চার মাসের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে বিমান

0
214
Print Friendly, PDF & Email

আগামী চার মাসের মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ন্যূনপক্ষে ৮শ কোটি টাকা না পেলে রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ার বাংলাদেশ বিমানকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে হবে। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কেভিন জন স্টিল এক চিঠিতে সরকারকে এই আশংকার কথা জানিয়েছেন। এদিকে আর্থিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে ১ হাজার ৬শ কোটি টাকা চেয়ে কেভিন স্টিল সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে চিঠি দিয়েছিলেন তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে তারা। নিরুপায় কেভিন এখন বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর ৮শ কোটি টাকার তহবিল চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। বলেছেন, আগামী চার মাসের মধ্যে এই টাকা না পেলে বিমানকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে হবে। এদিকে ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিমানের নিট লোকসান হয়েছে ১৯৮ কোটি টাকা। বিমান এমডি বলেছেন, এটি গত বছরের তুলনায় ৪০২ কোটি টাকা কম। গত বছর বিমান লোকসান দেয় ৬শ কোটি টাকা। সোমবার বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভা সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এয়ারলাইন্স বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু জ্বালানি খাদক ডিসি-১০ উড়োজাহাজ বহর থেকে বাদ দেয়ায় এক বছরে জ্বালানি কম লেগেছে ২১৪ কোটি টাকার। সেই হিসাবে যদি বহরে ডিসি-১০ উড়োজাহাজ থাকত তবে লোকসান বেড়ে হতো ৪১২ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরে বিমানের মার্কেটিংয়ের চিত্র ছিল খুবই ভয়াবহ। গড়ে কেবিন ফ্যাক্টর (আসন অনুযায়ী যাত্রী) ছিল মাত্র ৬০ শতাংশ। শুধু সিঙ্গাপুর রুটে বিমান ছিল লাভজনক। কুয়ালালামপুর ও মধ্যপ্রাচ্যে লাভ-লোকসান সমান ছিল। নতুন চালু করা দিল্লি ও হংকং রুটে লোকসান সবচেয়ে বেশি। এই রুটে ফ্যাক্টর ছিল মাত্র ১৫-২০ শতাংশ। মার্কেটিং শাখার হিসাব অনুযায়ী এয়ারলাইন্স ব্যবসার পিক আওয়ার জুন-জুলাই মাস। গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে শুধু এই দুই মাসে বিমানের আয় কমেছে ১৩৫ কোটি টাকা। তবে বিএফসিসি ও পোলট্রি থেকে ২৪ কোটি টাকা আয় করেছে বিমান। সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেল খাতে খরচ কমাতে পারলেও ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় খরচ আরও বেড়েছে। এ বছর শুধু এই শাখায় খরচ হয়েছে ৫শ কোটি টাকার বেশি। আর সবচেয়ে বেশি অডিট আপত্তিও এই শাখায়। এছাড়া কাস্টমার সার্ভিস বিভাগটিও ছিল পুরোপুরি ব্যর্থ। বার্ষিক সাধারণ সভায়, মার্কেটিং বিভাগের দুরবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়েছে ওই শাখার জেনারেল ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল হাসানকে।
জানা গেছে ঢাকাসহ ১৬টি বৈদেশিক স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার কাজ করেন এই জিএমের আওতায়। সেক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ। সাধারণ সভায় এজন্য নতুন এমডি কেভিন স্টিলও তোপের মুখে পড়েন। কারণ যোগদানের পর থেকেই কেভিনকে নানাভাবে বলা হয়েছিল আবদুল্লাহ আল হাসান, মোসাদ্দেক আহম্মেদসহ বিমানের অদক্ষ অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজদের অন্যত্র সরিয়ে দিতে। কেভিনের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দুর্নীতিবাজ পরিচালক মোসাদ্দেক আহমেদকে দায়িত্ব না দেয়ার জন্যও কেভিনকে বলা হয়েছিল। কিন্তু কেভিন এটা না শুনে উল্টো তাদের সঙ্গে বেশি সখ্য গড়ে তুলেছেন। প্রশ্রয় দিয়েছেন। কেভিনের এই আচরণ ছিল রহস্যময়।
বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিপিসি), সিভিল এভিয়েশন, লিজ দাতা সংস্থা, ইঞ্জিন মেরামত কোম্পানিসহ ১৬টি বড় সংস্থা বিমানের কাছে ৪ হাজার কোটি টাকা পাবে। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি চরম উড়োজাহাজ সংকটেও পড়েছে বিমান। জানা গেছে, রেগুলেটরি কমিশনের (বেবিচক) একগুঁয়েমি, অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ আর কমিশন বাণিজ্যের জন্য বিমান কম দামি ও বেশি বয়সী উড়োজাহাজ ভাড়া করার অনুমতি পাচ্ছে না। সিভিল এভিয়েশনের ও মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালে তাদের পছন্দের একটি কোম্পানির কাছ থেকে উড়োজাহাজ ভাড়া নেয়ার জন্য লিজের উড়োজাহাজের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ২০ বছর করে দিয়েছিল। এটা এখনও অব্যাহত আছে। বয়সসীমা ২০ বছর বেঁধে দেয়ায় গত দুই বছরে বিমানকে ১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে।
বিমানের বোর্ড চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিন বলেছেন, শুধু দেশে নয়, গোটা বিশ্বের এখন এয়ারলাইন্স ব্যবসায় চরম ক্রান্তিকাল যাচ্ছে। অনেক এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানিসহ অধিকাংশ উন্নত দেশ তাদের রাষ্ট্রীয় ক্যারিয়ারগুলোতে অর্থ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। আরব-আমিরাতের রাষ্ট্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল ভর্তুকি দিয়ে তাদের বিমান সংস্থাগুলোকে সহযোগিতা করছে। রেগুলেটরি কমিশনগুলোও তাদের নানা সাহায্য-সহযোগিতা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র উল্টো।
চেয়ারম্যানের মতে, নতুন এমডি কেভিন স্টিল যোগদানের পর বিমান ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করেছে। এ মুহূর্তে বিমানকে লাভজনক করতে হলে বড় ধরনের তহবিল দরকার। বিমান সরকারকে আশ্বস্ত করেছে এই ঋণের টাকা তারা ফেরত দেবে। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংক ও রেগুলেটরি কমিশন বিমানের প্রতি নানাভাবে নেতিবাচক আচরণ করছে। রেগুলেটরি কমিশন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পর্যন্ত মানছে না। তিনি বলেন, প্রতিটি কাজে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমানকে ভালোবাসেন বলে এ পর্যন্ত নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। সভরেন গ্যারান্টি দিয়েছেন। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে যদি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও রেগুলেটরি কমিশনের সহযোগিতা না পাওয়া যায় তাহলে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বিমানকে বাঁচাতে হলে তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা ছাড়া বিকল্প নেই। তা না হলে দেউলিয়া ঘোষণা করতে হবে বিমানকে। আর যদি আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায় তাহলে ২০১৫ সাল থেকে বিমান পুরোপুরি লাভে চলে যাবে।
এদিকে সম্প্রতি বিমানের এমডি কেভিন স্টিল সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিমান লাভের ধারায় যাচ্ছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেছিলেন, জুন-জুলাই মাসে বিমান বড় অংকের টাকা লাভ করেছে। বার্ষিক সাধারণ সভায় এ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন কেভিন।

শেয়ার করুন