কঠোর নিরাপত্তার আওতায় আসছে ৪ শতাধিক সাক্ষী

0
142
Print Friendly, PDF & Email

চূড়ান্ত করা হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সাক্ষীদের জন্য সুরক্ষা আইন। আগামী এক মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি আইন মন্ত্রিসভায় পাঠানোর চিন্তাভাবনা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় আইনের প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করছে। রোববারও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। সাক্ষীদের কিভাবে নিরাপত্তা দেয়া যায় তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। আইনটি চূড়ান্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের প্রায় চার শতাধিক সাক্ষী কঠোর নিরাপত্তার আওতায় চলে আসবেন। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টেও মানবতাবিরোধী মামলার সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মাওলানা দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর সাক্ষীকে হত্যা করার পর অন্য সাক্ষীদের মাঝে বিরাজ করছে আতংক। যুদ্ধাপরাধ মামলার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে সুরক্ষা আইন থাকলেও বাংলাদেশে এ আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। সরকার সব দিক বিবেচনা করে সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (প্রসিকিউটর) রানা দাশগুপ্ত যুগান্তরকে জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শুরুর পর থেকেই এ বিচারের পক্ষের সবাই নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন। এজন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার জন্য সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। দীর্ঘ চার বছরেও সেই আইন কার্যকর হয়নি। আমরা অনেকটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করছি। তিনি বলেন, আমাদের চিঠি ও টেলিফোনে হুমকি দেয়া হয়েছে। থানায় জিডি করা হয়েছে। কিন্তু জিডির কোনো তদন্ত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হুমকি-ধমকি থেকে শুরু করে হত্যার মতো ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। সাক্ষীদের সুরক্ষায় সরকার জেলার ডিসি ও এসপিদের নিয়ে একটি কমিটি করেছে। কিন্তু এ কমিটি কখনও সাক্ষীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কাজ করেনি। প্রায় ৪শ সাক্ষী নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে সুরক্ষা আইন রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে কী হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। দ্রুত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করার দাবি জানান তিনি।
সূত্র জানায়, প্রায় চার বছর আগে যুদ্ধাপরাধ মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এজন্য জামায়াতে ইসলামীর সব শীর্ষ নেতা, বিএনপির তিন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। এ পর্যন্ত দশজনকে সাজা দেয়া হয়েছে। গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড ও বিএনপি নেতা আবদুল আলিমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাছাড়া জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করে সরকার। পরে আপিল বিভাগ তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সাজা কার্যকর করা হয়। সব মিলিয়ে ৯টি মামলার সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মামলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে এসে আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। কিন্তু সাক্ষ্য দেয়ার পরপরই তারা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেককে দফায় দফায় হুমকি দেয়া হচ্ছে। প্রাণ ভয়ে কেউ কেউ অন্যত্র গিয়ে বসবাস করছেন। সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য ট্রাইব্যুনাল থেকে নির্দেশ আসার পর সরকার ডিসি-এসপিদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করে। সাক্ষীদের বাসা-বাড়িতে নিরাপত্তার জন্য উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। কিন্তু কারও বাসাতেই নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন সময় হুমকি-ধমকি থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন সাক্ষী ও তার পরিবারের সদস্যরা। অনেক সাক্ষী ভয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে যাননি। দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা মামলা কার্যক্রমের শুরু থেকে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে এলেও তাতে কাজ হয়নি। শুধু সাক্ষ্য দেয়ার দিন পুলিশি নিরাপত্তা দেয়া হলেও পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাক্ষীর নিরাপত্তা নেই। এ কারণে আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাক্ষীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পিরোজপুরের জিয়ানগর এলাকায় জামায়াত নেতা সাঈদীর মামলার সাক্ষী মোস্তফা হাওলাদারকে সম্প্রতি কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাক্ষ্য দেয়ার পর থেকেই তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। প্রশাসনকে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোয় প্রায় চার শতাধিক সাক্ষী রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সাক্ষী ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পিরোজপুর, ফরিদপুর, শেরপুর, পাবনা, রংপুর, জয়পুরহাট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায়।
সূত্র মতে, সাক্ষী সুরক্ষা আইন না করে সংশ্লিষ্ট জেলায় জেলায় সাক্ষী সুরক্ষা কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে জেলা প্রশাসককে। তবে এই কমিটির কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ করেছেন সাক্ষীরা। জেলা প্রশাসকরা সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তরিক নয় বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছে তদন্ত সংস্থা। তবুও টনক নড়েনি সরকারের। মামলার রায় হওয়ার পর সাক্ষীদের বাড়ি-ঘর আক্রান্ত হয়েছে। সর্বশেষ সাঈদীর মামলার সাক্ষীকে হত্যা করার পর টনক নড়ে প্রশাসনের। সুরক্ষা আইন প্রণয়ন নিয়ে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। কিভাবে আইন প্রণয়ন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সুরক্ষা আইন চূড়ান্ত করার জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর সাক্ষীকে হত্যা করার কারণে অন্য সাক্ষীদের বাসা-বাড়িতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, আশা করি আগামী এক মাসের মধ্যে সুরক্ষা আইনটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।
গত বছরের ৯ মার্চ গোলাম আযমের মামলার সাক্ষী ও বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ছোট ভাই মিরাজ আহমেদ ঢাকার খিলক্ষেতে খুন হন। ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সাক্ষ্য দিতে এসে অপহৃত হন সাঈদীর মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালি।
তিনি ভারতে চলে যান বলে গুজব রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাক্ষী জানান, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। জেলার পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। তবে এই ব্যাপারে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, মামলার সাক্ষীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে। সুরক্ষা আইনটি কার্যকর হলে এমনিতেই নিরাপত্তা জোরদার থাকবে।

শেয়ার করুন