দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় : জাসদ :

0
73
Print Friendly, PDF & Email

চতুর্থ দফায় অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ উপজেলায় জনতার বিজয় ছিনিয়ে নিলো সরকারি দল। গতকাল বিভাগের ২০টি উপজেলায় এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় সব উপজেলায় ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পরপরই সরকার দলীয় ক্যাডাররা প্রতিপক্ষ প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে চর দখলের মতো কেন্দ্র দখলে নিয়ে ইচ্ছামত ব্যালটে সিল পেটায়। নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, এজেন্ট বের করে দেয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সিল পিটানোসহ ভোট শুরুর আগে বাক্সে ব্যালট ঢুকিয়ে রাখার বিস্তর অভিযোগ এনে অধিকাংশ উপজেলায় ভোটগ্রহণ শুরুর দুই এক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি সহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা। ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং পুন ভোটের দাবিতে আজ সোমবার আগৈলঝাড়ায় অর্ধদিবস ও মঠবাড়িয়ায় সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট। বিভিন্ন স্থানে প্রায় শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে বিএনপি’র দলীয় সূত্রে জানা গেছে। উজিরপুরেও প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ব্যাপক অনিয়ম, ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, এজেন্ট বের করে দেয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সিল মারাসহ ভোট শুরুর আগে বক্সে ব্যালট ঢুকিয়ে রাখার বিস্তর অভিযোগের মধ্য দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ৬২টি সেন্টারের মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ কর্মীরা আনন্দ উত্সব করে জাল ভোট দিয়েছে। অনেক ভোটার ভোট দিতে এসে বাড়িতে ফেরত গিয়েছে। চারদিকে কেন্দ্র দখলের খবর শুনে অনেক ভোটাররা ভোট দিতে আসেনি। উজিরপুরের ৫টি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। কেন্দ্রগুলো হলো দরগাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আটিপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হস্তিশুন্ড মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মুন্ডপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরমানন্দসাহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ সময় এই কেন্দ্রগুলোর দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছে ছাত্রদল নেতা এ.বি.এম সাইদুল ইসলাম, কাজী ফুয়াদ হাসান, বি,এনপি নেতা আসাদুজ্জামান বাদশা, বিএনপি সমথক শাহজাহান বেপারী, সাইফুল হাওলাদার, শহিদুল ইসলাম বেপারী, মহিলা সমর্থক মায়া বেগম, বিএনপি নেতা হাসান মালিক, হাসান বেপারী, আওয়ামীলীগ নেতা মিজানুর রহমান কবির, যুবলীগ নেতা আবু তালেব, আওয়ামীলীগ সমর্থক ইউপি সদস্য আবু খান। আহতদের মধ্যে গুরুতর আহত হাসান মালিক বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মাজেদ তালুকদার ভোট কারচুপির অভিযোগে এই নির্বাচন বাতিল এবং পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানে আহবান জানিয়েছেন।
উজিরপুরের বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও মহাজোটের প্রধান শরিক দল জাসদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বাদল বলেন, সরকারি দল তার এজেন্টদের মারধর করেছে। কেন্দ্র থেকে বের করে ইচ্ছামত ব্যালটে সিল পিটিয়ে জনতার বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় বরিশাল প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন বাদল। তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। আর নির্বাচন কমিশন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও ইচ্ছায় কাজ করলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
বানারীপাড়ায় ভোট কারচুপির অভিযোগে বিএনপি সমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহ আলম হাওলাদার ভোট বর্জন করে নির্বাচন স্থগিতের আহবান জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের কাছেও তিনি আবেদন করবেন বলে জানান। এছাড়া একই অভিযোগে আ. লীগের বিদ্রোহী মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী আমিরুন্নেচ্ছা এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সিহাবউদ্দিন আহমেদ ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বানারীপাড়া উপজেলার বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান, পুরুষ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীরা রবিবার দুপুরে কেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতির অভিযোগে ভোট বর্জন করেছেন। স্থানীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. শাহ আলম মিঞা-আনারস, বিএনপি সমর্থিত ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হাবিবুর রহমান জুয়েল-টিউবওয়েল ও বিএনপি সমর্থিত তাসমিয়া সিদ্দিকা-প্রজাপতি ভোট বর্জন করে আটটি ইউনিয়নের ৩৮টি ভোট কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি করেছেন।
আগৈলঝাড়ায় বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বর্জন করেছে। এদের সাথে পুরুষ ও মহিলার ভাইস চেয়ারম্যান প্রর্থীরাও একই অভিযোগে ভোট বর্জন করেছে। নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়ে জেল রিটার্নিং অফিসারসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত আবেদনও করেছেন তারা। সরকার দলের প্রার্থীর ক্যাডাররা ভোট কেন্দ্র দখল করে তাদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে সকাল ১০টার মধ্যে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে ফেলেছে। ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং পুনরায় ভোটের দাবিতে আজ সোমবার বিএনপি আগৈলঝাড়ায় অর্ধবেলা হরতাল ডেকেছে।
ঝালকাঠি
ঝালকাঠির ৪ উপজেলায় ভোট বর্জন করেছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। গতকাল ভোট গ্রহণ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঝালকাঠি সদর, নলছিটি ও কাঠালিয়া উপজেলার বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ভোট কারচুপি ও কেন্দ্র থেকে তাদের এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগে ভোট বর্জন করেন। দুপুর ২টার পর একই অভিযোগে ভোট বর্জন করেন রাজাপুর উপজেলার বিএনপি প্রার্থীরা। এদিকে নির্বাচনে রাজাপুরে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী নাসিম আকনের ওপর হামলা করেছে আ.লীগ কর্মীরা। সকালে পশ্চিম কানুদাসকাঠি সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় নাসিমের ব্যবহৃত গাড়িটিও ভাংচুর করা হয়। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় যুবলীগ নেতা বুলবুল বলেন, নাসিমের বাহিনীই প্রথম আ.লীগ কর্মীদের ওপর হামলা করে একজনকে আহত করলে জনতা তাদের ১ ঘণ্টা আটকে রাখে। এছাড়াও রাজাপুরে আরো কয়েকটি সংঘর্ষে উভয় দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়।
পটুয়াখালী
প্রশাসনের নীরবতা, কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেয়া এবং ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া সহ বিভিন্ন অভিযোগে পটুয়াখালী সদর উপজেলায় নির্বাচন প্রত্যাখ্যান ও বর্জন করেছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী গোলাম সরোয়ার এবং জামায়াতের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী অ্যাডভোকেট নাজমুল আহসান। বিকালে পটুয়াখালী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা এ অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম সরোয়ার জানান, ৮৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬২টি কেন্দ্র আ.লীগ সমর্থিত ক্যাডাররা দখল করে নেয়। একই অভিযোগ করে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শাহাদত্ হোসেন মৃধা জানান, ৮৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫০টি কেন্দ্র দখল করেছে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থীর ক্যাডাররা।
এদিকে জেলা রিটার্নিং অফিসার মো. নজরুল ইসলাম জানান, সহিংসতা এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সদর উপজেলার ৮টি এবং দুমকী উপজেলার ৫টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে পুনরায় ভোট হবে বলেও তিনি জানান। তিনি আরো জানান, বেলা ১১টার দিকে শহরের শেরে বাংলা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আনারস প্রতীকের সমর্থক জামাল হোসেন নামের এক ভোটারকে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মারুফ আলম ১ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরম্নর ইসলাম জানান, কমলাপুর ইউনিয়নের বড়াইকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৩ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে বাউফল উপজেলায়। সেখানেও কেন্দ্র দখল আর জাল ভোটের অভিযোগে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী শহিদুর রহমান এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী তসলিম তালুকদার নির্বাচন বর্জন করেছে।
দুমকী উপজেলার উত্তর শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউল হক আহতদের নাম বলতে পারেননি।
পিরোজপুর
আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থীর কেন্দ্র দখল, ভোট কাটা, ব্যাপক জাল ভোট প্রদান, সহিংসতা, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে ও পুনঃ নির্বাচনের দাবিতে পিরোজপুর সদর ও মঠবাড়িয়া উপজেলায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচন বয়কট করেছেন।
গতকাল ভোট গ্রহনের শুরু থেকেই পিরোজপুর সদর ও মঠবাড়িয়ার প্রায় সব কেন্দ্রই দখল করে নেয় আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থীরা কর্মী সমর্থকরা। বাধা দিলে পিরোজপুরের শংকরপাশা, সিকদার মল্লিক, টোনা, কলাখালী, দুর্গাপুর, পিরোজপুর পৌর এলাকার সব কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থকদের ওপর হামলা করা হয়। সিকদার মল্লিকে বিএনপির দুই কর্মীকে গুলি করে গুরুতর আহত করে আওয়ামী ক্যাডাররা। মঠবাড়িয়া উপজেলায় ভোটের আগের রাতে ৩০টি কেন্দ্রে ব্যালট পেপার কেটে বাক্সে ঢোকানো এবং ভোটের দিন ৭৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭০টি কেন্দ্র দখল ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততার অভিযোগ এনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী রুহুল আমীন দুলাল নির্বাচন বর্জন করেন। প্রতিবাদে আজ সোমবার মঠবাড়িয়ায় সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট। নির্বাচন চলাকালীন সময় পিরোজপুরে বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশতাধিক এবং মঠবাড়িয়ায় শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে বিএনপি’র দলীয় সূত্রে জানা গেছে। মঠবাড়িয়ায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী দুলাল জানান, আহতদের মধ্যে যুবদলের লিটন ও শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদেরকে বরিশাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের প্রায় কেন্দ্রই আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা দখল করে নিতে চাইলে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে একজন পুলিশসহ অন্তত বিশ জন আহত হয়। আওয়ামী ক্যাডাররা নির্বাচন কভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ওপরও এক সময় চড়াও হয়। এ সময় ঢাকা থেকে যাওয়া এনটিভির সাংবাদিকরা কোনমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন বিকেল তিনটা থেকে পিরোজপুর-১ আসনের এমপি একেএমএ আউয়াল জিয়ানগর উপজেলা সদরে অবস্থান করছিলেন।

শেয়ার করুন