নিষ্ক্রিয় সভাপতিমণ্ডলী!

0
45
Print Friendly, PDF & Email

ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগের তুলনায় কার্যত নিষ্ক্রিয় দলটির সভাপতিমণ্ডলী। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিগত মহাজোট সরকার ও বর্তমান সরকার আমলেই মূলত এক রকম অকার্যকর হয়ে পড়েছে এই প্রভাবশালী ফোরামটি। গত প্রায় পাঁচ বছর যাবত্ সভাপতিমণ্ডলীর পরিবর্তে বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন উপদেষ্টা ও দলের উপদেষ্টা পরিষদের সংশ্লিষ্টরা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।
নেতাকর্মীরা আরও জানান, সভাপতিমণ্ডলী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দলটি। বিশেষ করে সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও সঠিক দিকনির্দেশনা প্রণয়নে অনেক সময়ই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে দলটি। এতে কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা। আর এই সমন্বয়হীনতার কারণে দিন যতই যাচ্ছে ততই দূরত্ব বাড়ছে মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মহাজোট সরকার ও বর্তমান সরকার আমলে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন স্থানীয় সরকার স্তরের নির্বাচনে।
’৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ’৯৬’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন, ২০০৬-এর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের আন্দোলন, ২০০১-এর বিএনপি-জামায়াতের সরকারবিরোধী আন্দোলনের নানা কর্মসূচি, সিদ্ধান্ত ও কৌশল গ্রহণে মুখ্য ভূমিকায় ছিল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী। এমনকি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ঐকমত্যের সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্যে যথেষ্ট প্রভাব ছিল এই সভাপতিমণ্ডলীর।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণীর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ সর্বোচ্চ ফোরাম। তবে কার্যনির্বাহী সংসদ সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলের নীতি ও কৌশল নির্ধারণে সভাপতিমণ্ডলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সভাপতিমণ্ডলীতে করণীয় নির্ধারণ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তা কার্যনির্বাহী কমিটিতে পাস করানো হয়। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২৫-এর খ-ধারা অনুযায়ী কার্যনির্বাহী সংসদ বা কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে জরুরি ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সভাপতিমণ্ডল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। সাধারণত দলের সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে সাধারণ সম্পাদক তিন দিনের নোটিসে সভাপতিমণ্ডলীর সভা আহ্বান করতে পারবেন। তবে তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে জরুরি সভা যে কোনো সময় ডাকতে পারবেন।
ক্ষমতাসীন দলের এক শীর্ষ নীতিনির্ধারক গতকাল শুক্রবার বর্তামানকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দলের এই প্রভাবশালী ফোরামটি বলতে গেলে অনেকটাই উপেক্ষিত। দীর্ঘদিন হলো সভাপতিমণ্ডলীর সভাও হয় না। এক সময় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী। আন্দোলন-সংগ্রামে ও যে কোনো সমস্যা সমাধানে দলের প্রাণ হিসেবে কাজ করে সভাপতিমণ্ডলী। তবে গত ২০০৯ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের পর সভাপতিমণ্ডলীর গুরুত্ব ও কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমতে থাকে বলে তারা মন্তব্য করেন। ওই কাউন্সিলের পর দলের কয়েক প্রভাবশালী সিনিয়র নেতাকে সভাপতিমণ্ডলী থেকে সরিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়। সর্বশেষ কাউন্সিলের পর গঠিত বর্তমান সভাপতিমণ্ডলীর দুই একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে তারা জানান।
২০০৯-এর কাউন্সিলে প্রভাবশালী সিনিয়র নেতাদের নিয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদকে অধিক সক্রিয় করার কথা বলা হয় ওই সময়। কিন্তু পরবর্তী সময় উপদেষ্টা পরিষদেরও তেমন কোনো তত্পরতা দেখা যায় না। তবে সভাতিমণ্ডলী থেকে যাদের উপদেষ্টা পরিষদে নেয়া হয় তাদের কয়েকজন দলের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য। বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে দলের প্রার্থী মনোনয়ন ও এ সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মাঝে মধ্যেই আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। গত কয়েক বছর এই সংসদীয় বোর্ডের সভায় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন ছাড়াও জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনা আলোচনা ও পরামর্শ নিয়ে থাকেন বলে দলের একাধিক নেতা জানান। এই সংসদীয় বোর্ডে রয়েছেন দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এরা তিনজনই এক সময় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। দলের এই তিন সিনিয়র নেতার সঙ্গে সংসদীয় বোর্ডের সভা ছাড়াও বিভিন্ন সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করে তাদের পরামর্শ নেন। বিশেষ করে গত বছর বিএনপি, জামায়াতের আন্দোলন, হেফাজতের তাণ্ডব, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ৫ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়সহ সার্বিক প্রেক্ষাপটে এই তিন নেতা দলের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। এদের আবারও দলের সভাপতিমণ্ডলীতে নিয়ে আসার কথাও শোনা যাচ্ছে। আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়েছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের ১৫ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীতে বর্তমানে যারা সদস্য রয়েছেন তারা হলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফরউল্লাহ, সতীশ চন্দ্র রায়, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ওবায়দুল কাদের, নূহ-উল-আলম লেনিন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন গত বছর ডিসেম্বরে মারা যাওয়ার পর অন্য কাউকে এখনও নেয়া হয়নি। এ ছাড়া বর্তমান কমিটিতে সভাপতিমণ্ডলীর আরও এক সদস্যের পদ শূন্য রয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদাধিকার বলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।
মতিয়া চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মোহাম্মদ নাসিম, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ওবায়দুল কাদের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ গত নির্বাচনের বেশ কিছু দিন আগে থেকেই কিছুটা অন্তরালে রয়েছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ আসন থেকে তিনি দলের প্রার্থী হলেও বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। গত কয়েক বছর কাজী জাফরউল্লাহ দলের অনেক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সভাপতি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। দলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে প্রাথমিক বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনাতেও তার থাকার কথা শোনা যেত। বেশ কিছু দিন হলো তাকে আগের সেই অবস্থানে দেখা যাচ্ছে না বলে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। গত কাউন্সিলে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন নূহ-উল-আলম লেনিন। কমিউনিস্ট পার্টি ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে আসা এই নেতা এখনও দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মধ্যে তেমন একটা অবস্থান করে নিতে পারেননি। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও দলের অনেকেই তাকে মানসিকভাবে পুরোপুরি আওয়ামী লীগার হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন এবং দলের জন্য নিবেদিত হয়েও সভাপতিমণ্ডলীর অপর সদস্য মতিয়া চৌধুরীর ক্ষেত্রেও কারো কারো এমন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ২০০৯-এর কাউন্সিলে ওবায়দুল কাদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হওয়ার পর থেকে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে তার মানসিক দূরত্ব প্রকাশ পায় যা অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদের প্রতি ওবায়দুল কাদেরের আগ্রহ ছিল বলে দলের নেতাকর্মীরা জানান। সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য সতীশ চন্দ্র রায় জাতীয় রাজনীতিতে তেমন আলোচিত নন। দলের নেতাকর্মীর মধ্যে তার তেমন প্রভাব নেই। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বিগত মহাজোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। এবার তিনি মন্ত্রিসভায় আসতে পারেননি। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে তার সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও দলের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তার তেমন কোনো ভূমিকা নেই বলে জানান দলের সংশ্লিষ্টরা। সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য চট্টগ্রামের নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত নন। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ছিলেন। তবে জাতীয় চার নেতার একজন ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর ছেলে সহজেই এক সময় আওয়ামী লীগে প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন। দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা তেমন উল্লেখযোগ্য নয় বলে জানান দলীয় নেতারা।

শেয়ার করুন