মার্চের আগে জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক শিক্ষকদের সরকারি বেতন অনিশ্চিত

0
110
Print Friendly, PDF & Email

সারা দেশের রেজিস্টার্র্ড ও রেজিস্টার্ডবিহীন এবং এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুল শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়ার এক বছর অতিবাহিত হলেও এখনো সরকারীকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। তিন ধাপে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ ধাপের জরিপ কাজ এখনো চলছে। প্রথম ধাপের কাজ প্রায় সম্পন্ন হলেও এখন পর্যন্ত বেতন পাচ্ছেন না কোনো ধাপের শিক্ষকেরা। এ তিন ধাপে সারা দেশে শিক্ষকের সংখ্যা এক লাখ তিন হাজার ৮৪৫ জন। এসব শিক্ষকের প্রায় সবাই এমপিওভুক্ত (বেতনের সরকারি অংশ বা মান্থলি পে-অর্ডার)। জাতীয়করণের দোহাই দিয়ে গত অক্টোবর থেকে তাদের এমপিওভুক্ত হিসেবে পাওনাও বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে প্রায় চার মাস বেতনভাতা বন্ধ রয়েছে ওই সব শিক্ষকের। এতে করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব শিক্ষক। দুই-এক মাসের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান বা জাতীয়করণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ওই কর্মকর্তারা নয়া দিগন্তকে বলেন, মার্চের আগে জাতীয়করণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন বা শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। জাতীয়করণের শেষ ধাপের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর গ্যাজেট প্রকাশ হলেই সরকারি বেতনভাতা পেতে শুরু করবেন শিক্ষকেরা।
এ দিকে প্রায় চার মাস বেতনভাতা বন্ধ থাকায় সারা দেশের এক লাখ তিন হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষকের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। শিক্ষকেরা বলছেন, জাতীয়করণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এমপিওভুক্তির হারে শিক্ষকদের পাওয়া টাকা দেয়া হলে আর্থিক অনটনে পড়তে হতো না তাদের। ধারদেনা করে আর সংসার চলছে না।
এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রথম ধাপের শিক্ষকেরা ১ জানুয়ারি ’১৩ থেকে বকেয়াসহ সরকারি শিক্ষক হিসেবে বেতনভাতা পাবেন। দ্বিতীয় ধাপের শিক্ষকেরা জুলাই ’১৩ থেকে বকেয়াসহ বেতনভাতা পাবেন। আর তৃতীয় ধাপের শিক্ষকেরা পাবেন ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে। প্রথম ধাপেই শিক্ষক সংখ্যা বেশি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক কম।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের একাধিক সূত্র জানায়, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্যাজেট প্রকাশিত হলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নতুন এসব শিক্ষকের পদ সৃষ্টি নিয়ে জটিলতার অবসান হয়নি। এসব পদের গেজেট প্রকাশ না হওয়ার পেছনে মূল কারণটি হচ্ছে এ পদগুলোর ব্যাপারে গতকাল (১৯ জানুয়ারি রোববার পর্যন্ত) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানায়, এক মাস আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। অর্থ মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের টাইম স্কেল ও ইনক্রিমেন্ট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বলে জানা গেছে। জাতীয়করণ নীতিমালায় শিক্ষকদের সর্বোচ্চ তিনটি ইনক্রিমেন্ট দেয়ার কথা থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে প্রজ্ঞাপনে এর কোনো উল্লেখ নেই। এ নিয়ে অর্থ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি অব্যাহত রয়েছে।
অন্য দিকে গত ডিসেম্বরেই তৃতীয় ধাপের স্কুলগুলোর যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত মাঠ জরিপের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেনি। এরপর যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে। তারপর স্কুলগুলোর জাতীয়করণের গেজেট প্রকাশ করা হবে।
প্রথম ধাপে এমপিওভুক্ত ২২ হাজার ৯৮১টি বেসরকরি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারি আদেশও জারি করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে দুই হাজার ২৫২টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ শেষ হয়েছে। এ স্কুলগুলো স্থায়ী বা অস্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত, পাঠদানের অনুমতিপ্রাপ্ত, কমিউনিটি এবং সরকারি অর্থায়নে এনজিও কর্তৃক নির্মিত বা পরিচালিত। আর তৃতীয় ধাপে স্কুলগুলো হচ্ছে পাঠদানের অনুমতির সুপারিশপ্রাপ্ত ও পাঠদানের অনুমতির অপোধীন ৯৬০টি বিদ্যালয় জাতীয়করণের জরিপ বা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। দুই ধাপের স্কুলগুলোর ব্যাপারে সরকারি গেজেট হয়েছে। কিন্তু এসব স্কুলের শিক্ষকদের গেজেট প্রকাশিত হচ্ছে না।
কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই স্কুল জাতীয়করণ সেলের প্রধান উপসচিব আবুল কালাম নয়া দিগন্তকে বলেন, এক লক্ষাধিক শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণের জন্য নানা বাধা ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ করতে হচ্ছে। গাফিলতির জন্য বিলম্ব হচ্ছে না। আশা করা হচ্ছে মার্চের মধ্যেই শিক্ষকেরা সরকারি সুবিধা ও বেতন পেতে শুরু করবেন।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ২২ বছরের দাবি আর আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৯ জানুয়ারি জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে সারা দেশের রেজিস্টার্র্ড ও রেজিস্টার্ডবিহীন এবং এনজিও পরিচালিত স্কুলের শিক্ষকদের মহাসমাবেশে তিন ধাপে তাদের চাকরি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে বলেন, ‘সরকারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তিন ধাপে জাতীয়করণ করা হবে’। এখন তাই করা হচ্ছে।

শেয়ার করুন