মন্ত্রী আমলা ঠিকাদারের স্বার্থের বলি যাত্রীরা!

0
55
Print Friendly, PDF & Email

মন্ত্রী, আমলা ও ঠিকাদারদের গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে জিম্মি হতে যাচ্ছেন যাত্রীরা। যে নীতিমালার ভিত্তিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা বদল করা হচ্ছে। তাদের আবেদনেই বাড়ানো হচ্ছে ভাড়াও। ঢাকা ও চট্টগ্রামে নতুন ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা নিয়ে এই জনস্বার্থবিরোধী ঘটনা ঘটছে।
রাস্তায় নামানোর আগেই পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) ট্যাক্সিক্যাবের যে ভাড়া নির্ধারণ করতে যাচ্ছে, তাতে ট্যাক্সিক্যাবে উঠলেই ১০০ টাকা গুনতে হবে যাত্রীকে। অথচ, বিদেশ থেকে গাড়ি আনার জন্য এদের শুল্ক ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৬৫০টি ট্যাক্সিক্যাব চালানোর জন্য তমা কনস্ট্রাকশন ও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত বছরের জুলাই মাসে চুক্তি করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। শর্ত ছিল, চুক্তি হওয়ার চার মাসের মধ্যে ট্যাক্সিক্যাব রাস্তায় নামানো হবে। কিন্তু সেই শর্ত পূরণ না করে ভাড়া বাড়ানোর চাপ দিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠান দুটি।
তমা কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর ট্যাক্সিক্যাব সেবা-সংক্রান্ত কমিটির প্রধান যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফরিদউদ্দিন চৌধুরী তমা কনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বন্ধু।
তমা কনস্ট্রাকশনকে দরপত্রের মাধ্যমে এবং আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টকে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে বিশেষ বিবেচনায় ট্যাক্সিক্যাব ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ট্যাক্সিক্যাব সেবা-সংক্রান্ত নীতিমালা বদল করে ঢাকার বাইরে ট্যাক্সিক্যাব চলাচলের আওতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি এই দুই প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে বিআরটিএ।
পুরো প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ মাথায় রেখেই সবকিছু হয়েছে। যাত্রীস্বার্থ এখানে বিবেচনায় আসেনি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ভুয়া ব্যয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে যে ভাড়া চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা যাত্রী অধিকারের চরম লঙ্ঘন। এর প্রতিবাদ করলেও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ তা আমলে নেয়নি।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে বিআরটিএর তৈরি করা ট্যাক্সিক্যাবের নতুন ভাড়ার প্রস্তাব আন্তমন্ত্রণালয় সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। এখন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করলে সেটি কার্যকর বলে বিবেচিত হবে। গতকাল যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সদ্য আনা কয়েকটি ট্যাক্সিক্যাব দেখতে বিআরটিএতে গিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের এই ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি জানান।
আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন প্রথম দুই কিলোমিটারের জন্য ভাড়া ১০০ টাকা। এরপর প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৩৪ টাকা। প্রতি দুই কিলোমিটারে যাত্রাবিরতির (যানজট, সংকেত ও যাত্রী ওঠানামা) জন্য দিতে হবে সাড়ে আট টাকা। ফোন করে ট্যাক্সিক্যাব পেতে হলে আরও ২০ টাকা বাড়তি দিতে হবে। দুই কিলোমিটারের পর এক কিলোমিটারের এক-চতুর্থাংশ পথের জন্য (দুই কিলোমিটারের পর এক মিটার গেলেও আড়াই শ মিটার ধরা হবে) দিতে হবে সাড়ে আট টাকা।
প্রস্তাবিত ভাড়ায় মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে যেতে সাড়ে সাত শ টাকা লাগবে। বিআরটিএর হিসাবে এই পথের দূরত্ব ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এই দূরত্বে ভাড়া আসে ৬৩৭ টাকা। ১৫ মিনিট যাত্রাবিরতি ধরলে ভাড়া হবে ৭৬৪ টাকা।
নন-এসি ট্যাক্সিক্যাবের জন্য প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ৫০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকার বদলে ২০ টাকা হচ্ছে। প্রতি দুই মিনিট যাত্রাবিরতির জন্য তিন টাকার স্থলে পাঁচ টাকা দিতে হবে। এক-চতুর্থাংশ কিলোমিটারের ভাড়া তিন টাকার বদলে পাঁচ টাকা। নন-এসি ট্যাক্সিক্যাবে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে মতিঝিলের ভাড়া হবে প্রায় ৪৫০ টাকা।
২০০৮ সালে এসি ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া ছিল প্রথম দুই কিলোমিটারের জন্য ৪০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য আট টাকা। প্রতি দুই মিনিট যাত্রাবিরতির জন্য এক টাকা। ২০১০ সালে নতুন ট্যাক্সিক্যাব নামানোর কথা বলে ভাড়া বাড়িয়ে প্রথম দুই কিলোমিটারে ভাড়া ছিল ৬০ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রতি দুই মিনিট যাত্রাবিরতির জন্য ধরা হয় পৌনে চার টাকা। কিন্তু গত তিন বছরে কোনো ট্যাক্সি রাস্তায় নামেনি। এবারও ট্যাক্সিক্যাব নামানোর আগেই আরেক দফা ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়।
সূত্র জানায়, চুক্তি সইয়ের পর তমা কনস্ট্রাকশন এসি ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া বাড়ানোর আবেদন করে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় তাদের আবেদনটিই সামান্য কাটছাঁট করে গ্রহণ করেছে। আর নন-এসি ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া বাড়ানোর আবেদন করে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। তাদের প্রস্তাব করা ভাড়ার হার ২০১০ সালের নীতিমালায় উল্লিখিত ভাড়ার কাছাকাছি। তাই ব্যয় বিশ্লেষণ না করে ভাড়া কিছুটা বাড়িয়ে এদের প্রস্তাবটিই গ্রহণ করা হয়।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভাড়া বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া বেআইনি ও অনৈতিক। কারণ, তমা কনস্ট্রাকশন ও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ২০১০ সালের নীতিমালা অনুসারেই বিআরটিএর সঙ্গে চুক্তি করেছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চার মাসের মধ্যে ট্যাক্সিক্যাব নামানোর কথা ছিল। কিন্তু সেই শর্ত তারা ভঙ্গ করেছে।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১০ সালের নীতিমালা ধরে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তমাকে দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়েছিল। কিন্তু একজন কাজ পাওয়ার পর ভাড়া বাড়ালে অন্য অংশগ্রহণকারীরা বঞ্চিত হয়। আর তখন ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে দরপত্র আহ্বান করলে হয়তো আরও অনেক কোম্পানি তাতে অংশ নিত।
জানতে চাইলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ভাড়া বাড়ানোর হারটা বেশি হয়েছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, ভাড়া কম হলে তা বাস্তবায়ন করা যায় না। এবার সেটা পারা যাবে।
তমা কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মির্জা আজম কাকরাইলে তমা কনস্ট্রাকশনের কার্যালয়ে নিয়মিত বসতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলওয়ে ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বেশ কয়েকটি বড় ঠিকাদারি কাজ পায় তমা কনস্ট্রাকশন। রেলের সবচেয়ে বড় প্রকল্প টঙ্গী-ভৈরব বাজার পথে নতুন রেললাইনের কাজ করছে তমা। মৌচাক-মগবাজার-সাতরাস্তা উড়ালসড়কের একটা অংশের কাজও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জানতে চাইলে মির্জা আজম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা-দুইটা ঠিকাদারি কাজ তমার সঙ্গে করেছি। সেই কাজ শেষ হয়ে গেছে। তবে মানিক (তমার এমডি আতাউর রহমান ওরফে মানিক) আমার ৩০ বছরের বন্ধু। এখনো তা অটুট আছে।’
ট্যাক্সিক্যাবের ব্যবসায় সঙ্গে যুক্ত আছেন কি না জানতে চাইলে মির্জা আজম বলেন, ‘আমি নেই। এমন সুযোগও নেই।’
তমা কনস্ট্রাকশনের এমডি মানিক নিজেকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফরিদউদ্দিন চৌধুরীর বন্ধু বলে পরিচয় দেন। ফরিদউদ্দিন চৌধুরী ট্যাক্সিক্যাব নামানো-সংক্রান্ত যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটির সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বেই একাধিকবার ট্যাক্সিক্যাব চলাচল নীতিমালা পরিবর্তিত হয়েছে।
ফরিদউদ্দিনের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে আতাউর রহমান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্ধুত্ব ঠিক আছে। তবে উনি কোনো আনুকূল্য দেওয়ার লোক না। এ ধরনের কোনো বিষয়ই নেই।’
চুক্তির পর ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা দরপত্রে অংশ নিয়েছি ২০১৩ সালে, আর নীতিমালা ২০১০ সালের। ওই ভাড়ায় পোষায় না বলে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি।’ কিন্তু আগের নীতিমালাতেই তো স্বেচ্ছায় দরপত্রে অংশ নিয়েছিলেন—এর জবাবে তিনি বলেন, ‘কেউ তো আসতে চায় না। আমরা জনগণের কথা চিন্তা করে এসেছি।’
মির্জা আজম এখনো আপনার ব্যবসায়িক অংশীদার কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আতাউর রহমান বলেন, ‘উনি আমাদের সঙ্গে আছেন।’
এ বিষয়ে ফরিদউদ্দিনের বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মোবাইলে বারবার যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
চুক্তি অনুযায়ী, তমা কনস্ট্রাকশন ২৫০টি ট্যাক্সিক্যাব নামানোর কথা। এগুলো ঢাকা ও এর আশপাশে চলবে। আর আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সঙ্গে চুক্তি ৪০০ ট্যাক্সিক্যাবের। এর মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে ২৫০টি এবং চট্টগ্রাম মহানগর ও কক্সবাজারের মধ্যে বাকি ১৫০টি চলাচল করবে। আগামী পয়লা বৈশাখ ৪৭টি এসি ট্যাক্সিক্যাব নামানোর পরিকল্পনা নিয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে তমা ১৯টি এবং আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ২৮টি ট্যাক্সিক্যাব নামানোর কথা।

শেয়ার করুন