নাটকীয় জীবনের নাটকীয় রেকর্ড

0
203
Print Friendly, PDF & Email

প্রতিটা ম্যাচে দারুণ বল করছেন। নিজের কাছেই মনে হচ্ছে, যে কোনো বলে উইকেট পেতে পারেন। কিন্তু উইকেট আসছে না; তিন ম্যাচে একটি মাত্র উইকেট। আগের ম্যাচেই ৩ ওভারে মাত্র ৮ রান দিয়েছেন, কয়েকটা সুযোগও ছিল; কিন্তু উইকেট পাননি। এদিনও দারুণ বল করলেন, ব্যাটসম্যানদের বিপদে ফেললেন; কিন্তু সেই উইকেট আর দেখা দেয় না!

পরদিন তার জন্মদিন। তাহলে কী জন্মদিনে খালিহাতেই ঢাকায় ফিরতে হবে? চার ম্যাচ খেলে ওই একটা উইকেট সম্বল করে জন্মদিনে বাসায় ফিরবেন সিলেট থেকে?

না, নাটক তখনও বাকী! শেষ ওভারে যে নাটকীয় বোলিং পারফরম্যান্স করলেন, তাতে নিজের জন্মদিনটা তো জ্বলজ্বলে হয়ে উঠলোই, বিশ্বরেকর্ডও হয়ে গেল! হ্যা, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রথম বোলার হিসেবে এক ওভারে ৫ উইকেট নিয়ে বিশ্বরেকর্ড করেই ঢাকায় ফিরলেন বাংলাদেশের তরুণ সেনসেশন আল আমিন হোসেন।

ফোনের ওপাশে কণ্ঠের উচ্ছ্বাস শুনে পরিষ্কার বোঝা গেল, আনন্দের সে রেশ এখনও কাটেনি। এমন একটা পারফরম্যান্সের পর গতকাল নিজের জন্মদিনটা সম্ভবত জীবনের অন্যতম সেরা জন্মদিন হিসেবে কাটাচ্ছেন আল আমিন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আজকে আমার জন্মদিন তো। একদিন আগেই জন্মদিনের উপহার পেয়ে গেলাম আর কী! হা হা…। কে যেন ম্যাচের পরই বললেন, রেকর্ড হয়েছে। আমি ঠিক বুঝিনি কী রেকর্ড। পরে রাবিদ ভাই (বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার) আমাদের কোচ বাবুল স্যারকে ফোন দিয়ে মনে হয় বলেছেন যে, এটা বিশ্বরেকর্ড। এর আগে নাকি কেউ এক ওভারে পাঁচ উইকেট পায়নি।’

গত পরশু, বৃহস্পতিবার আবাহনীর বিপক্ষে বিজয় দিবস ক্রিকেটে আল আমিন এই যে নাটকীয় পারফরম্যান্স করলেন, তাতে অপরিচিত কেউ অবাক হতেই পারেন। কিন্তু আল আমিনের জীবনের গল্প যারা জানেন, তাদের কাছে, এটাকে স্বাভাবিক বলেই মনে হবে। কারণ, এই পেসারের জীবনের গল্পটাই যে সিনেমার মতো নাটকীয়।

হ্যা, একেবারে রূপালী পর্দার কাহিনীর মতো করে আজকে দেশের অন্যতম উঠতি তারকা পেসার হয়ে উঠেছেন এই আল আমিন।

ঝিনাইদাহর এই তরুণ এলাকায় ক্রিকেট খেলতেন ছোটবেলা থেকেই। বয়সভিত্তিক জেলা দলগুলোতে প্রতিনিধিত্বও করেছেন। কিন্তু নানা কারণেই বিভাগীয় বয়সভিত্তিক দল বা জাতীয় পর্যায়ে আসা হচ্ছিল না। একটা পর্যায়ে এসে আল আমিন ক্রিকেটের চেয়ে পড়াশোনাতেই বেশি মন দিতে শুরু করলেন। ভালো করে বললে বলা যায়, পেশাদার ক্রিকেটের স্বপ্ন ছেড়ে দিতেই বসেছিলেন।

সেই সময়ই জীবনের অন্যতম নাটকীয় সময়টা এসে গেল এই ঢাকাতে।

তখন মাত্র উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছেন। ছিলেন ধানমন্ডিতে। যেহেতু ক্রিকেটার মানুষ, তাই অবসরে একদিন বেড়াতে বেড়াতে চলে গেলেন আবাহনী মাঠে। তারপর আল আমিনের মুখেই শুনুন, ‘ওখানেই কী এক ঘটনাচক্রে দীপন ভাইয়ের সঙ্গে (ক্রিকেট কোচ) দেখা হয়ে গেল। উনি আমাকে চিনতেন। উনি বললেন, ঢাকায় খেলো। বলে লালমাটিয়া দলে খেলার সুযোগ করে দিলেন। আর সেখানেই একদিন নেটে তাজিন (তাসকিন আহমেদ) ও অন্য ফাস্ট বোলারদের দেখতে এলেন ইমরান স্যার (সারওয়ার ইমরান)। স্যার আমাকে পছন্দ করে ফেললেন। তারপর তো বাকীটা স্যারই যা করার করেছেন। বলতে পারেন, এই স্যার আমাকে দেখাটাই আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।’

সেই টার্নিং পয়েন্টের ফলে আল আমিনের জীবন এতোটাই ‘টার্ন’ নিল যে, পরের বছর দুয়েকের মধ্যে তিনি জাতীয় পর্যায়ের তারকা হয়ে গেলেন। মূলত সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগে প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে চমকে দিয়েছিলেন দেশকে। এরপর জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিও খেলে ফেলেছেন। যদিও একটি করে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে বলার মতো কিছু এখনও করে দেখাননি আল আমিন। তবে সেই করে দেখানোর চেষ্টায় কোনো কমতি আছে বলে আল আমিনের কথায় মনে হয় না, ‘সব ক্রিকেটারেরই চূড়ান্ত চেষ্টাটা থাকে, দেশের হয়ে খেলার সময় সেরাটা দেয়া। আমি সেই চেষ্টাই করি। কিন্তু জানেন, একটা ভাগ্য তো লাগে উইকেট পেতে। আগের ম্যাচেই ৩ ওভারে মাত্র ৮ রান দিয়েছি। চান্সও ছিল। কিন্তু একটা উইকেটও পাইনি। প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ম্যাচে ৬ উইকেট পেয়েছিলাম, পরের ম্যাচে ৫ উইকেট পাওয়ার পথে হ্যাটট্রিকের চান্সও তৈরি হল। কিন্তু হ্যাটট্রিকটা হল না। আসলে ভাগ্য লাগে। আশা করি, জাতীয় দলের হয়ে এরপর সুযোগ পেলে নিজের সেরাটা দেয়ার পাশাপাশি ভাগ্যের সহায়তাও পাবো।’

হ্যা, পুরো বোলিং জীবনটাকেই, বলা ভালো জীবনটাকেই এভাবে ভাগ্যের একটা খেলা বলে দেখতে চান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের এই ছাত্র। এই যেমন সর্বশেষ কীর্তিটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার ভাগ্যের প্রশংসাই করছিলেন।

ওভারে ৫ উইকেটের স্বপ্ন নিয়ে কারোরই শেষ ওভারের বল করার কথা নয়। আল আমিন বলছেন, তার লক্ষ্য ছিল আসলে একটু রান আটকাতে বলে ভেরিয়েশন করা। আর তাতেই ভাগ্য এমন হাসা হাসল, ‘আমার লক্ষ্য ছিল কী, বলি। ওরা এর আগের ওভারে ২২ রান করেছে, তার আগের ওভারে ১৬ রান তুলেছে। আমি দেখলাম, ওরা যেভাবে ব্যাট চালাচ্ছে, তাতে একটু ভেরিয়েশন করলে হয়তো রানটাও আটকানো যাবে, উইকেট আসলে আসবে। মূল লক্ষ্যটা ছিল আমার এই ওভারে ছয় রান বা এরকম দিয়ে হলেও শেষ করা। না হলে ওদের স্কোর ১৫০-এর ওপরে চলে যাবে। সেটা হলে ব্যাটসম্যানদের জন্য টাফ হত। তাই বলে ভেরিয়েশন করলাম। আর তাতেই…’

হ্যাঁ, তাতেই যা হল, তাতে আল আমিনকে ক্রিকেট ইতিহাস মনে রেখে দেবে। এখন দেশের হয়ে বল হাতে এর কাছাকাছি কিছু করা বড় দরকার। একজন পেস তারকা দেখতে দেশ যে বড় উদগ্রীব হয়ে আছে।

শেয়ার করুন