নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি উধাও শেষ দুই মাসে

0
151
Print Friendly, PDF & Email

মানভেদে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ কিনতে খরচ হচ্ছে ৩৫ থেকে ৭০ টাকা। আর গত বছরের এই দিনে সব ধরনের পেঁয়াজ মিলত ৩০ থেকে ৪৫ টাকায়। তবে এ থেকে কোনোভাবেই অনুমান করা সম্ভব নয় যে এই পেঁয়াজ সারা বছর ক্রেতাদের কী পরিমাণ ভুগিয়েছে।
পুরো ২০১৩ সালেই সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কেন্দ্রে ছিল পেঁয়াজ। মসলাজাতীয় এই পণ্যটির ঝাঁজ ছুঁয়েছে দামের সর্বকালের রেকর্ডও। ক্রেতাদের এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে ১৫০ টাকায়। অবশ্য পেঁয়াজের এখন দাম কমে এসেছে।
তবে এখন আর স্বস্তিতে নেই সাধারণ মানুষ। গত দুই মাসে টানা হরতাল-অবরোধে নিত্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে বেড়েছে সব পণ্যেরই দাম। সারা বছর বাজারে মোটামুটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠেছে বছরের শেষ দুই মাসে।
বাজারচিত্র: বছরের শুরুটাই হয়েছিল ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার মধ্য দিয়ে। তখন খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১১৫-১১৬ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হতে থাকে ১২৬-১২৮ টাকায়। খোলা পাম তেলের দামও তখন বাড়ে। সারা বছর আর ভোজ্যতেলের দাম বাড়েনি। অবশ্য সম্প্রতি টানা অবরোধের জেরে আবারও তেলের দাম বেড়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও রমজানের আগে-পরে এক-দেড় মাস নিত্যপণ্যের বাজার খানিকটা চড়ে গিয়েছিল। তবে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সে কারণে রমজানে ক্রেতাদের ভোগান্তিও ছিল কম। কোরবানির ঈদেও তা-ই।
এ বছর কয়েক দফায় দাম বেড়েছে গুঁড়া দুধের। সর্বশেষ এ মাসের মাঝামাঝিতেও দুধের দাম বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে গুঁড়া দুধের দাম কেজিতে বেড়েছে ১২০ টাকারও বেশি। গত বছরের ডিসেম্বরে এক কেজি ওজনের ডানো ব্র্যান্ডের দুধের দাম যেখানে ছিল ৫৭০ টাকা, সেই দুধ এখন কিনতে হচ্ছে ৬৮৫-৬৯৫ টাকায়। নিয়মিত বিরতিতে এ পণ্যটির দাম বাড়লেও এদিকে নজর নেই কোনো সরকারি সংস্থারই।
কিছু পণ্যের দাম সারা বছরই ওঠানামা করেছে। যেমন—আদা, রসুন ও মুরগি। এসব পণ্যের দাম এই সপ্তাহে বেড়েছে তো পরের সপ্তাহে কমে গেছে।
বছরের এই সময়টায় শীতকালীন সবজিতে বাজার ভর্তি হয়ে যায়। কম দামে সবজি বিক্রি হয় বাজারে। এ বছরও সে রকমই আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু টানা অবরোধ বাজারে আগুন লাগিয়ে দেয়। যার ফলে ১৫ টাকার বিক্রি হওয়া ফুলকপি দুই দিনের ব্যবধানে ক্রেতাদের কিনতে হয় ৪০ টাকায়।
সম্প্রতি সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। চালের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে এ বছর একটি বিষয় লক্ষ করা গেছে। গত কয়েক বছর যেখানে মৌসুম শেষ হওয়ার পর চালের দাম বাড়তে দেখা গেছে, এ বছর দেখা গেছে উল্টো। বোরো ও আউশ ধান ওঠার পর চালের দাম যেমন বাড়তে দেখা গেছে, তেমনি এখনো আমন ধান ওঠার পরই চালের দাম বেড়েছে। এখনকার কারণ হিসেবে অবশ্য টানা অবরোধে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধান চাতালগুলোতে না যেতে পারা এবং মিল থেকে সারা দেশে চাল সরবরাহ করতে না পারাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
তবে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, ভারতে উৎপাদন কম হওয়া, দফায় দফায় সে দেশে পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বাড়ানো এবং টানা অবরোধ-হরতালে স্থলবন্দরে দিনের পর দিন আমদানি করা পেঁয়াজ পড়ে থাকায় পণ্যটির দাম কোনোভাবেই কমছিল না। কোরবানির ঈদের দুদিন আগে এক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায় কেজিতে ২০ টাকা। অবশ্য এখন দাম কমে এসেছে। দেশে যেমন পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে, তেমনি ভারতও পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য এক হাজার ১৫০ ডলার থেকে দফায় দফায় কমিয়ে ১৫০ ডলারে নামিয়েছে।
অবরোধ-হরতালের প্রভাব: এ বছরের শুরু থেকেই নির্বাচনকেন্দ্রিক হরতাল কর্মসূচি দিতে শুরু করে বিরোধীদলীয় জোট। আর মার্চ থেকে শুরু হয় টানা হরতালের মতো কর্মসূচি। সে সময় সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও তা কাটিয়ে ওঠা যেত। কারণ, তিন দিন হরতালের পর সপ্তাহের বাকি সময়টায় চাহিদা মেটানোর মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত। তবে পণ্যের দাম বেড়ে যেত বাড়তি ট্রাকভাড়ার কারণে।
কিন্তু নভেম্বর থেকে পুরো সপ্তাহ হরতাল এবং ২৬ নভেম্বর থেকে সপ্তাহজুড়েই অবরোধ কর্মসূচি পালিত হতে থাকে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারও বাদ যায়নি অবরোধ থেকে। সে কারণে সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে গিয়ে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। আর তাই এ দুই মাসে নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে।
আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং পণ্য পরিবহনকারী যানবাহনের মালিকেরা জানান, আগে হরতালে নিত্যপণ্যবোঝাই ট্রাক ছেড়ে দেওয়া হতো, বড়জোর ভাঙচুর হতো। এখন পণ্যবোঝাই ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর আগের কোনো অবরোধই এখনকার মতো সহিংস ছিল না। এসব কারণে হরতাল-অবরোধ চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য পাঠাতে যেমন দ্বিধায় থাকেন মোকাম ব্যবসায়ী ও আড়তদারেরা, তেমনি অনেক ট্রাকমালিকই এ অবস্থায় পরিবহন করতেও সাহস দেখান না। যেসব ট্রাকমালিক পণ্য পরিবহনে আগ্রহী হন তাঁরা নেন দ্বিগুণ কিংবা তিন গুণ ভাড়া।
পরিবহনমালিকেরাই স্বীকার করেছেন, টানা অবরোধের সময় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এক লাখ এবং দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহন করতে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিয়েছেন তাঁরা। এর প্রভাব সামগ্রিকভাবে পণ্যমূল্যের ওপর পড়েছে।

শেয়ার করুন