দেশটার মালিক কারা?

0
244
Print Friendly, PDF & Email

জীবনে যাদের কিছুই হয়নি, তাদেরও বলার মতো অনেক কথা থাকে। যার কিছু নেই, তার কেবলই আছে অভিজ্ঞতা, স্মৃতির বুদ্বুদ তাদের মনে ওঠে আর ফেটে পড়ে। আমাদের স্বাধীনতার গৌরবমাখা ইতিহাস আছে, অমর আত্মদানের শোক আছে, কিন্তু স্বাধীনতার সোনালি হাসি দেখি না তো ১৬ কোটি মানুষের মুখে। স্বাধীনতা তাহলে কি আসেনি? জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত আর একটি রাষ্ট্র আমাদের আছে। আমরা দেশের মানুষ থুয়ে গিনেস বুকে রেকর্ড গড়ি। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের সত্যিকার রেকর্ড তো গড়া হয় মানুষের মনে। সেখানে কোন রেকর্ড গঠিত হচ্ছে, কোন হতাশার রেকর্ড বাজছে, সে খবর রাখে কে?
রেকর্ড, ব্র্যান্ডিং—এগুলো বাজারি শব্দ। দেশ মানে ব্র্যান্ড না, দেশ মানে ঠিকানা, দেশ মানে গর্বের পরিচয়। বাজারের মহাজনেরা স্বাধীনতার চেতনাকে একদিকে উৎসবের জ্বালানি বানাচ্ছেন, অন্যদিকে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ অপব্যবহারে অপব্যবহারে নিজেই চেতনানাশক হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা অতীতের ব্যাপার নয়, স্বাধীনতা প্রতিদিনের যাপনের বিষয়। এই চেতনার প্রয়োজন ভবিষ্যতের জন্য। ভবিষ্যতে কেমন দেশ চাই, তার নিরিখ হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ঘোষিত-অঘোষিত আকাঙ্ক্ষা। সমতাভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জনমানুষের সুখী দেশ আমাদের প্রাপ্য ছিল। এত ছোট দেশে এত বড় গণহত্যার প্রতিদান এর চেয়ে কম হতে পারে না।
স্বাধীনতা দিবস এলেই তাই কবি আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ কবিতাটা মনে পড়ে। বিজয়ের পরপরই তিনি কেন এমন কবিতা লিখেছিলেন, তাই ভাবি। কবিতাটি শুরু হয় এভাবে: লক্ষ্মী বউটিকে আজ আর কোথাও দেখি না/ হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে কোথাও দেখি না/ কতগুলো রাজহাঁস দেখি/ নরোম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি/ কতোগুলো মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না/ শিশুটিকে কোথাও দেখি না।
কবিতাটি শেষ হয় এই আক্ষেপ নিয়ে: কেবল পতাকা দেখি/ কেবল পতাকা দেখি/ স্বাধীনতা দেখি।
লক্ষ্মী বউটি বা নরম নোলক পরা বোন বা ছোট ভাই বা শিশুটি আর ফিরবে না। তাদের অন্তিম নিঃশ্বাসের কষ্টে বাংলার আকাশ আজও নীল। কিন্তু শহীদদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ‘সোনার বাংলার’ স্বপ্নটিও কি হারিয়ে গেল? রাজহাঁসের মতো গর্বিত একদল ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষ দেখি। মুখস্থ ইতিহাসের জিকির আর মুখস্থ স্লোগানের জয়জয়কার দেখি। আর কেবল পতাকা দেখি, কেবল স্বাধীনতা দেখি। ২৬ মার্চে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে ক্লান্ত পায়ে অজস্র কিশোর-কিশোরীকে দেখি পতাকা হাতে ফিরে যাচ্ছে। ওরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? যে শ্রমিকদের সেখানে আনা হয়েছিল, তারা কি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে মানুষের স্বাধীনতা, জবানের স্বাধীনতা, নিরাপদ মৃত্যুর স্বাধীনতা, রুটিরুজির নিশ্চয়তার স্বাধীনতা কতজনের?
আমরা লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। কিন্তু সেই বিজয়ের ফল খেয়ে গেল কোন ইঁদুরেরা? একাত্তরে যত মানুষ দেশে ছিল, তত মানুষ এখনো দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। জাতির সবচেয়ে কর্মঠ আর শ্রমপ্রাণ অংশের অপচয়ের শেষ নেই। পোশাকশিল্প আর প্রবাসী শ্রমশিবিরগুলোতে যে বাংলাদেশিরা কাজ করে, তারা বিশ্বায়িত পুঁজিবাদের শ্রমদাস। সোনার বাংলার যত সম্পদ, তার একাংশ পাচার হয়, অন্য অংশ ব্যয় হয় ভোগবিলাস আর অনুৎপাদনশীল খাতে। শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের ৪৭ শতাংশই বেকার। যে সবুজ-শ্যামল নদীমাতৃক বাংলাদেশের ছবি আমাদের জাতীয় সংগীতে আঁকা, সেই বাংলাদেশের নদী-পাহাড়-অরণ্য দখলে আর লুণ্ঠনে মুমূর্ষু।
বিশ্বব্যবস্থায় এই কাবু বাংলাদেশ নিয়ে দেশবাসীর কতজন গর্বিত বোধ করে? ইতিহাস অমূল্য সম্পদ, কিন্তু বর্তমানের সার্থকতা ছাড়া সেই ইতিহাসকে অক্ষয় রাখার তো আর উপায় নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেবল ইতিহাস শুনে শান্ত হবে না, তারা চাইবে বর্তমানে তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবির স্বীকৃতি। চাইবে সম্মানজনক সমৃদ্ধ জীবন। এই তরুণেরা দুনিয়াদারি দেখে ফেলেছে, উন্নত দেশের তরুণদের কাছে তারা হীনম্মন্য হয়ে থাকতে চায় না। অনেকের মুখেই শুনি, এই দেশে আর থাকা যাবে না। এর থেকে বড় পরাজয় আর কী হতে পারে!
তরুণ বললে কেবল সচ্ছল চমক আর চুমকি নর-নারীদের বুঝলে চলবে না। যারা কারখানায় কাজ করে, যারা মাঠে শ্রম ঢেলে জাতির অন্ন জোগায়, যারা সড়কের সব রকমের বাহন চালায়; সংখ্যায় তারাই বেশি। তারা তাজরীনে পোড়ে, তারা রানা প্লাজায় ধসে মরে, তাদের ফসল পানির দরেও বিকায় না। কীভাবে ১০ বছরে স্বাধীন দেশের ২০ হাজার শ্রমিক প্রবাসে শ্রমের চাপে মারা যায়? তাদের রেমিট্যান্স কার কাজে লাগে?
মধ্যবিত্ত তরুণেরাও হতাশ। সৎ ব্যবসায়িক উদ্যোক্তারা দুর্নীতির পাকে-চক্রে হয়রান হয়ে যান। আর গরিবেরা হয়তো পাকিস্তান আমলের চেয়ে উন্নত-গরিব হয়েছে, কিন্তু বৈষম্য অতীতের যেকোনো আমলের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের হাতে ক্ষমতা আসেনি। ২২ পরিবারের জায়গায় ২২ শ পরিবার এখন দেশ চালায়। তাই বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ভাষণ যখন শুনি, মনে হয় এখনো তিনি ক্ষমতাসীনদের সামনে আঙুল উঁচিয়ে বলছেন, ‘আর দাবায়া রাখবার পারবা না…’। শুনি তিনি বলছেন, ‘এ দেশকে আমরা গড়ে তুলব। এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস…মুমূর্ষু নর-নারীর আতর্নাদের ইতিহাস।…এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’ পাকিস্তানের ২৩ বছরের জায়গায় স্বাধীনতার ৪৩ বছর বসালে আজকের সময়ে ৭ মার্চের প্রাসঙ্গিকতাটা আমরা ধরতে পারব।
তিনি হুঁশিয়ার করেছিলেন, ‘মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে।’ আমরা কি সেই শত্রুদের চিনি? চিনি না বলেই আত্মকলহে লিপ্ত দেশে চলছে হানাহানি আর লুটের কারবার।
বঙ্গবন্ধুর ভাষায় তাই বলতে চাই, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম?…’ কী অন্যায় বাংলাদেশের মানুষের? তারা তো জীবন দিতে পিছপা হয় না। তারা তো গতর খাটাতে নারাজ নয়। তারা তো ভোট দিতে দ্বিধা করে না। তারা তো ভক্তি-ভালোবাসায় কৃপণ নয়। তাহলে কেন জীবনদান বৃথা যায়? কেন শ্রমিক তার যোগ্য সম্মান আর প্রতিদান পায় না? কেন কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পায় না? কেন ভোটের অধিকার বারবার হাতছাড়া হয়? কেন জনগণের দেশপ্রেমের আলো শাসকদের ক্ষমতাপ্রেমের অন্ধকারে হারিয়ে যায়? কেন শাসকদের দোষে দেশ দুই পা এগোয় তো তিন পা পেছায়?
২৬ মার্চ অতীত হয়ে যায়নি। ৭ মার্চের ভাষণ এখনো মুক্তির ডাক দিয়ে যায়। একাত্তরের তরুণ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, আজকের তরুণেরা কি কেবলই বিষাক্ত রাজনীতির গোলকধাঁধায় চক্কর খাবে, নাকি আত্মমর্যাদা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে! দেশ একটাই আমাদের, সুযোগও কিন্তু একটাই। একে সার্থক করতে হলে দেশের মালিক যে জনগণ, সংবিধানের সেই ঘোষণাকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীনতা তখন মুক্ত হবে, মুক্ত হবে দেশ।

শেয়ার করুন