নির্বাচনের আগেই হুমকি দিয়েছিলেন হুইপ ওহাব

0
55
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনের আগেই চাপাতলা মালোপাড়ার বাসিন্দাদের দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন হুইপ অধ্যক্ষ আব্দুল ওহাব। নির্বাচনে নৌকার বাইরে বের হতে না পারলে পরিণাম ভাল হবে না বলে শাসিয়েছিলেন সংখ্যালঘুদের। তিনি তাদের বলেছিলেন, তিনি এখনও আওয়ামী লীগে আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। দল তাকে বহিষ্কার করেনি। ফলে এবারের সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীক না পাওয়ায় সংখ্যালঘুরা যদি ভেবে থাকেন ওহাব আর আওয়ামী লীগে নেই, তার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেছে, তাহলে তারা ভুল করবেন। নৌকার প্রার্থী রণজিৎ রায় আপনাদের স্বজাতি হওয়ায় যদি ভাবেন তাকে ছাড়া আপনারা অন্য কাউকে ভোট দেবেন না তাহলে ভুল করবেন। ভোটের পরে এর জন্য আপনাদের খেসারত দিতে হবে। হিন্দু সমপ্রদায়ের নেতৃস্থানীয়দের উদ্দেশ্য করে হুইপ ওহাব বলেছিলেন, আপনারা সামপ্রদায়িকতা থেকে বের হতে পারবেন না, আর আমার কাছে অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা আশা করবেন- সেটা হবে না। আপনাদের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করছে ভোটের পরে আমি অসাম্প্রদায়িক থাকবো না সাম্প্রদায়িক আচার-আচরণ করবো। এদেশের জামায়াত-শিবির শুধু সাম্প্রদায়িকতা লালন করে সেটা ঠিক নয়, এদেশের সংখ্যালঘুরাও সাম্প্রদায়িক। নির্বাচনের ৫ দিন আগে চাপাতলার পাশেই সুন্দলী প্রাইমারি স্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় হুইপ শেখ আব্দুল ওহাব এসব কথা বলেছিলেন। ওই জনসভায় উপস্থিত ছিলেন এমন অনেকেই এ কথা বলেছেন। নিজের বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে এই পাড়ার ৪/৫শ’ পরিবারকে ওহাব বুঝিয়ে দিলেন তার কথা না শোনার পরিণাম। গত ২রা জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণায় বিদ্রোহী প্রার্থী জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় হুইপ অধ্যক্ষ শেখ আব্দুল ওহাব চাপাতলা গ্রামে যান। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি এক পর্যায়ে মালোপাড়ায় যান। তিনি এই পাড়ার মন্দিরের সামনের ফাঁকা জায়গায় নির্বাচনী মতবিনিময় সভা করেন। কিন্তু সেই সভায় মালোপাড়ার বেশির ভাগ মানুষ ছিলেন অনুপস্থিত। ওহাবের নির্বাচনী কর্মীরা বহু চেষ্টা তদবির করেও তাদের সভায় হাজির করতে ব্যর্থ হন। ক্ষমতায় থেকে এই পাড়ার উন্নয়নে শেখ আব্দুল ওহাব অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড করেছেন। মন্দির করে দিয়েছেন। বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছেন, ইটের রাস্তা করে দিয়েছেন। দিয়েছেন সরকারি বেসরকারি নানা অনুদান। এই পাড়ার মানুষের সঙ্গে তার বহু দিনের সম্পর্ক। কিন্তু শুধুমাত্র নৌকা প্রতীক না পাওয়ার কারণে সেদিনের সেই সভায় এই পাড়ার মানুষ উপস্থিত হননি। এতে ওহাব ক্ষুব্ধ হন। পাড়ার দুলাল বিশ্বাস, বিশ্বজিৎ সরকার, সমীর সরকারের মতো প্রবীণ ব্যক্তিরা ওহাবকে সাফ জানিয়ে দেন, তারা রণজিৎ রায়ের মার্কা নৌকার বাইরে ভোট দিতে পারবেন না। দীর্ঘ দিনের পরিচিত দুলাল, বিশ্বজিৎ আর সমীর সরকারদের তখন ওহাব বলেন, দেখ আমার কাজ আমি করেছি, এবার তোমাদের পালা। তোমরা যদি স্বজাতির টানে আমাকে বিমুখ করো তাহলে তার পরিণাম তোমরা ভোগ করবে, তখন আমার কিছুই করার থাকবে না। ঘটেছেও তাই। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন শেষ হতে না হতেই সে মূল্য দিতে হয়েছে এ পাড়ার মানুষদের। নির্বাচনে পরাজয়ের গ্লানি মুছতে না পেরে তার বদলা নিয়েছে ওহাবের কর্মী-সমর্থকরা। হামলাকারীরা সকলেই স্থানীয় এবং তাদের সবাই চেনে। হামলার শিকার অনেকে হামলার পর পরই তাদের নাম-পরিচয়ও বলেছে। এই পাড়ার বাসিন্দা সুকদেব কুমার বলেন, হামলাকারীদের বেশির ভাগই ওহাবের কর্মী-সমর্থক। হামলাকারীরা একযোগে মালোপাড়ার বিশ্বজিৎ, দুলাল, সমীর, দেবাংশু, সুকুমার, স্মরজিৎ, আশুতোষ, শান্ত, নিমাই, বিপ্লব, অরুণ, শংকর, শিমুল, সুমন, প্রবীর, কৃষ্ণ, অর্ধেন্দু, সাগর, সীমান্ত, প্রদীপসহ অনেকের শতাধিক বাড়িতে আক্রমণ শুরু করে। তারা বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি জিনিসপত্রে অগ্নিসংযোগ করে। ঘরের চাল, ডাল, ধান সব মিশিয়ে একাকার করে বাইরে ছুড়ে ফেলে। রান্নাঘরগুলোতে ঢুকে থালাবাটি, হাঁড়িপাতিল ভেঙে চুরমার করে। লেপ-তোষক থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরের সব জিনিসপত্র পুড়িয়ে ফেলে। জেলে সম্প্রদায়ের এই পাড়ায় আগুনে পুড়েছে কয়েক লাখ টাকার জাল। হামলার শিকার হয়েছে কয়েক শ’ নারী-পুরুষ। হামলাকারীদের তাণ্ডবে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পাশের ভৈরব নদ পেরিয়ে কয়েক শ’ নারী-পুরুষ ও শিশু ওই রাতেই আশ্রয় নেয় পাশের দেয়াপাড়া গ্রামে। তিন দফার এই হামলায় গোটা মালোপাড়া গ্রামটি লণ্ডভণ্ড হলেও স্থানীয় প্রশাসন বা সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের কোন সাহায্য না পেয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই পাড়ার বাসিন্দারা। পঞ্চাশোর্ধ্ব বিষ্ণুপদ সরকার বলেন, যখন হামলাকারীরা গ্রামে তাণ্ডব চালাচ্ছে তখন আমরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ প্রশাসনকে বার বার খবর দিয়েছি। থানার ওসিকে ফোন করেছি। কিন্তু কারও কোন সাড়া পাইনি। যদি খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারি দলের নেতারা ঘটনাস্থলে আসতেন তবে পরিস্থিতি হয়তো এতটা খারাপ হতো না।
এদিকে এই হামলার ঘটনা নিয়ে রাজনীতির নোংরা খেলা হচ্ছে অভিযোগ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে কোন মামলার উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে দাবি করেন এই পাড়ার মাতব্বর দেবাংশু সরকার।

শেয়ার করুন