সম্মানজনক ভোটারের খোঁজে আ. লীগ

0
110
Print Friendly, PDF & Email

জয়-পরাজয় না, আজকের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিই চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের কাছে। আমেজহীন ও নিরুত্তাপ নির্বাচন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়ায় সাধারণ ভোটাররা অনেকটাই আতঙ্কগ্রস্ত। এ অবস্থায় তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে কেন্দ্রে যাবেন- এমন আস্থা রাখতে পারছেন না দলটির নেতারা। এ ছাড়া অর্ধেকেরও বেশি আসনে ভোট হচ্ছে না। যেসব আসনে ভোট হবে, তার অনেকগুলোতেই আওয়ামী লীগ ছাড়া বলার মতো আর কোনো দলের প্রার্থী নেই। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতারা সবাই জোর অনুরোধ করেছিলেন ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে। অনুরোধ দৃশ্যত স্পর্শ করেনি ভোটারদের। তাই গতকাল শেষ দিন কোনো কোনো প্রার্থী অন্তত দলীয় কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

তফসিল ঘোষণার সময় পর্যন্ত কোনোমতে ৫০ শতাংশের বেশি ভোটার উপস্থিতির আশায় ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। আরো বেশি দল নির্বাচনে অংশ নেবে বলেও প্রত্যাশা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১২টি দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ ছাড়া বলার মতো ভোটার কারো নেই। এই ১২ দলের মধ্যে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে

থেকেও নেই। ফলে জাপা সমর্থকদেরও একটি অংশ নির্বাচনে যাবে না। এ ছাড়া দিন যতই ঘনিয়েছে, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা ও আতঙ্ক ততটাই বেড়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনায়ও ভোটারদের উৎসাহে ভাটা পড়েছে। এ অবস্থায় অর্ধেকের বেশি ভোটার তো নয়ই, বরং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের চেয়ে বেশিসংখ্যক ভোটার উপস্থিতিই সম্মানজনক বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনই কেবল সারা দেশের মানুষকে একসঙ্গে আলোড়িত করে। তপ্ত রোদেও দীর্ঘ লাইন পাড়ি দিয়ে ভোট দেন ভোটাররা। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকেও কাঁধে তুলে ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার ঘটনা এখানে চোখে পড়ে। কিন্তু প্রধান দলগুলো বর্জন করলে, সে নির্বাচন থেকে অনেকটাই সরে থাকেন তাঁরা। তাই একপক্ষীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মূল দল সব সময়ই ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে, যেমনটি এবার দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের মধ্যে।

আগের ৯টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একপক্ষীয় নির্বাচনে এ দেশের ভোটাররা কখনোই তেমন সাড়া দেননি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ ও ১৯৮৬ সালের ৭ মের নির্বাচনে প্রধান প্রধান দলের অনুপস্থিতির নির্বাচনে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি। তবে ওই নির্বাচনে নথিপত্রের হিসাবে ৪২টি দল অংশ নেয় এবং বিএনপির ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। ওই নির্বাচনের দিনও হরতাল পালন করে আওয়ামী লীগ। ১৫ ফেব্রুয়ারির সে নির্বাচনে মাত্র ২৬.৭৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় দলের অনুপস্থিতির মধ্যেও এরশাদ সরকারের অধীনে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ৫৪.৯৩ শতাংশ ভোটার ভোট দেন বলে তখন নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের অধীনে বিএনপি বাদে মূল দলগুলো অংশ নিয়েছিল। সেই নির্বাচনে ৬০.৩১ শতাংশ ভোট পড়ার পরিসংখ্যান রয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। অবশ্য এরশাদ সরকারের সময়কার ওইসব নির্বাচনে ভোটাররা কেন্দ্রে না গেলেও দলীয় কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই জাল ভোট দিয়েছে। সে কারণেই ভোটারবিহীন ওইসব নির্বাচনেও ভোটের সংখ্যা সন্তোষজনক দেখানো সম্ভব হয়েছে।

আগের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার শতকরা হার : নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ছিল ৫৪.৯১ শতাংশ। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে এ হার ছিল ৫১.২৯ শতাংশ। ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৬০.৩১ শতাংশ ভোটার। এ নির্বাচনে জামায়াতসহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট অংশ নেয়। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করে। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৫২.৪৮ শতাংশ ভোটার। এ নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের দলগুলো। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে এ হার ছিল ৫৫.৪৫ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে মাত্র ২৬ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৭৪.৯৬ শতাংশ ভোটার। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে এ হার ছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৭.১৩ শতাংশ ভোটার ভোট দেন।

আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করছে। তাঁরা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কঠোর অবস্থানে থাকবে। তবে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য দলের নীতিনির্ধারকরা কোনো কৌশল নেননি। তবে সারা দেশে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে উৎসাহী করার চেষ্টা করছেন। ক্ষমতাসীন দলের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ভোটার উপস্থিতির হার সম্মানজনক হলেই খুশি আওয়ামী লীগ। সে ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটার উপস্থিতি সংখ্যাকে ‘বেঞ্চমার্ক’ ধরে নিয়েছে দলের নীতিনির্ধারকরা।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ গতকাল ভোটারদের উদ্দেশে বলেছেন, তাঁরা যেন দলে দলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেন। এর আগে দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতারাও একই আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল এক ভিডিও বার্তায় ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে কেবল বিরত থাকাই নয়, ভোট প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ অন্য নেতারাও একই আহ্বান জানান।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মোট ভোটারের কত অংশ ভোট দিলে ওই নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য’ বা ‘সম্মানজনক’ হবে- তেমন কোনো মাপকাঠি বাংলাদেশে নেই। তবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়লে তাকে সাদাচোখে গ্রহণযোগ্য উপস্থিতি বলে মনে করা হয়। অবশ্য অন্য দেশগুলোতেও এমন কোনো মাপকাঠি নেই। পৃথিবীর উন্নত গণতন্ত্রের দেশগুলোর ভোটারদেরও ভোটদানে অনীহা আছে। ফলে অস্ট্রেলিয়াসহ কোনো কোনো দেশ ভোট দেওয়া সব ভোটারের জন্যই বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছে। তারপরও অনেক ভোটারই ভোট দেন না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এযাবৎকালের মধ্যে ১৮৭৬ সালে সর্বোচ্চ ৮১ ও ১৯২৪ সালে সর্বনিম্ন ৪৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। ২০১২ সালের নির্বাচনে ৫৭ শতাংশ ভোট পড়ে যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাজ্যে ২০০১ সালে সর্বনিম্ন ৫৯ ও সর্বোচ্চ ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৭৮ শতাংশ ভোট পড়ে। গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ভোট দেওয়া ভোটারদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। ওই বছর সর্বোচ্চ ৮১ ও ২০০৯ সালে সর্বনিম্ন ৬৫ শতাংশ ভোট পড়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কানাডায় সর্বনিম্ন ৫৯ ও ২০১১ সালে সর্বোচ্চ ৬১ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। পাশের দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ১৯৮৪ সালে সর্বোচ্চ ৬৩ ও ২০০৯ সালে সর্বনিম্ন ৫৮ শতাংশ ভোট পড়ে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন এবং ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সব প্রধান রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। ওই তিনটি নির্বাচনের সব কটিতেই ৭৫ শতাংশেরও বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে ৭৫.৬০, ২০০১ সালের নির্বাচনে ৭৫.৫৯ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৭.১৭ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

শেয়ার করুন