জামায়াত নিষিদ্ধের আরজি

0
74
Print Friendly, PDF & Email

চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে রাজাকার, আলবদর ও সংগ্রামের বিরুদ্ধে সুপারিশ
আসাদুর রহমান
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও দলটির তত্কালীন সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাত্তরে গণহত্যাসহ ৭ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এতে জামায়াতে ইসলামী, এর অঙ্গসংগঠন, মুখপত্র হিসেবে দৈনিক সংগ্রাম ও নেতাকর্মীদের দায়ী করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। ৭ মাস তদন্ত শেষে দলটির যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা আগামীকাল বৃহস্পতিবার চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দাখিল করার কথা রয়েছে। তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান গতকাল মঙ্গলবার সংস্থাটির ধানমণ্ডির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
হান্নান খান জানান, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী ও দলটির তত্কালীন সহযোগী সংগঠনগুলো সারা দেশে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, তদন্তে তার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। ৩৭৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি ২৭ মার্চ আমরা প্রসিকিউশনের কাছে হস্তান্তর করব। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র এবং এসব অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থতাসহ ৭ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। সংগঠনটির বিরুদ্ধে সাক্ষি মানা হয়েছে ৭০ জনকে।
নির্বাচন কমিশনের শর্ত পূরণ না করায় গত বছরের ১ আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, হত্যাকাণ্ডে সম্মতি ও সহযোগিতার দায়ে জামায়াতের তত্কালীন আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই ৯০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে জামায়াতে ইসলামীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া জামায়াতনেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, আবদুল কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের সাজার রায়েও জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো উঠে আসে। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছেন, সাধারণ জ্ঞান ও দালিলিক প্রমাণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, জামায়াত ও এর অধীন  সংগঠনের প্রায় সবই সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন। গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী একটি ক্রিমিনাল দল হিসেবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজ করেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে। ঘোষিত রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, পাকিস্তান রক্ষার নামে সশস্ত্র সহযোগী বাহিনী গঠন করে নিরস্ত্র বাঙালি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বুদ্ধিজীবীসহ স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের নিশ্চিহ্ন করতে জামায়াতে ইসলামী বিশেষ ভূমিকা রাখে। ওই সময় তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে। এসব বাহিনীর মধ্যে রয়েছে রাজাকার, আলবদর, আল শামস, শান্তি কমিটি। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে জামায়াতের অনেক নেতা নিজের নামে বাহিনী গড়ে তোলেন। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধীরা শহীদদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কিংবা অনুশোচনা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছেন বলে কোনও প্রমাণ জাতির সামনে নেই। রায়ে আরও বলা হয়, একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে সরকারের নির্বাহী বিভাগ, সরকারি-বেসরকারি সংগঠনসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের কর্ণধার হিসেবে এ ধরনের স্বাধীনতাবিরোধীদের থাকার অধিকার নেই।
জামায়াতনেতা আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ের পর গড়ে ওঠা গণজাগরণের পর আইন সংশোধন করে দলের বিচারের বিধানও যোগ করা হয়। আগের আইনে শুধু যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তির বিচারের সুযোগ ছিল। এর পরে গত বছর ১৮ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী ও এর তত্কালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ; পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা দিতে গঠিত শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনী এবং দলীয় মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ৪-এর ১ ও ৪ এর-২ ধারা অনুযায়ী তারা অপরাধ করেছে। প্রতিবেদনে সংগঠনের নীতি, নীতিনির্ধারক ও সব নেতাকর্মীকে এসব অপরাধের জন্য দায়ী করে নিষিদ্ধ করার আরজি জানানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে ৭ খণ্ডে ২ হাজার ৩০৩ পৃষ্ঠার জব্দ তালিকা ও দালিলিক প্রমাণপত্র, ১০ খণ্ডে ৩ হাজার ৭৬১ পৃষ্ঠার অন্যান্য নথি, ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত মামলাগুলোর রায় ও জামায়াতের বিরুদ্ধে পর্যবেক্ষণের অনুলিপিও দাখিল করার কথা রয়েছে।
বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে কী ধরনের সাজা হতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ বলেন, এ সংগঠনের বিরুদ্ধে যেসব অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে, ট্রাইব্যুনালে তা প্রমাণিত হলে বিভিন্ন ধরনের সাজা হতে পারে। সংগঠনটি নিষিদ্ধ হতে পারে, তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।
তদন্ত সংস্থা জানায়, আইন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধে ব্যক্তির পরে সংগঠনের বিচারে এই প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন জমা হতে যাচ্ছে। জামায়াত গঠিত হওয়ার পর থেকে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী, স্বাধীনতা সংগ্রামকালীন এবং স্বাধীনতা পরবর্তী কালের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করেছে তদন্ত সংস্থা। দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণের পাশাপাশি মৌখিক সাক্ষ্য-প্রমাণও প্রস্তুত করা হয়েছে।  তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিকাণ্ডের মতো অপরাধের জন্য জামায়াত কখনোই ভুল স্বীকার করেনি; বরং ১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর জামায়াতের প্রথম এবং ১৯৮১ সালের ২৯ মার্চ দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনে দলটির তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে সঠিক বলেই উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, একাত্তরে বাংলাদেশের কনসেপ্ট ঠিক ছিল না। সে সময় পাকিস্তানের নাগরিক (পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতের আমির) গোলাম আযম বলেছিলেন, বাংলাদেশ মাটির নাম, আদর্শের নাম নয়। এ বিষয়গুলোও উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে জামায়াত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে দলের নেতাকর্মী, সদস্যরা হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট চালায়। সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্মান্তরিত এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র দুদিন আগে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে হত্যা করে বুদ্ধিজীবীদের।
তদন্ত সংস্থা জানায়, অপরাধ প্রমাণের জন্য জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামই যথেষ্ট। তার পরও তথ্য-প্রমাণ আরও সমৃদ্ধ, গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক করে তুলতে মুক্তিযুদ্ধকালীন কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ, প্রতিবেদন থেকে আমরা তথ্য সংগ্রহ করেছি। এ ছাড়া তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকেও জামায়াতের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা ‘ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ অ্যাবস্ট্রাক্ট অব ইন্টেলিজেন্স-১৯৭১’ শিরোনামে দালিলিক প্রমাণের সঙ্গে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সংবাদ সন্মেলনে তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সানাউল হক, জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতের তৃণমূল নেতাদের প্রতিক্রিয়া
রাজশাহী থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় রাজশাহী মহানগর জামায়াতের রাজনৈতিকবিষয়ক সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আবু মুহাম্মদ সেলিম বলেছেন, বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি মুসলিম দেশ। এ দেশে ধর্মীয় কোনও দল থাকতে পারবে না এটা কোনও বিবেকমান মানুষ মনে করে না।
বগুড়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বগুড়া জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যক্ষ আবদুল হক সরকার বলেন, সরকার ইচ্ছা করলেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারবে না।
খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে জনগণ মেনে নেবে না।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল করিম বলেন, দেশ অগণতান্ত্রিকভাবে চলছে। সরকার মনগড়াভাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধের পাঁয়তারা করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা কেরামত আলী বলেন, এটা হবে রাষ্ট্রের হঠকারী সিদ্ধান্ত।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান,  জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, জামায়াত একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী রাজনৈতিক দল। বর্তমান সরকার জামায়াত নিষিদ্ধের ব্যাপারে যে কাজ করছে তাতে আমরা আনন্দিত।

শেয়ার করুন