মার্চ ফর ডেমোক্রেসি ঠেকাতে যুদ্ধংদেহী সরকার : আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, ‘বাঁচা-মরার লড়াই’

0
70
Print Friendly, PDF & Email

আগামী রোববারের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের অভিযাত্রার বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। ওই কর্মসূচি ঠেকানোকে ‘বাঁচা-মরার লড়াই’ বলে মন্তব্য করে তারা বলেছেন, ঢাকায় জমায়েত ঠেকাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লাঠিহাতে পাড়া-মহল্লায় পাহারা দেবেন।

তবে সরকারের এই যুদ্ধংদেহী ঘোষণা সত্ত্বেও সাড়া জাগানো এ কর্মসূচি সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ১৮ দলের শরিক ও সমমনা রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনগুলো।

‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ নস্যাত্ করতে ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী গণগ্রেফতার শুরু হয়েছে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, গ্রেফতার অভিযানের গতি ততই বাড়ছে। গতকাল দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউদ্দিন খোকনকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

গণতন্ত্রের অভিযাত্রা ঠেকাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সমাবেশ বানচালের কৌশল হিসেবে সব ধরনের বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেয়ার নির্দেশও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি দেয়নি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। কর্মসূচি ঠেকাতে শনিবার ও রোববার পরিবহন ধর্মঘট ডেকেছে আওয়ামী লীগ সমর্থক শ্রমিক লীগ।

এদিকে গতকাল মখা আলমগীরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল সমাবেশ ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আবেদন করে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাতে সায় দেননি।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়ে ২৯ ডিসেম্বর সারাদেশ থেকে লাল সবুজের পতাকা হাতে জনগণকে ঢাকায় সমবেত হওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেন খালেদা জিয়া।

এরপর দেশজুড়ে ওই কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলায় তা ঠেকাতে দমনাভিযান শুরু করে সরকার। এর অংশ হিসেবে রাজধানীতে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী। পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর সদস্যরা বুধবার রাত থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন অংশে এ অভিযান শুরু করে। দেশের বিভিন্ন অংশে আগেই এ অভিযান শুরু হয়েছে। মূলত ১৮ দলের নেতাকর্মীদের টার্গেট করেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সরকার ধারণা করছে, গ্রেফতার অভিযান শুরু করলেই মাঠ গরম করার মতো লোক থাকবে না। আন্দোলন দমনের কৌশল হিসেবে রাজধানীতে পুলিশ পুড়িয়ে হত্যার মামলায় আসামি করা হয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে। তাদের গ্রেফতার করতে হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সরকারের ধারণা, হত্যা মামলা হওয়ার পর এসব নেতা আর প্রকাশ্যে আন্দোলনে অংশ নিতে পারবেন না।

 

কর্মসূচি সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি

সরকারের বাধার কথা মাথায় রেখেই ওই কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। দলীয় সূত্র জানায়, যে কোনো মূল্যে নয়াপল্টনে জনসমাগম ঘটানো হবে। বাধা এলে ঢাকাসহ সারাদেশে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে, জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী এই কর্মসূচি সফল করতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রদর্শন করবে বলে জানা গেছে।

বিএনপি নেতারা বলেছেন, সারাদেশে আন্দোলনের যে ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে, তা রাজধানীতে এসে আছড়ে পড়বে। এর ফলে একতরফা নির্বাচন প্রতিহত ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের আন্দোলন নতুন মাত্রা পাবে।

জোট নেতারা বলেছেন, বিগত দিনগুলোর আন্দোলনে সারাদেশ থেকে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সফলতা পেতে ঢাকাকে অচল করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্যই মার্চ ফর ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই কর্মসূচি সফল করতে ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। শনিবার থেকে সরকার ঢাকায় অলিখিত কারফিউ দিতে পারে—এই আশঙ্কায় দেশের অধিকাংশ এলাকা থেকেই শুক্রবারের মধ্যে ঢাকা আসার পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা।

বিএনপি সূত্র জানায়, সরকারের কঠোর অবস্থানেও ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জমায়েত ঘটানোর বিষয়ে অনড় অবস্থানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বগুড়া জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, বৃহস্পতিবার বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ঢাকার পথে রওনা দিয়েছেন। অবশিষ্ট নেতাকর্মীরা শুক্রবারের মধ্যে নিশ্চিত ঢাকায় পৌঁছে যাবেন। বগুড়া থেকে ৫০ হাজার নেতাকর্মী ঢাকায় যাবেন।

সমাবেশে যোগ দিতে হাজার হাজার নেতাকর্মী বুধবার রাতে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেছেন বলে বলা হচ্ছে।

আমাদের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, কর্মসূচিতে যোগ দিতে কুষ্টিয়া থেকে জেলা বিএনপি ও হেফাজত নেতাকর্মীরা গতকাল সকাল থেকে ঢাকা যাওয়া শুরু করেছেন। জেলার প্রত্যেক উপজেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের জরুরি বৈঠক করেছেন।

জেলা হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল বলেন, দলের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে গতকাল সকাল থেকে নেতাকর্মীরা বাস-ট্রেনযোগে ঢাকা যাওয়া শুরু করেছেন।

কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সোহরাব উদ্দিন বলেন, কুষ্টিয়া থেকে প্রায় ১৫ হাজার নেতাকর্মী ঢাকার কর্মসূচিতে যোগ দেবেন।

এদিকে কর্মসূচির প্রতি এরই মধ্যে সংহতি জানিয়েছে ১৮ দলীয় জোটের বাইরে থাকা জাতীয় পার্টি (জাফর) ও বিকল্পধারা বাংলাদেশ। কাজী জাফর কর্মসূচি সফল করতে আগামীকাল বিকালে কর্মিসভার ডাক দিয়েছেন।

 

আওয়ামী লীগের হুমকি-ধমকি অব্যাহত

এদিকে গণতন্ত্রের অভিযাত্রার বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি অব্যাহত রেখেছে আওয়ামী লীগ নেতারা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিজয়ের মাস খালেদা জিয়ার পছন্দ হয় না। ২৯ ডিসেম্বর ওনার পরাজয়ের দিন। উনি ওইদিন আন্দোলন করবেন। কি আন্দোলন করবেন? মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করবেন? ওনাকেই এই মানুষ হত্যার দায় নিতে হবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন ২৯ ডিসেম্বর আমরাই মাঠে থাকব। এই লড়াই বাঁচা-মরার লড়াই। হয় ওরা থাকবে, নয়তো আমরা থাকব। নির্বাচনের আগে আর কোনো সমাবেশ করতে দেয়া হবে না।

গতকাল বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিএনপির মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি প্রতিহত করতে বর্ধিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।

বর্ধিত সভা থেকে ঘোষণা দেয়া হয়—শুক্রবার (আজ) মোহাম্মদপুর (আদাবর), আগারগাঁও এবং মিরপুরে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার নেতৃত্বে লাঠি মিছিল বের হবে।

১৮ দলের ঢাকামুখী ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ নামে অভিযাত্রা ঠেকাতে আগামী ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর সারাদেশে হরতাল ডেকেছে মোটর শ্রমিক লীগ নামে সরকার সমর্থিত একটি সংগঠন।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত লাঠি হাতে পতাকা মিছিলের কথা বলে মূলত এই পতাকার অবমাননা করতে চায়। ‘স্বাধীনতাবিরোধী অশুভ শক্তির আহ্বানে’ সাড়া না দিয়ে তাদের সর্বাত্মক প্রতিরোধ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তির প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

১৮ দলীয় জোট ঘোষিত ২৯ ডিসেম্বরের পদযাত্রা কর্মসূচিকে ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা নয় বরং ধ্বংসযাত্রা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন আটকানোর যে কোনো প্রচেষ্টা আইনানুগভাবে মোকাবিলা করা হবে।’

শেয়ার করুন