উনি যেন ‘দূর আকাশের তারা’

0
66
Print Friendly, PDF & Email

বিএনপির চলমান আন্দোলনে সারাদেশে ‘তেজস্ক্রিয়’ অবস্থার বিপরীতে রাজধানী ঢাকাতে কর্মসূচি চলছে ঢিলেঢালাভাবে।

সর্বশেষ অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঢাকায় যেন জমতেই চাইছে না। এজন্য দলের শীর্ষ নেতাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি এ নিয়ে দলের সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তোলা হচ্ছে।

তবে এক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চাইছে বিএনপির আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল। তাদের দাবি, এসব সংগঠনের প্রধানরা দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে আন্দোলনে কোনো দিক নির্দেশনা পাচ্ছে না।

এমন কি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে যোগাযোগ করতে পারছেন তারা। আন্দোলন উজ্জীবিত করতে খালেদার প্রত্যক্ষ কোনো নির্দেশনা যেমন নেই, তেমনি মাঠনেতাদের কাছে উনি যেন ‘দূর আকাশের তারা’।

সহযোগী এসব সংগঠনের নেতারা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন এখন গুলশানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেন না। ২০০১ সাল পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের কাছে সর্বজনীন থাকলেও তার রাজনীতি এখন গুলশান কেন্দ্রীক হয়ে গেছে।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আন্দোলন জমাতে দলের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের সঙ্গে কোনো সমন্বয় নেই দলের শীর্ষ নেতাদের। এমন কি সর্বশেষ ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ নিয়েও শীর্ষ থেকে কোনো সমন্বয় করা হয়নি। সহযোগী সংগঠনগুলো জানেই না তাদের অবস্থান কি হবে বা সরকারের বাধায় তাদের করণীয় কি।

তাদের মতে, ঢাকায় যারা আন্দোলন জমাবেন তাদেরকেই চেয়ারপারসন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এ জন্য গুলশানের তিন নেতার প্রতি আঙ্গুল তুলছেন তারা। ওই তিন নেতাকে দলের ‘তিন খলিফা’ হিসেবে মজা করে ডাকেন মাঠনেতারা।

ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর আন্দোলন জমাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে মূলত যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদল। কিন্তু চলমান আন্দোলনে এই তিন সংগঠনের জন্য দলের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা তো নেই বরং রয়েছে সমন্বয়ের অভাব।

রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে যে আন্দোলন হচ্ছে সেটি ব্যক্তি পর্যায় থেকেই হচ্ছে। ওই সব নেতা জানান, তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত আছে। শুধু নির্দেশনা আর সমন্বয় দরকার।

দলীয় সূত্র জানায়, গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন দলের নতুন ভ্যানগার্ডের পরিচয় পাওয়া সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল।

বর্তমানে খালেদা জিয়া নতুন যে ফোন নম্বরটি ব্যবহার করেন তা কেবল গুলশান কেন্দ্রীক চার-পাঁচ জন নেতা জানেন।

ডিসেম্বর রাতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীকে ফোন দিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। কিন্তু শমসের চৌধুরী ফোন না দিয়ে বরং ‘নেত্রী ব্যস্ত আছেন’ এমন কথা বলে কেটে দেন। পরে জানান, কোনো কথা থাকলে তাকেই জানাতে হবে। পরে আর কোনোভাবেই চেয়ারপারসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি স্বেচ্চাসেবক দলের সভাপতি।

এ নিয়ে চরম ক্ষুদ্ধ ওই সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, সংকটকালীন সময়ে যদি নেতার দর্শন না পাওয়া যায় তবে আন্দোলন জমবে কীভাবে। এজন্য চেয়ারপারসনের পাশে সার্বক্ষণিকভাবে যারা থাকেন তাদেরকে দায়ী করেছেন সহযোগী ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। একইভাবে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যুবদল ও ছাত্রদলও নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এ নিয়ে এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ আছে।

এদিকে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ ব্যর্থ হওয়ার পর আন্দোলন নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশাও কাজ করছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ বেশি।

তা ছাড়া আন্দোলন প্রশ্নে বিএনপির মধ্যেও দেখা দিয়েছে হতাশা ও সিদ্ধান্তহীনতা। অর্থাৎ দলটির সব কার্যক্রমই এখন চলছে অগোছালো আর অনেকটা আকস্মিকভাবে। এর প্রমাণ মিলছে বর্তমান সময়ে।

বিএনপি দেশের প্রধান বিরোধী দল। তিনবার দেশ পরিচালনার ইতিহাস ও অসংখ্য নেতা-কর্মী-সমর্থক থাকা সত্ত্বেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান জানাতে নির্ভর করছে ‘আকস্মিকতার’ ওপর। কখনো অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তা, কখনো বিবৃতি আবার কখনো হঠাৎ সংবাদ সম্মেলন করে জানান দিচ্ছে কর্মসূচি। এ থেকেই বোঝা যায়, নির্যাতনের ভয়ে তাদের কতটুকু নৈতিক বিপর্যয় হয়েছে। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপির এমন অবস্থায় বিচলিত নেতা-কর্মীরা।

এরই মধ্যে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে অনেকবার। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের আন্দোলন নিয়ে দলীয় অবস্থান জানানোর দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। দলের পাঁচ নেতা আটকের পর সাহসের সঙ্গে কার্যালয়ে ঢুকে তিনিই দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করতেন। গত ৩০ নভেম্বর তাকে আটকের পর দায়িত্ব পান আরেক যুগ্ম সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি কখনো সামনে আসেননি। তবে অজ্ঞাত স্থান থেকে ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এরপর দায়িত্ব পালন করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আর এ গনি। ধারাবাহিকভাবে সামনে আসেন স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান। কিছু দিন গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে নিজে উপস্থিত হয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিনিও চলে যান আড়ালে।

সংবাদ সম্মেলন থেকে বের হওয়ার পথে প্রেসক্লাব থেকে ২৯ ডিসেম্বর গ্রেফতার হন মেজর (অব.) হাফিজ। গত বুধবার নিজ বাসভবনে আকস্মিক সংবাদ সম্মেলন করেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান।

সর্বশেষ নিজ বাসভবনে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন করেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক। শেষ দুটি সংবাদ সম্মেলনের পাঁচ মিনিট আগে সাংবাদিকের জানানো হয়েছে, কোন জায়গায় সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ সংবাদ সম্মেলন করার জায়গা আকস্মিকভাবেই জানানো হয়েছে।

শেয়ার করুন