জামায়াতের বিরুদ্ধে শুরু হচ্ছে বিচারের প্রক্রিয়া

0
56
Print Friendly, PDF & Email

আইনের অস্পষ্টতা কাটেনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি কী, এ নিয়ে বিতর্ক থাকছেই। এর মধ্যেই শুরু হচ্ছে বিচারের প্রক্রিয়া। মুক্তিযুদ্ধকালে ‘অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে আগামীকাল ২৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে মানবতা-বিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা।
বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ৪৪তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলে দেশের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ হবে। কারণ এটিই হবে বাংলাদেশে সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বিচারের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথম পদক্ষেপ।
পাশাপাশি রয়েছে আইন নিয়ে উদ্বেগ। বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ সংশোধন করে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনের বিচারের বিধান তৈরি করা হলেও অপরাধী সংগঠনের শাস্তি কী, তা আইনে উল্লেখ নেই। এ কারণে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপক্ষকে শুধু জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করলেই হবে না, বিদ্যমান আইনেই যে সংগঠনটিকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব, তা-ও প্রমাণ করতে হবে।
তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার বিষয়ে কাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ধানমন্ডির সেফ হোমের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন হবে। এরপর তদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে দাখিল করা হবে।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। কিন্তু দেশের তরুণ প্রজন্ম ওই রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করে, শাহবাগে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। তারা সরকারের কাছে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের দাবি জানায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান রেখে সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধনী সংসদে পাস হয়। ওই সময় আইনের ৩ ধারা সংশোধন করে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনেরও বিচারের বিধান করা হয়। কিন্তু ২০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সাজার পাশাপাশি সংগঠনের সাজা কী হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি; যার কারণে সংগঠনের শাস্তি কী, এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
ওই সময়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ আনিসুল হক (বর্তমানে আইনমন্ত্রী) বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ সংশোধন করে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনের বিচারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধী সংগঠনের শাস্তি কী হবে—এ বিষয়ে আইনে কিছু বলা নেই। এ ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হতে পারে।’ ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় তাঁর ওই বক্তব্য ছাপা হয়।
তবে গত শনিবার এ নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আইনে সংগঠনের বিচারের বিধান যুক্ত হওয়ার পর গত বছরের ১৮ আগস্ট জামায়াতের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা। এরই মধ্যে ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। তিন সদস্যের ওই হাইকোর্ট বেঞ্চের এক সদস্য বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম সংগঠনের বিচারের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের আইনের দুর্বলতা নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দেন। তাতে বলা হয়, ‘মূল আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বিচারের সম্মুখীন করার বিধান না থাকলেও সম্প্রতি আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে দলকে বিচারের সম্মুখীন করার বিধান করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ওই আইনে কোনো দল মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে কী ধরনের দণ্ড ও সাজা প্রদান করা হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। আমার নিঃসংকোচ অভিমত এই যে, ওই আইনে মানবতাবিরোধী কোনো দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে, সেই দলের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দণ্ড আরোপের বা গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান করা প্রয়োজন।’
কিন্তু এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের আইনেও আর সংশোধন আসেনি, আর বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান। ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান আইনে দলের বিচারের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার আভাস তাঁর ওই পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই। কারণ, আইনের ২০(২) ধারায় বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত সাপেক্ষে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড বা অপরাধের গভীরতা বিবেচনায় ওই ধরনের যেকোনো সাজা দিতে পারবেন। এই বিধান অনুসারে, সংগঠন দোষী সাব্যস্ত হলে সেটিকে নিষিদ্ধ করা বা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা বা যেকোনো সাজা ট্রাইব্যুনাল দিতে পারেন।
জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ প্রথম আলোকে বলেন, ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্টে ‘ব্যক্তি’র (পারসন) সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোম্পানি, অ্যাসোসিয়েশন বা ব্যক্তিগোষ্ঠীও ‘ব্যক্তি’ বিবেচিত হবে। সে ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের আইনে ২০ ধারায় উল্লেখিত ‘ব্যক্তির’ মধ্যে সংগঠনও পড়বে। আর ট্রাইব্যুনালের যেকোনো সাজা দেওয়ার ক্ষমতা আইনেই আছে। তিনি যুক্তি দেখান, যাবজ্জীবন, ৯০ বছর বা আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজার কোনো উল্লেখ আইনে নেই, কিন্তু ‘যেকোনো সাজার’ আওতায় ট্রাইব্যুনাল ওই দণ্ড দিয়েছেন। সংগঠনের ক্ষেত্রেও একইভাবে শাস্তি দেওয়া সম্ভব।
তবে তুরিন আফরোজ স্বীকার করেন, ‘অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা হলে বিচারের সময় এ বিষয়টি দুই পক্ষের মধ্যে অন্যতম আইনি বিতর্কের সৃষ্টি করবে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী।

শেয়ার করুন