বিএনপির নির্বাচন বর্জনের কারণ জানতে চেয়েছে ইইউ

0
115
Print Friendly, PDF & Email

৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট কেন অংশ নেয়নি- নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে সেটি জানতে চেয়েছে ঢাকা সফর করে যাওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। দু’দিনের সফরের শেষ দিনে গতকাল দুপুরে হোটেল সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এটি জানার চেষ্টা করেন তারা। জবাবে নাগরিক সমাজের তরফে বলা হয়েছে, কারচুপি ও শক্তি প্রয়োগের আশঙ্কায় বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ওই আশঙ্কা যে যৌক্তিক ছিল তা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে বলেও মত দেয়া হয়। উপজেলা নির্বাচনের শুরুতে সহিংসতা কম হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে ব্যাপক কারচুপি, বল প্রয়োগ, কেন্দ্র দখলসহ সারা দেশে রক্তাক্ত ভোট হয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইইউ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপিরা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পররবর্তী রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বিরোধী নেতাকর্মীদের হয়রানি, গ্রেপ্তার-নির্যাতনের কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হয়। বৈঠকে অংশ নেয়া একজন জেলখানায় তার অভিজ্ঞতা ও নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরেন। মানবাধিকার পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ১২ শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় অভিশপ্ত রানা প্লাজার মালিক জামিন পায় কিন্তু বিরোধী মতের একটি প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক জামিন পাচ্ছেন না। কয়েক মাস ধরে তাকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। বিরোধী মতের অনেক মিডিয়া বন্ধ, অনেককে বিভিন্নমুখী চাপে রাখা হয়েছে। বৈঠকে নতুন তথ্য-প্রযুক্তি আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। ঐ আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেয়া ক্ষমতার অপব্যহারের আশঙ্কা করা হয়। বৈঠকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ত্রুটি-বিচ্যুতির সমালোচনা করেন অংশগ্রহণকারী কয়েকজন। নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা খর্ব করা এবং বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টারও সমালোচনা হয় বৈঠকে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে এসব চেষ্টা যে কেবল প্রতিবন্ধকই নয়, বরং দিনে দিনে তা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেবে- এমনটি স্পষ্টই বলেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নাগরিক সমাজসহ সব মত ও পথের লোকের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নৃ-তাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার তাগিদ দেয়া দেন। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সরকারসহ নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠকে ইইউ পার্লামেন্ট সদস্যরা দেশের শ্রম পরিস্থিতিও জানতে চেয়েছেন। রাজনীতি, মানবাধিকার ও শ্রমমান প্রশ্নে তাদের পর্যবেক্ষণও তুলে ধরেছেন। নিন্দা করেছেন গুম ও বিচার-বহির্ভূত সব হত্যাকাণ্ডের। উদ্বেগ জানিয়েছেন নির্বাচনী সহিংসতা বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদের ওপর আঘাতের। নতুন নির্বাচন প্রশ্নে ইইউ তো বটেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানে কোন বিভ্রান্তি বা ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই- সেটি খোলাসা করে বলেছেন। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে ইইউ’র সমর্থন-সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। বৈঠকে সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, খ্যাতিমান কূটনীতিক ফারুক সোবহান, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান, টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও গবেষক সঞ্জিব দ্রং ও মেঘনা গুহ ঠাকুরতা অংশ নেন। বৈঠক শেষে ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রমমানসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমরা শুনেছি। ভাবনাগুলোও শেয়ার করেছি। নতুন নির্বাচনের বিষয়ে কোন আলোচনা হয়েছে কিন- বৈঠকের পর ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর ইইউ পার্লামেন্টে যে রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে তাতে দু’টি বিষয় স্পষ্ট ছিল। কার্যকর সংলাপের মধ্য দিয়ে সবাইকে নিয়ে একটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠান। ইইউ ওই অবস্থানে কোন পরিবর্তন আনেনি- এটা ওই বৈঠকে দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ সম্পর্কিত অপর এক প্রশ্নে দেবপ্রিয় বলেন, নির্বাচন তো একদিন হবে। তার আগে জীবন চলতে হবে। অর্থনীতি বাঁচতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা রাখতে হবে। আইনের শাসন, মানবাধিকার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিরাপত্তা, তাদের ভবিষ্যৎ, প্রাসঙ্গিক সব বিষয়েই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে টিআইবি’র নির্বাহী ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বৈঠকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার হস্তক্ষেপে উদ্বেগ করেছেন ইইউ প্রতিনিধিরা। সেখানে তথ্য প্রযুক্তির নতুন আইন নিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। এটি কালো আইন। এর সংশোধনের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতায় ইইউ’র উদ্বেগ
উপজেলা নির্বাচনের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেই সঙ্গে উপজেলা নির্বাচনে মন্ত্রীরা আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না- এই বিষয়টিও নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছে ইইউ। সকালে নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইইউ’র সফররত প্রতিনিধি দল এ বিষয়গুলো জানতে চান বলে জানিয়েছে ইসি সূত্র। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে ঢাকায় সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের  প্রতিনিধি দলের প্রধান জিন ল্যাম্বার্ট উপজেলা নির্বাচনের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সহিংসতার কারণে জানতে চান আবদুল মোবারকের কাছে। উত্তরে মোবারক বলেছেন- স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা হয়ে থাকে। তবে সহিংসতা রোধে নির্বাচন কমিশন  চেষ্টা করছে। মন্ত্রীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও কেন কমিশন ব্যবস্থা নিচ্ছে না- ইইউ’র প্রতিনিধিদলের এমন প্রশ্নের জবাবে মোবারক বলেন- আমাদের দেশে এখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কমিশন অ্যাকশনে যাবে। নির্বাচন কমিশনাররা কার দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার বলেন- তারা প্রেসিডেন্ট দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। এদিকে বৈঠক শেষে জিন ল্যাম্বার্ট সাংবাদিকদের বলেন- সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী দেখতে চান তারা। আগামীতে যে কোন নির্বাচনেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব দলের অংশগ্রহণ চায়। ল্যাম্বার্ট বলেন- নতুন কোন নির্বাচনের কথা আমরা বলিনি। এটা আমাদের দাবি না। তবে এদেশের বিরোধী দল রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন দেখতে চায়। ভবিষ্যতের যে কোন নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ চান তারা। দশম জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর  বিষয়ে  তিনি বলেন, পরিষ্কার কারণ হলো এবারের নির্বাচনে অনেকগুলো আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন প্রার্থীরা এবং প্রধান বিরোধী দল নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল। এছাড়া, অনেকগুলো দল নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে জন্য আমাদের পর্যবেক্ষক এখানে আসেননি। এছাড়া, ইসি’র বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, তারা কি করতে পারে এবং কি করতে পারে না- এ  নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কি করা যাবে, কি করা যাবে না- সে বিষয়ে ইসি’র কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন এখানে খুবই দরকার। অনুভব করি যে, এ রকম গণতান্ত্রিক দেশে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব হলো ভোটারদের সম্মানিত মনে করা। নির্বাচন কবে হবে তা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরই নির্ভর করে। আমাদের অবস্থান হচ্ছে- আমরা তাই বাংলাদেশের রাজনীতির উন্নতি যাতে যথাযথভাবে এগোয়। জিন ল্যাম্বার্টের  নেতৃত্বে মঙ্গলবার চার সদস্যের প্রতিনিধি দল দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. আবদুল মোবারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

শেয়ার করুন