‘বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত’

0
77
Print Friendly, PDF & Email

সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত অনিশ্চিত বলেই প্রতীয়মান। এর বেশ কিছু কারণ বিগত দিনের সহিংসতার মধ্যে নিহিত। লন্ডনের সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সিনিয়র ফেলো ও কিংস কলেজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শ্রীনাথ রাঘবনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদক অশীষ যেচুরি। ‘১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের লেখক শ্রীনাথ বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টিকে বৈশ্বিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বৈশ্বিক প্রভাব ছিল এবং ইসরাইলের সম্পৃক্ততার কথাও তিনি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার কথা ব্যক্ত করেনি আওয়ামী লীগ।
নিচে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
আপনার গ্রন্থটির নাম ‘১৯৭১: এ গ্লোবাল হিস্টি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ’। বৈশ্বিক কেন?
সাধারণভাবে, বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টি উপমহাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একে দ্বিতীয় দেশ-বিভাজন হিসেবে দেখা হয়। এটা আমার কাছে খুব সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মনে হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের যে ব্যাপক সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং এর মাধ্যমেই যে নিষ্পত্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে, সংকীর্ণ এ দৃষ্টিভঙ্গিতে তা বিবেচনা করা হয় না। এটা ছিল বৈশ্বিক ঘটনা, অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাও মনে করেছিলেন তাদের বৈশ্বিক সমর্থন নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল।
আপনার যুক্তিতে বাংলাদেশ সৃষ্টি অনিবার্য কোন বিষয় ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বিভিন্ন পরিস্থিতি আপনি তালিকাভুক্ত করেছেন, যা বাংলাদেশ সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। আপনি এ বিষয়টি কিভাবে সমন্বয় করবেন?
একত্রিত পাকিস্তানের অস্তিত্ব ছিল নড়বড়ে। ভৌগোলিকভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। একই দেশের দুটি ডানা ভারতের মাধ্যমে পৃথক হয়েছে। বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং ভারসাম্যহীন ক্ষমতা-বণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য ছিল। আমার যুক্তি হচ্ছে, স্বায়ত্তশাসন কিভাবে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হলো, তা অনুধাবনের জন্য প্রকৃত অর্থেই পেছনের দৃশ্যপট আপনার জানার কোন প্রয়োজন নেই। বিষয়টি বুঝতে আমাদের প্রয়োজন আরও উদার দৃষ্টিভঙ্গি।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া যদি এতো জোরালো না হতো, তবে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না বলে কি মনে করেন আপনি?
আপনি একটি দুর্বল বন্ধনযুক্ত রাষ্ট্র পেতেন, যা কিছু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্তও আওয়ামী লীগ প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার কথা ব্যক্ত করেনি। তারা পূর্ব পাকিস্তানের কাছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরসহ একটি দুর্বল সম্পর্ক চেয়েছিলেন। আশা ছিল যে, দুর্বল সম্পর্কের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন হলে, বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগবে। আর, সেটা হলে পূর্ব পাকিস্তান অধিক ক্ষমতার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেতো।
‘১৯৬৮ সালের চেতনা’র সঙ্গে এ বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করার কারণ কি?
আমার দৃষ্টিতে ১৯৬৮ সালের ছাত্র-আন্দোলন পাকিস্তানের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন আইয়ুব খান। বৈষম্য ও সম্পদ পুঞ্জিভূত করার সমস্যার মধ্যেও পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ভাল অবস্থায় ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলন পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেছিল। ছাত্র আন্দোলন ছিল একটি বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ। আমি সিআইএ’র একটি নথি উদ্ধৃত করছি যেখানে তারা বলছে, এটা ছিল বৈশ্বিক ঘটনা। পাকিস্তানের ওই শিক্ষার্থীরা ছিল ভিন্ন প্রজন্মের। ১৯৪০-এর দশকে শেখ মুজিবুর রহমান নিজে একজন ছাত্রনেতা ছিলেন। ভিন্ন আকাক্সক্ষা নিয়ে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। ছাত্র আন্দোলনের আমূল সংস্কার আওয়ামী লীগকে বাধ্য করেছিল তাদের নমনীয় অবস্থান থেকে সরে আসতে।
এসব ঘটনা প্রবাহের মধ্যে ইসরাইল জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আপনি উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কে আরও কিছু বলবেন কি?
ভারতে অস্ত্র সরবরাহের ইতিহাস রয়েছে ইসরাইলের। ১৯৬৫ সালে ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে ভারতে অস্ত্র পাঠিয়েছিল ইসরাইল। ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের গোপন লেনদেন ছিল। ১৯৭১ সালে ইসরাইল যে ভারতে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানতো এমন কোন ইঙ্গিত নেই। ভারতের কাছ থেকে পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি ইসরাইলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, সে সময় ইসরাইল বেশ বিচ্ছিন্ন ও একঘরে হয়ে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল, ভারতে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি তাদের সহযোগিতা করবে।

শেয়ার করুন