টি ব্লক নিয়ে অনুস্বাক্ষর চুক্তি করে।
দেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস আহরণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীগুলোকে বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার যে ধরনের ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন ছিল-সেভাবে নিতে পারেনি বলেই জ্বালানী খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অথচ মিয়ানমার তাদের সমুদ্র সীমানায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলে ৬৮টি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থেকে ওই দেশটি শেভরন, শেল ও টোটালের সাথে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চুক্তি স্বাক্ষর করে।
পেট্রোবাংলার হিসেব অনুসারে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, পাওয়া যাচ্ছে ২৩শ’  মিলিয়ন ঘনফুট। এর সঙ্গে প্রতিবছর ১০% করে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্যাসের ব্যবহার যদি আরও বাড়ে, তবে ১০ বছরের কম সময়ের মধ্যে বর্তমান রিজার্ভ শেষ হয়ে যাবে। দেশে বর্তমান ২৩টি ব্লকে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মজুদ রয়েছে ২৮ দশমিক ২০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)।
জরিপে দেখা যায়, ২৩টি ব্লকের মধ্যে সর্বোচ্চ মজুদ রয়েছে পেট্রোবাংলার মালিকানাধীন তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের সাত হাজার ৫৪২ বিলিয়ন ঘনফুট বা ৭ দশমিক ৫৯ টিসিএফ। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী গ্যাস মজুদের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র। এতে রয়েছে চার হাজার ৫৩২ বিসিএফ বা ৪ দশমিক ৩২ টিসিএফ। এ ক্ষেত্রটির গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্বে রয়েছে বিদেশী কোম্পানি শেভরন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রে। এখানে রয়েছে তিন হাজার ১৪৯ বিসিএফ। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে কৈলাসটিলা গ্যাসক্ষেত্র। এখানে রয়েছে দুই হাজার ৮৮০ বিসিএফ। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে হবিগঞ্জ। এখানে আছে দুই হাজার ৭৮৭ বিসিএফ। গ্যাস উত্তোলনে শেভরনের দায়িত্বে থাকা অন্য দুইটি গ্যাসক্ষেত্র যেমন জালালাবাদে এক হাজার ১২৮ বিসিএফ এবং মৌলভীবাজারে ৪৯৪ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে।
এছাড়াও সান্তোষের সাংগু গ্যাসক্ষেত্রে ৭৭১ বিসিএফ এবং তাল্লোর বাংগুরা গ্যাসক্ষেত্রে ৬২১ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। আর বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে এক হাজার ৩৮৭ বিসিএফ, বিয়ানিবাজারে ১৩৭ বিসিএফ, ফেঞ্চুগঞ্জে ৩২৯ বিসিএফ, নরসিংদী ৩৪৫ বিসিএফ, সালদা নদী ২৬৭ বিসিএফ, সাংগু ৭৭১ বিসিএফ, শাহবাজপুর ২৬৪ বিসিএফ, সিলেট ৪০০ বিসিএফ, ছাতক ৪৭৪ বিসিএফ, ফেনী ১৩০ বিসিএফ, কামতা ৫০ বিসিএফ, মেঘনা ৪৯ বিসিএফ, বেগমগঞ্জ ৩৩ বিসিএফ, কুতুবদিয়ায় ৪৬ বিসিএফ, সেমুতাংয়ে ৩১৮ বিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ রয়েছে।

শেয়ার করুন