গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ : ফরেন পলিসি

0
58
Print Friendly, PDF & Email

যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত সাময়িকী ফরেন পলিসি শীর্ষ ১০ অস্থিতিশীল (ভালনারাবল) অঞ্চলের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং বলছে বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রানে পৌঁছে গেছে।

সাময়িকীটির অনলাইনে গত ৩০ ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘নেক্সট ইয়ার্স ওয়্যার্স/ ফ্রম সোচি টু সুদান, টেন কনফ্লিক্টস দ্যাট উইল থ্রেটেন গ্লোবাল স্ট্যাবিলিটি ইন ২০১৪’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে নিয়ে এ মন্তব্য করা হয়।

এ সমায়িকীটি প্রতিবছর বিশ্বায়ন তালিকা, ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকাসহ আরও দু-একটি তালিকা প্রকাশ করে থাকে।

ফরেন পলিসি বলছে এ বছরের অস্থিতিশীল দেশ বা অঞ্চলের তালিকায় নতুন অন্তর্ভুক্তি হয়েছে পাঁচটি : বাংলাদেশ, মধ্য আফ্রিকীয় প্রজাতন্ত্র, হন্ডুরাস, লিবিয়া ও উত্তর ককেসাশ। পুরোনো পাঁচটি অঞ্চল হলো মধ্য এশিয়া, ইরাক, সাহেল, সুদান এবং সিরিয়া-লেবানন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাকিস্তান, তুরস্ক, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, ইয়েমেন, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে সংগত কারণেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বিশ্বের অনেক সংঘাতময় রাষ্ট্রের

বাইরে কলম্বিয়াতে সরকার ও গেরিলা বাহিনীর শান্তি আলোচনা শুরু হয়েও শেষ হয়নি। তবে ইরানকে ঘিরে চলমান অচলাবস্থার অবসানের উদ্যোগও স্পষ্ট হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তালিকা তৈরিতে সেসব অঞ্চল বা দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেগুলোতে যখন-তখন সংঘাত বাঁধে। এসব রাষ্ট্রের বা অঞ্চলের প্রধান চরিত্র হলো অনুন্নয়ন, জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটাতে রাষ্ট্রগুলোর ব্যর্থতা, বৈষম্যের বিস্তৃতি ও বিভেদ সৃষ্টিকারী শাসনব্যবস্থা। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে রাষ্ট্রগুলোর প্রয়োজন হবে দীর্ঘ সময়, প্রত্যয় ও সম্পদ। কিন্তু দুঃখজনক হলো এসব রাষ্ট্রের এগুলো কোনোটাই পর্যাপ্ত নেই।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যা বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ ২০১৪ সালে প্রবেশ করল। দেশটিতে একদিকে জানুয়ারি মাসের নির্বাচন এগিয়ে আসছে। অপর দিকে সরকার ও বিরোধী দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতে বহু মানুষের মৃত্যু ও শত শত মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা ক্রমে বাড়ছে। বিরোধী দল দেশজুড়ে সহিংস অবরোধ বা হরতালের ডাক দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও নির্বাচনে কারচুপির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিরোধী দল বিএনপি বলছে, তারা নির্বাচন বর্জন করবে।

এ ধরনের বর্জন সংকটকে ঘনীভূত করবে এবং প্রাণঘাতী সংঘাতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের রোড ম্যাপ তৈরি না করে কেবল নির্বাচন স্থগিত করার মধ্যদিয়ে (যেমনটা করতে অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন) কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা ও বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার মধ্যে দীর্ঘ শত্রুতা টিকে আছে। যদিও ১৯৯১ সাল থেকে কেবল তাঁদের মধ্যেই ক্ষমতার হাতবদল চলছে। গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে তাঁরা কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ফোনে আলাপ করেন। কিন্তু তাতে তাঁরা যা করেন, তাতে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।

বিপদ অপেক্ষা করছে। ১৯৭১ সালের পর দেশটিতে অন্তত ৩০ দফা সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। এগুলোর এক পঞ্চমাংশ সফল হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুজন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাকা-ের শিকার হতে হতে হয়েছে, যাঁদের একজন শেখ হাসিনার বাবা মুজিবুর রহমান। [কার্যত দুজন প্রধানমন্ত্রী নন, একজন। অন্যজন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।] আজও সেনাবাহিনী একটি হুমকি। এছাড়া, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উগ্রবাদী হয়ে ওঠা, মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি এবং বাংলাদেশের জটিল অর্থনৈতিক গতিপথ সব মিলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে।

বিশেষ করে, গত দু বছরে, সরকারের উদ্যোগে গঠিত এক ট্রাইব্যুনাল বেশ কয়েকটি ত্রুটিপূর্ণ রায় দিয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করার দায়ে ওই ব্যক্তিদের সাজা দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত যেসব ব্যক্তিদের সাজা হয়েছে, তাঁরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা মূল অপরাধের জন্য দায়ী, তাদের কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। বিএনপি ও ইসলামপন্থী জামায়েতে ইসলামীর ছয় নেতাকে মৃত্যুদ- দিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলা হয়েছে। এতে ধর্মপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী দুটির মধ্যে সংঘাত এত তীব্র হয়েছে যে, এ সুযোগে হেফাজতে ইসলামের মতো উগ্রপন্থী সংগঠনের উত্থান ঘটেছে।

এ সমস্যার সমাধানে হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং স্থিতিশীল ও দায়িত্ববান সরকার গঠন করা। এ জন্য শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে পরস্পরের প্রতি নাক সিটকানো বন্ধ করে সমাধানের রোড ম্যাপ তৈরির জন্য সমঝোতায় উপনীত হতে হবে।

সূত্র : ইউএস ফরেন পলিসি জার্নাল

শেয়ার করুন