প্রার্থীবিহীন নির্বাচনের কলঙ্ক কেন লাগানো হচ্ছে আ.লীগের কপালে?

0
49
Print Friendly, PDF & Email

‘আমরা আর মামুরা’। বিশ্বের সব রেকর্ড ভঙ্গকারী বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেই অবস্থা। প্রার্থীরা লড়ছেন নিজেদের মহাজোটের শরিকদের সঙ্গে, ভোটের লড়াই হচ্ছে যাদের নিয়ে তথাকথিত ‘সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার’ হয়েছে তাদের মধ্যেই।

কেলেঙ্কারির শেষ নেই, কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী উবায়দুল মোকতাদিও চৌধুরীর সমথর্করা বিক্ষোভ দেখানোর জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছিল। তাদের প্রতিবাদ ছিল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কারণ ঢাকা থেকে উবায়দুল মোকতাদিরকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছিল। জাতীয় পার্টির সঙ্গে সমঝোতার কারণে বলি হওয়ার কথা ছিল। ওই আসনে জাতীয় পার্টিও যুগ্ম মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভুঁইয়াকে ওয়াকওভার দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং রিটার্নিং অফিসার উল্টো রেজাউল ইসলামের মনোনয়ন বাতিল করে দিয়েছেন। সর্বশেষ নির্বাচন কমিশন বদলি করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসককে।

আর যে আমরা মামুরার কথা বললাম। সে রকম নির্বাচন হচ্ছে দিনাজপুর জেলায়। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় দিনাজপুরের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীরা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবালুর রহিমসহ নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা লড়ছেন ওয়ার্কার্স পার্টির হাতুড়ি মার্কার বিরুদ্ধে। হাস্যকর হচ্ছে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাদের মধ্যে দলীয় প্রধান রাশেদ খান মেননসহ চারজন নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন মহাজোটের সমঝোতার প্রার্থী হিসেবে। ওয়ার্কার্স পার্টির বাকি প্রার্থীদের প্রতীক হচ্ছে হাতুড়ি। আমরা আর মামুরার এই নির্বাচনে বেশ কটি আসনে আবার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)। বর্তমান সরকারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি রাজনৈতিক দল বিএনএফ এবারের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মাত্র এক ডজন দলের একটি দল।

একতরফা নির্বাচনে যখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে আছেন ১৫৬ জন প্রার্থী তখন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বিশেষ সহকারী ও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মাহবুব-উল-আলম হানিফকেও জয়ী হতে হবে বিএনএফ প্রার্থীও সঙ্গে লড়াই করে। কুষ্টিয়া-৩ (সদর উপজেলা ) আসনে তার বিরুদ্ধে বিএনএফের প্রার্থী রকিব উর রহমান খান চৌধুরীকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখার জন্য অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম মহাসচিব। কিন্তু সফল হননি। তাই সর্বশেষ নিজের নিরাপত্তা চেয়ে নির্বাচনকে চিঠি দিয়েছেন মাহবুব-উল-হানিফ। বলা যায়, এবারের নির্বাচনের শক্তিশালী দল বিএনএফ। কারণ শুধু মাহাবুব-উল-হানিফ নন, খোদ রাজধানীতেও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর পোড় খাওয়া রাজনীতিক আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনকেও তার আসনে লড়তে হচ্ছে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনএফের প্রার্থী আতিকুর রহমান নাজিমের বিরুদ্ধে। সাহারা খাতুন আর মাহাবুব-উল-আলম হানিফই শুধু নন, প্রার্থীহীন এই নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ মুহিবুর রহমান মানিকের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনএফ প্রার্থী মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী বরগুনা-১ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তার বিরুদ্ধেও ‘শক্ত’ প্রার্থী বিএনএফের খলিলুর রহমান। এখানে আরেকজন আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন। যশোর-৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেকের বিধবা পতœী ইসমাত আরা সাদেকের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন বিএনএফের প্রার্থী প্রশান্ত বিশ্বাস ।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে এবার লড়তে হচ্ছে নিজেদের শরিক দলগুলোর বিরুদ্ধে। এবার সবচেয়ে কমসংখ্যক মাত্র ১২ রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দল। আর আছে জাতীয় পার্টি, যার অবস্থান নির্বাচনে যোগদান করা না করার মাঝামাঝি এক ঝুলন্ত দড়িতে। এই যাত্রা দলের একদিকে রওশন এরশাদ আর অন্যদিকে জি এম কাদের। একজনের স্বামী আর অন্যজনের ভাই দলের চেয়ারম্যান, সঙ হয়ে সম্মিলিত হাসপাতালে অবস্থান করছেন, যার নামের আগে দুই যুগ আগে যুক্ত হয়েছিল বিশ্ববেহায়া উপাধি।

তেমন একজন সমালোচিত রাজনীতিককে সঙ্গে নিয়ে একটি বিতর্কিত নির্বাচন করে কী লাভ হচ্ছে আওয়ামী লীগের? এই প্রশ্ন দলের মাঠের নেতা-কর্মীদের। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রপরিচালনায় দৃশ্যমান অনেক সাফল্য সত্ত্বেও কেন দলটি আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসা নিশ্চিত করতে পারল না তা নিয়ে বড় মাপের গবেষণা হয়তো হতে পাওে; কিন্তু পোড় খাওয়া রাজনৈতিক দলের অনেক সাধারণ নেতা-কর্মীদের অভিমত হচ্ছে এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তির। ফলে ক্ষমতার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে পুরনো রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলের লাগাতার অবরোধে জেলায়-উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, জ্বলছে তাদের বাড়িঘর। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সাতক্ষীরা জেলার। যেখানকার এমপি রুহুল হক দেশের অন্যতম বড় একটি মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চালালেন পাঁচ বছর, তিনি নিজের জেলার রাজনৈতিক অসুস্থতা মোকাবিলায় ব্যর্থ। মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে মন্ত্রী হয়েছিলেন নির্বাচনকালীন সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন; কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছেন নিজ নির্বাচনী এলাকা দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায়। নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কোনো মন্ত্রী নেই, তাই আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভূমিমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। যিনি পাঁচ বছর দলে ছিলেন কোণঠাসা, প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে বাদ দিয়ে উপদেষ্টা করা হয়েছিল, এখন দুঃসময়ে তাদের পাশে রাখার চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু অজানা এক কারিশমায় এখনো মন্ত্রিত্ব বজায় রাখতে পেরেছেন। কিন্তু নিজের নির্বাচনী এলাকার জনসমর্থন যারপরনাই কমে গেছে। এই একতরফা নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মনে করেন যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে শুধু তার নির্বাচনী এলাকায় তাহলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভরাডুবি কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিছুদিন আগে পাবনায় সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা হয়েছিল তার পেছনে ছিল এই সাইয়িদ-টুকুর দ্বন্দ্ব। এলাকার লোকেরা বলে হামলাকারীদের সঙ্গে শামসুল হক টুকুর দহরম মহরম বেশি। এমনকি ওই হামলা সম্পর্ক জামায়াতে ইসলামী নিজেরা একটি তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করে নানা জায়গায় পাঠিয়েছে, যেখানে একটি ছবিতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের অন্যতম একজনকে শামসুল হক টুকুর পাশে মিছিল করার ছবিও দেয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন