১৯৮৮, ১৯৯৬ ও ২০১৪ ষোলোকলা পূর্ণ করল আ.লীগ বিএনপি ও জাতীয় পার্টি

0
72
Print Friendly, PDF & Email

ভালো বা মন্দ কাজ যেমনই হোক, কোনো ইস্যুতেই বড় দলগুলো কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বিষয়টি নতুন করে প্রমাণ করতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে দলটি সবার সঙ্গে ‘সমানে সমান’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ১৯৮৮, ১৯৯৬ এরপর ২০১৪তে এসে তিনটি দলই ষোলোকলা পূর্ণ করতে যাচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি একতরফা নির্বাচন করেছিল। একই তালিকায় বিএনপি নাম লেখাল ১৯৯৬ সালে। সেবার তারাও একতরফা নির্বাচন করে। বাকি ছিল আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালে এসে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠিক একই কাজ করল দেশের সবচেয়ে পুরনো দলটি। একতরফা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে দল তিনটির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকল না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আগে আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনের আয়োজক বলে অভিযুক্ত করত। সাধারণ মানুষ এটা বিশ্বাস করত। কিন্তু আজকের নির্বাচনের পর সাধারণ ভোটাররা আওয়ামী লীগের দিকেও একই অভিযোগের আঙুল তুলবে। দলের নেতাকর্মীরা কিছুই বলতে পারবে না। এ ধরনের কাজের জন্য দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে কোনো দুঃখবোধ বা অনুশোচনা নেই। উল্টো কাজগুলো সঠিক, সে বিষয়েই তারা নিজ দলের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকেন।
জাতীয় পার্টি ও বিএনপির মতো আওয়ামী লীগও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে এক কাতারে দাঁড়াতে যাচ্ছে— এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই। বিএনপি চেয়েছিল নির্বাচন প্রতিহত করতে। তারা ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন হয়ে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ নির্বাচনের কোনো বিকল্প ছিল না। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুুল্লাহ আল নোমান বর্তমানকে বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সংবিধান সংশোধন করেছিলাম। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে নির্বাচন করছে। আমাদের নির্বাচনের সঙ্গে তাদের মিল নেই।’
তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালে এরশাদের নির্বাচনে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এবার আওয়ামী লীগের নির্বাচনে যাচ্ছে এরশাদের জাতীয় পার্টি। অর্থাত্ তারা একে অপরের ‘ঋণ’ শোধ করছে। কলঙ্কের নির্বাচন করে টিকে থাকতে পারবে না আওয়ামী লীগ। জনরোষে তাদের ক্ষমতা ছাড়তে হবে।
দলগুলো ভোটারবিহীন নির্বাচন করেই এক কাতারে এসে দাঁড়ায়নি। দলগুলোর প্রধানদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতাতেও তারা সমান সমান অবস্থানে দাঁড়াতে যাচ্ছে। বিএনপিপ্রধান ইতিমধ্যে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। অন্যদিকে আজকের নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগপ্রধানও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হবেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন কমিশন এবার নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে নির্বাচনের আয়োজন করতে হচ্ছে না। মাত্র ১৪৭ আসনে নির্বাচন আয়োজনের ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি। এবারই প্রথম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ আসনে নির্বাচিত হওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে।
১৯৮৮ আর ১৯৯৬-এর নির্বাচনকে ভোটারবিহীন নির্বাচনও বলা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন হয়তো প্রার্থীবিহীন (অর্ধেক আসনে একজন প্রার্থী) নির্বাচনের অভিধা বরণ করতে যাচ্ছে। আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারই সবচেয়ে কম ৩৯০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করছেন।
এ অবস্থায় বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো ‘তামাশার নির্বাচনের কলঙ্ক তিলক’ পরতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগও। দলটির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই আক্ষেপ জানিয়ে বলেছেন, এ নিয়ে দলের শীর্ষ পর্যায়ের তেমন ভাবান্তর আছে বলে মনে হচ্ছে না।
‘প্রহসনের নির্বাচন’-এর তকমা পেয়েছিল স্বৈরশাসক এরশাদের ১৯৮৮ সালের নির্বাচন। জাতীয় পার্টি ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে থাকায় তারা ভোট বর্জন করে। তত্কালীন সরকারপ্রধান এইচএম এরশাদ আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো বড় দলবিহীন নির্বাচন করায় তা একতরফা হিসেবে অভিহিত হয়। বড় দলগুলো অংশ না নিলেও সেবার ৮টি দল অংশ নেয়। এ সময় ১৮ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনে ৮টি দল অংশ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্ব্বী প্রার্থী ৯৭৭ জন। জাতীয় পার্টি ২৫১ জন। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতায় ১৮ জন নির্বাচিত হয়। ভোট পড়ে শতকরা ৫৪ দশমিক ৯৩ ভাগ।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচনের নজির সৃষ্টিকারী অপর দল বিএনপি ইতিমধ্যে এবারের নির্বাচনকে ‘চরম হাস্যকর’ হিসেবে উপাধি দিয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ৪৯ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনে ৪২টি দল অংশ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্ব্বী প্রার্থী ১৪৫০ জন। বিএনপি ২৭৮টি, বাকি আসন পায় অন্যান্য দল। তবে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত নির্বাচন বর্জন করে। তখন আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে ছিল। বিএনপি শুরুতে আওয়ামী লীগের দাবি উপেক্ষা করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করে। কিন্তু নির্বাচনের আগে আন্দোলনে গণমানুষের সম্পৃক্ততা বেড়ে যায়। ফলে তীব্র গতিতে আন্দোলন এগুতে থাকে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের কর্মীরা রাজপথে নেমে আসে। ফলে বিএনপি বাধ্য হয় একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে। একটি অধিবেশনের পরই সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন দেয় দলটি। ওই নির্বাচনেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতায় ৪৯ জন নির্বাচিত হন। ভোট পড়ে শতকরা ২৬ দশমিক ৭৪ ভাগ।
এসবের আগে ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৮টি দল অংশ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্ব্বী প্রার্থী ১৫২৭ জন। জাতীয় পার্টি ১৮৩ জন ও আওয়ামী লীগ ৭৬ জন এবং বাকি আসন পায় অন্যান্য দল। ভোট পড়ে শতকরা ৫৯ দশমিক ৩৮ ভাগ। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১১ জন। এটাও একতরফা নির্বাচনের মতোই। কিন্তু এরশাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ যোগ দেয়ায় নির্বাচনটি একতরফার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পায়। বিএনপি নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী ’৮৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে বৈধতা দিয়েছিল। এবার জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচনকে বৈধতা দিচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা বর্তমানকে বলেন, পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের একটি আলাদা অবস্থান ছিল, যা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো দলের নেই। কিন্তু এবার একতরফা নির্বাচন করার মাধ্যমে সেই অবস্থান হারাতে বসেছে দলটি। এর সুদূরপ্রসারী একটি বিরূপ প্রভাব দলের ওপর পড়ার আশঙ্কা আছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে ’৮৮ এবং ’৯৬-এর ঘটনা যেসব কারণে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি থেকে আওয়ামী লীগকে আলাদা করে রেখেছিল। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগ এবার একতরফা নির্বাচন করে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির কাতারে গিয়ে দাঁড়ানোয় নতুন প্রজন্ম ভীষণভাবে হতাশ হয়ে পড়বে। ’৯৬ সালে বিএনপি এ ধরনের একটি নির্বাচন করায় তরুণ প্রজন্ম অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। ফলে এরপর থেকে বিএনপি স্থায়ীভাবে জামায়াতে ইসলামীকে নিজেদের সঙ্গী করে নিয়েছে। এবার আওয়ামী লীগ যা করছে এতে তারাও সব কূল হারিয়ে এ ধরনের কোনো দলকে তাদের সঙ্গী করতে পারে— এ ধরনের আশঙ্কাও ব্যক্ত করে এই নেতা।
এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান বলেন, প্রধান বিরোধী দলের বর্জনের কারণে এ নির্বাচন কারো কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশ আরও গভীর সঙ্কটের মধ্যে পড়বে। তবে এ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ীই হচ্ছে। বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নিলে সেটি গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু তা হয়নি। এ কারণে এটি একটি কলঙ্কিত অধ্যায়ও বটে। আওয়ামী লীগ একটি পুরনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এ দলটির কাছে জনগণের অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু এ ধরনের একতরফা নির্বাচন দেশবাসীকে হতাশ করেছে। তবে নির্বাচনের পরে যদি ১১তম সংসদ নির্বাচন নিয়ে কোনো সমঝোতা না হয়, তা হলে দেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে।
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির আমলে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের সঙ্গে ’৯৬ ও ২০১৪ নির্বাচনের সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। এরশাদ ছিলেন একজন স্বৈরাচার আর বাকি দুই সরকার গণতান্ত্রিক। সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা রয়েছে। তবে মূলত ’৯৬ সালের নির্বাচন থেকে এ নির্বাচনের কোনো পার্থক্য নেই বলে তিনি মনে করেন।

শেয়ার করুন