কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্সে আগুন জালভোটের মহোৎসব

0
64
Print Friendly, PDF & Email

কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, অগ্নিসংযোগ, পোলিং এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া ও জাল ভোটের মহোৎসবের মধ্য দিয়ে গতকাল চট্টগ্রামের ৭ উপজেলায় ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে । বিশেষ করে আনোয়ারা, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও বাঁশখালীতে সকাল থেকেই ভোট চলাকালে বিভিন্ন কেন্দ্রে সরকার সমর্থকদের তাণ্ডব, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান ও সংঘর্ষের ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আনোয়ারায় সকাল থেকেই পোলিং এজেন্টদেরকে বের করে দিয়ে একের পর এক কেন্দ্র দখল, পুলিশ এবং দলীয় লোকজনের সহায়তায় ব্যালট ছিনতাই করে সরকার সমর্থকরা সিল মেরেছে বলে অভিযোগ। ফটিকছড়িতেও ব্যাপক সহিংসতা, অনিয়ম, নেতাকর্মীদের পুলিশি হয়রানি, প্রিসাইডিং অফিসারের সামনে জোর করে সিলমারা ও ভোট ডাকাতির অভিযোগ ওঠেছে। রাউজানে আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোটারের কাছ থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নিজেদের প্রার্থীর প্রতীকে সিল মেরেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাঙ্গুনিয়ায় একটি ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স ছিনতাই শেষে তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অপর একটি ভোটকেন্দ্রে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছে। প্রায় অর্ধ শতাধিক কেন্দ্রে জোরপূর্বক ভোট নেয়ার অভিযোগ এসেছে সব প্রার্থী থেকেই। বাঁশখালীতে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, পুলিশের ফাঁকা গুলি বর্ষন ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া নগরীর সবচেয়ে কাছের উপজেলা বোয়ালখালীতে সংঘাত ঠেকাতে পুলিশকে দফায় দফায় এ্যাকশনে যেতে দেখা গেছে। চার রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষনের কথা স্বীকারও করেছে পুলিশ । প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত: ৫ ব্যক্তি কমবেশি আহত হয়েছেন। ৩০টি কেন্দ্রে কারচুপি ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ আনার পাশাপাশি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপি ও জামায়াত বোয়ালখালীতে নির্বাচন প্রত্যাখান করে পুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। আনোয়ারায় বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী জালাল উদ্দিন আহমেদ কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও ভোটারদের ভয় ভীতি দেখানোর অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। ফটিকছড়ি ও রাউজানের বিভিন্ন কেন্দ্রেও পুন: নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা।

আনোয়ারায় বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী জালাল উদ্দিন আহমেদ কালা বিবির দিঘী এলাকায় নির্বাচনী কার্যালয়ে গতকাল দুপুর ২ টাং সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করে বলেন, কেন্দ্র দখল করে জাল ভোটের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনার একেএম মোবারক আলীকে ফোনে জানিয়েছি। উনার সাথে আমার তিন বার কথা হয়েছে। উনি ফোনে বিষয়টি দেখার জন্য সহকারী রিটার্নিং অফিসার, আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। তারপরও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার কোনো উদ্যোগ নেননি। আমি সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। তাদের সহায়তায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ভোট কেন্দ্র দখল করে একচেটিয়াভাবে জাল ভোট দিয়েছে। চর দখলের মতো সকাল থেকেই তারা আমার এজেন্টদেরকে বের করে দিয়ে একের পর এক কেন্দ্র দখল করতে থাকে । পুলিশ এবং সরকার দলীয় লোকজনের সহায়তায় ব্যালট ছিনতাই করে সিল মেরেছে। ১২ টার পর আমি আমার এজেন্টদেরকে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যেতে বলেছি। আমি নির্বাচন বর্জনের পর অন্যান্য কেন্দ্রগুলোও তারা দখল করে সিল মেরেছে।

জালাল উদ্দিন আহমেদ আজাদীকে জানান, আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী তৌহিদুল হক চৌধুরীর সমর্থকেরা ২৭টি কেন্দ্র থেকে আমার পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। তার সমর্থকেরা ভোট কেন্দ্র দখলে নিয়ে ভোটারের কাছ থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে জাল ভোট দিয়েছেন এবং ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে উপজেলার সব কটি ভোটকেন্দ্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন।

তিনি বলেন, উপজেলার বরুমচরা জনতা প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম বরুমচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাতরী উচ্চ বিদ্যালয়, গুয়াপঞ্চক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরৈকোড়া নয়নতারা উচ্চ বিদ্যালয়, ওষখাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরুমচরা ছমদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কৈনপুরা উচ্চ বিদ্যালয়, হাইলধর বশির উজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়, পীরকাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ ইছাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুজরা উচ্চ বিদ্যালয়, তেকোটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মালঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,পূর্বকন্যারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাহাতা পাটনী কোঠা উচ্চ বিদ্যালয়, পূর্ব বারখাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,তৈলারদ্বীপ বারখাইন এরশাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়, কেয়াগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,জুইদন্ডী জেকেএম নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দুধকুমড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,ঝিওরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিলাইগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র গুলো বেলা ১২টার মধ্যে দখল করে নেয় সরকার দলীয় লোকজন।

আমাদের ফটিকছড়ি প্রতিনিধি জানান, ফটিকছড়িতে ব্যাপক সহিংসতা, অনিয়ম, নেতাকর্মীদের পুলিশি হয়রানি, প্রিসাইডিং অফিসারের সামনে সিলমারা আর সরকারি দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে ৫১টি কেন্দ্রে পুনঃনির্বাচন দাবি করেছেন বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর । বিকাল তিনটায় পূর্ব ফরহাদাবাস্থ নিজ বাস ভবনে সরওয়ার আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেন, সরকারী দলের এমপি নজিবুল বশর এবং চট্টগ্রামের এডিসি রাব্বি মিঞার প্রত্যক্ষ মনিটরিংয়ে ফটিকছড়ি উপজেলায় ভোট ডাকাতি হয়েছে। এছাড়া ভূজপুর থানা পুলিশের ওসি কবির হোসেনের বিরুদ্ধে আন্দার মানিক কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে প্রকাশ্যে সিল মারার অভিযোগ করেন বিএনপির এ প্রার্থী।

নির্বাচন চলাকালে সমগ্র উপজেলায় বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশের বিশেষ টিমের কোন ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রির্টানিং অফিসারের ভূমিকাও ছিল রহস্যজনক। তাকে বার বার লিখিত অভিযোগ জানানোর পরও তিনিকোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো অভিযোগ করেন, সরকার পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এ উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনতে প্রশাসনকে তাদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করেছে। ভোটের তিনদিন আগ থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি এবং নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে আতংক ছড়িয়ে দেয়। গতকাল উপজেলার ৫১টি কেন্দ্রে জোর করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যালট বক্সে ঢুকিয়ে দেয় সরকার সমর্থকরা। উপজেলার বালিকা স্কুল কেন্দ্রে সিল মারা অবস্থায় ব্যালট পেপারসহ একজনকে হাতেনাতে আটক করে রিটার্নিং অফিসারকে অভিযোগ করা হলেও তিনি তা আমলে নেননি।

সাতকানিয়া প্রতিনিধি জানান, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, নির্বাচনী সামগ্রীতে অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে দিয়ে সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোট কেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াত শিবির নেতা-কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারার সময় ছবি তোলায় সাংবাদিকদেরকে লাঞ্ছিত করেছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা। এসময় তারা একাধিক সাংবাদিকের ক্যামেরা ও মোবাইল কেড়ে নিয়েছে। এছাড়াও কয়েকটি কেন্দ্র দখলের ঘটনায় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। এতে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার সহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। ব্যালট পেপার ও বাক্সসহ নির্বাচনী সামগ্রী পুড়ে দেয়ায় একটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে।

বাঁশখালী প্রতিনিধি জানান, বাঁশখালীতে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, পুলিশের ফাঁকা গুলি বর্ষন ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বৈলছড়ি পশ্চিম চেচুরিয়া ঘোনাপাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পৌনে ১টার দিকে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী ভোট কেন্দ্রে ঢুকে একটি ব্যালট বাক্স ও কিছু খালি ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। এই সময় বাঁধা দিতে গিয়ে আওয়ামীলীগ সমর্থিত আবদু ছালাম নামের এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রে ঘণ্টাদেড়েক ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষন করা হয়। পরে আইনশৃংখলা বাহিনী পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ব্যালট পেপারসহ বাক্সটি উদ্ধার করে পুনরায় ভোট গ্রহণ শুরু করে। এছাড়া আরো কয়েকটি স্থানে প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে ।

রাউজানে ৬৫ কেন্দ্রে পুন:নির্বাচন দাবি : রাউজানে ৬৫টি ভোট কেন্দ্রে পুন:নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন ১৯ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন । তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার সমর্থিত প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন বাবুলের সমর্থক আওয়ামী ছাত্রলীগের চিহ্নিত সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে ভোটারদেরকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা প্রদান করে। আমাকে এবং আমার এজেন্টদেরকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। রাউজান উপজেলার ৮৩টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৬৫টি ভোট কেন্দ্রে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় আমার নির্বাচনী এজেন্টদেরকে জোরপূর্বক ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে একতরফাভাবে ব্যালট পেপারে সিল মারে। এ বিষয়ে আমি প্রশাসনের কাছে বার বার অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার না পেয়ে আমি জবরদখলকৃত ৬৫টি ভোট কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করে পুররায় নির্বাচনের দাবিতে জেলা রিটার্নিং অফিসার বরাবরে আবেদন করেছি।

বোয়ালখালীতে ফলাফল প্রত্যাখ্যান : এদিকে বোয়ালখালীতে বিএনপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলহাজ্ব বদরুছ মেহেরের নির্বাচন সমন্বয়কারী ও বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মোস্তাক আহমদ খান এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন, সরকার দলের সশস্ত্র ক্যাডারেরা বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, ভোট জালিয়াতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যালট পেপার ছিনতাই, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জিম্মি করে জোরপূর্বক সিল মেরে তাদের প্রার্থীর বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপি তথা বোয়ালখালীর সর্বস্তরের জনগণ প্রহসনের এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে বলে তিনি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন।

শেয়ার করুন