বছরের শুরুতে বাড়তি বাড়িভাড়ার বোঝা নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন রাজধানীতে ভাড়ায় থাকেন এমন বাসিন্দারা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বাড়িওয়ালা বাড়তি বাড়িভাড়া চাপিয়ে দিচ্ছেন ভাড়াটিয়াদের কাঁদে। হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর অজুহাতে বছর ঘুরতেই এ বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য করা হচ্ছে ভাড়াটিয়াদের। নইলে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। তাই লাখ লাখ রাজধানীবাসী বছর বছর ভাড়া নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাজধানীর প্রায় ৮৫ ভাগ লোক ভাড়াটে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদাসীনতায় এ বিপুল জনগোষ্ঠী ১৫ ভাগ বাড়ির মালিকের কাছে জিম্মি। মাত্রাতিরিক্ত বাড়ি ভাড়া নিয়ে রাজধানীতে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। ভাড়াটিয়া কল্যাণ সমিতি নামে একটি সংগঠন আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। তবু টনক নড়ছে না কারও। ২০০৪ সালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী বাড়িওয়ালা ভাড়ার বেশি প্রিমিয়াম, সালামি, জামানত কিংবা এ ধরনের কোন অর্থ দাবি করতে বা নিতে পারবেন না। ভাড়া নিয়ন্ত্রকের অনুমোদনসাপেক্ষে অগ্রিম হিসেবে এক মাসের ভাড়া নিতে পারবেন। ভাড়া পরিশোধের জন্য বাড়িওয়ালা স্বাক্ষরিত রসিদ দেয়ারও নিয়ম রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেও এ আইনের কোন সুবিধা পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। বছরশেষে লাগামহীনভাবে ভাড়া বাড়ান বাড়িওয়ালারা। কয়েকটি সামাজিক সংগঠন এ অনিয়ম বন্ধে আন্দোলন করলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার হিসাবে রাজধানীর বসবাসকারী জনসংখ্যার ৮৫ ভাগ ভাড়াটে ১৫ ভাগ মালিকের কাছে ভাড়া-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভাড়াটেদের সঙ্গে কথা বলে ভাড়া বৃদ্ধির যন্ত্রণার নানা রকম খবর জানা গেছে। অতিরিক্ত ভাড়া চাপিয়ে দেয়ায় অনেকে বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন। ভাড়াটেদের অভিযোগ, মালিকদের পরিষ্কার কথা ভাড়া বাড়িয়ে দিতে না পারলে বাসা ছেড়ে দিন। ভাড়াটেরা অভিযোগ করেছেন, ডিসেম্বর মাসের ভাড়া দিতে গিয়ে ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ পেয়েছেন তারা। আর ভাড়া বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে বাড়িওয়ালারা বলছেন সেই পুরনো কথা হোল্ডিং ট্যাক্স, নিরাপত্তা, বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও ইউটিলিটি সার্ভিস ব্যয় প্রতিবছর বাড়ে বলেই ভাড়া বাড়ান তারা। তবে বেশি ভাড়ায় থাকতে কাউকে বাধ্য করা হয় না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রায় দুই দশক পর ১০ ভাগ হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়িয়েছে। অথচ বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়াচ্ছেন প্রতিবছরই। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় এ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ আইন বাস্তবায়নে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও তা গায়ে নেয় না সিটি করপোরেশন। এ আইন বাস্তবায়নে কোন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বও দেয়া হয়নি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাড়ি ভাড়ার একটি চার্ট রয়েছে। প্রধান সড়কের পাশে, গলির ৩০০ ফুটের মধ্যে এবং গলির ৩০০ ফুটের বাইরের ভাড়া আলাদা করা হয়েছে ওই চার্টে। এই তিনটি ক্যাটিগরিকে আবার আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং শিল্প এলাকা এ তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাড়ির হোল্ডিং নম্বর, নির্মাণের সময়, নির্মাণশৈলী, অবস্থানের শর্তের ওপর ভিত্তি করে ভাড়ার ওই চার্ট তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন এই চার্ট অনুসরণ করলেও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে কোন ভূমিকা রাখছে না সংস্থাটি। ভাড়াটিয়ারা জানান, হোল্ডিং টেক্স বাড়ানোর কথা বলে গত বছর এক দফা বাড়িভাড়া বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বছর ঘুরতেই আবরও ভাড়া বাড়ার নোটিশ পান তারা। গত মাসের ভাড়া পরিশোধের সময় জানুয়ারি ২০১৪ থেকে ভাড়া ১০০০ টাকা বৃদ্ধি করার কথা জানিয়ে দেয় বাড়িওয়ালা। হাতিরপুল-ল্যাবএইড রোডের ৩৭/২ নম্বর বাসায় তৃতীয়তলায় গত পাঁচ বছর ধরে থাকতেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক সামছুজ্জামান। জানুয়ারি মাসে তিনি বাসা বদল করেছেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, মালিক প্রতিবছর ৩ হাজার টাকা করে ভাড়া বাড়ান। বাধ্য হয়ে বাসা ছেড়ে দিয়েছি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কারা বাস্তবায়ন করবে, সে ব্যাপারে আইনে কিছু বলা নেই। ফলে এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের কিছুই করার নেই। আর ভাড়ার যে চার্ট তারা তৈরি করেছেন তা কেবল রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে করা হয়েছে। ডিসিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর লাখ লাখ ভাড়াটের স্বার্থে সরকারকে উদ্যোগী হয়ে বছর বছর লাগামহীন অযৌক্তিক বাড়িভাড়া বাড়ানোর পদ্ধতি েেরাধ করতে হবে। আইন সংশোধন করে যুগোপযোগী করতে হবে এবং আইন বাস্তবায়নে সেবাধর্মী কোন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বাড়া বৃদ্ধির এ নিষ্পেশন থেকে ভাড়াটেদের রক্ষার কোন পথ নেই।









