বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন হুমকির মুখে। গত এক বছরে এ খাতের ৫ হাজার কোটি টাকার অর্ডার চলে গেছে ভারতে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, পোশাক কারখানা ধস ও একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের কারণে ক্রেতাদের একটা অংশ আর বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনতে আগ্রহী নন। তারা এখন অন্য দেশে বাজার খুঁজতে শুরু করেছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি’র (বিজিএমইএ) সংশ্ষ্টি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, দেশের পোশাকশিল্পে এখন একটি শনির দশা চলছে। নানা প্রতিবন্ধকতায় এ শিল্পের অনেক অর্ডার চলে গেছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে। শুধু তাই নয়–ভারত ২০১৩ সালে যে নতুন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অর্ডার পেয়েছে তা পাওয়ার কথা ছিলো বাংলাদেশের। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশ এই অর্ডার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বিজিএমইএ জানায়, দেশের পোশাকশিল্পের ২০১৩ সালের শুরুই হয় তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডে নিহত লাশের স্মৃতিকে সাথে নিয়ে। এতে প্রথম দফায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইমেজ সঙ্কটে পড়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প। তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডের ধাক্কা সামাল দেওয়ার আগেই ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ঘটে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনা।
মর্মান্তিক এ ঘটনায় নিহত হন ১১ শতাধিক মানুষ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। এতে ইমেজ সঙ্কটে পড়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প। ক্রেতারা বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করে। এরপর শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। ক্রেতারা অর্ডার দেওয়া তো দূরের কথা, আলোচনা করার জন্য বাংলাদেশে আসতেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
এই সুযোগ লুফে নেন পাশ্ববর্তী ভারতের বিক্রেতারা। ভারত পেয়ে যায় ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন রপ্তানি অর্ডার। অন্যদিকে বাংলাদেশ হারায় ৫ হাজার কোটি টাকার অর্ডার। এভাবেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে থাকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প।
নিট ওয়্যার গার্মেন্টস কারখানা মালিকদের সমিতি বিকেএমইএ এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত এক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের পোশাকশিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। আর বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগে এগিয়ে গেছে ভারত, মায়ানমার ও ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশ।
নতুন ক্রেতারা কেন ভারতের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন—এ নিয়ে কথা হয় বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি মো: শহীদুল্লাহ আজীমের সাথে। তিনি বাংলানিউজকে জানান, গত এক বছরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় সে সময় ক্রেতারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
অন্যদিকে ভারতে একদিকে যেমন বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা নেই ঠিক তেমনি তাদের কারখানার একই ছাদের নিচে কাঁচামাল থেকে সব কিছুই তৈরি হয়। তারা এই ব্যবসার প্রয়োজনীয় সম্পদের দিক থেকে বাংলাদেশ থেকে উন্নত। অবকাঠামোগত দিক থেকে ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের চেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে কাঁচামাল সুবিধা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক বেশি থাকায় নতুন ক্রেতাদের একটা বড় অংশ ভারতসহ অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকছেন।
অবশ্য ‘নতুন অর্ডার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়’ বলে জানিয়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিকদের সংগঠন টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন’র সাধারণ সম্পাদক তপন সাহা। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, তাজরীন ও রানা প্লাজা ধসে সর্বাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পরই পোশাক শিল্পের অর্ডার উল্লেযোগ্য হারে কমতে থাকে। এর দায় মালিকপক্ষকেই নিতে হবে।
বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে গড়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার নতুন পণ্যের অর্ডার আসে বাংলাদেশে। চলতি অর্থবছরে প্রথম সাত মাসে পোশাকশিল্পের রপ্তানি আয় হয়েছে ১,৪২০ কোটি ডলার। দেশের রফতানি আয়ের ৭৮ শতাংশই আসে দেশের পোশাকশিল্প থেকে।









