বিএনপির কাছে আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট ২৯ ডিসেম্বর

0
110
Print Friendly, PDF & Email

নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে ২৯ ডিসেম্বরকে টার্নিং পয়েন্ট মনে করছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ওইদিন ঢাকা অভিমুখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসূচিকে ঘিরে আন্দোলনের নতুন কৌশল প্রণয়ন করছে দলটি। ইতিমধ্যে নতুন ধরনের এই কর্মসূচিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মাঝেও তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল। বিএনপি নেতাদের বিশ্বাস, ওইদিন নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও দাবির প্রতি একাÍতা প্রকাশ করে রাজপথে নেমে আসবেন। সূত্র জানায়, কর্মসূচির অনুমতি দেয়া বা না দেয়া এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে পরবর্তী করণীয় চূড়ান্ত করছে বিএনপির হাইকমান্ড। কর্মসূচিতে বাধা দিলে অসহযোগসহ লাগাতার গণকারফিউ কর্মসূচির ডাক দিতে পারেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন। তবে দলের আরেকটি সূত্র জানায়, সরকারের বাধা উপেক্ষা করে ওইদিন খালেদা জিয়া নিজেই রাজপথে নামতে পারেন। গুলশান বা নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে টানা অবস্থানের চিন্তাভাবনা রয়েছে তাদের। আর সরকার বাধা না দিলে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থায়ীভাবে গড়ে তোলা হতে পারে গণতন্ত্র রক্ষা মঞ্চ। নির্দলীয় সরকারের দাবি ও ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করার আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়েও একই মঞ্চ গঠন করার নির্দেশনা দেয়া হতে পারে।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের ৯৬ সালে তৈরি করা জনতার মঞ্চের আদলে এটা করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। বিশাল জমায়েত করে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা ঢাকার কোনো একটি জায়গায় অবস্থান নেবে এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে সরবে না। এতে সরকার বেকায়দায় পড়বে। দেশে বিশেষ অবস্থা সৃষ্টি হবে, যা সরকারের জন্য খুবই খারাপ হবে। এদিকে কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। কর্মসূচি সফল করতে কেন্দ্রীয় ও মহানগর বিএনপির কোনো তৎপরতা না থাকলেও ইতিমধ্যে সারা দেশ থেকে তূণমূল নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন।

বিএনপি সূত্র জানায়, ২৯ ডিসেম্বর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয়ভাবে এখনও চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়নি। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকার সমাবেশ করার অনুমতি দেবে কিনা এই নিয়ে বিএনপি নেতারা সংশয়ে রয়েছেন। কর্মসূচি ঘোষণার পর সরকারের কঠোর অবস্থানে অনেকেই মনে করছেন, রোববারে সমাবেশের অনুমতি দেবে না সরকার। তার প্রমাণ বুধবারই দেখিয়েছেন তারা। ওইদিন সন্ধ্যার পর গ্রেফতার করা হয় বিএনপির বর্তমান ও সাবেক দুই সংসদ সদস্যকে। বৃহস্পতিবার বিকালে গ্রেফতার করা হয় দলের যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন এমপিকে। বুধবার থেকেই চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সিনিয়র কাউকে ঢুকতে দেয়নি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কার্যালয়ের সামনে এমনকি খালেদা জিয়ার বাসার সামনেও মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও একই চিত্র। এই অবস্থায় গ্রেফতার এড়াতে এখনও আÍগোপনে আছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েক সদস্য। কর্মসূচির প্রস্তুতি বাদ দিয়ে নিজেদের গা বাঁচানোর চেষ্টায় মরিয়া মহানগরীর নেতারা। এদিকে বুধবার রাত থেকে রাজধানীতে শুরু হওয়া যৌথবাহিনীর অভিযানে নেতাদের মাঝে গ্রেফতার আতংক আরও বেড়ে গেছে।

এদিকে সরকারের অনুমতি না পাওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবেও কর্মসূচি সফল করতে প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। বিগত সময়ে ঢাকায় মহাসমাবেশ সফল করতে বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করে দেয়া হতো। কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ওইসব কমিটি সমাবেশ সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। অনেক সময় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে বিতরণ করা হয় লিফলেটও। কিন্ত এবারের চিত্র পুরো ভিন্ন। আর মাত্র দুদিন বাকি থাকলেও প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় কোনো প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না।

সূত্র জানায়, সরকারের এমন কঠোর মনোভাবের পরও কর্মসূচি সফল করতে নানা প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। এক্ষেত্রে কিছুটা কৌশলী ভূমিকা পালন করছেন দলটির হাইকমান্ড। প্রকাশ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রস্তুতি না চালিয়ে ফোনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা সমাবেশ সফল করতে গোপনে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা ফোনে জেলা নেতাদের নানা দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। আর পুরো বিষয়টি মনিটর করছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তিনি নিজেও যোগাযোগ করছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের ওপর দলের চেয়ারপারসনের আস্থা রয়েছে। তার ডাকে শত বাধা পেরিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসবেন এমন বিশ্বাসও রয়েছে দলটির।

কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকাশ্যে কোনো প্রস্তুতি না থাকলেও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে শুরু হয়েছে নানা প্রস্তুতি। তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, রোববারের সমাবেশ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছেন। নেতাকর্মীদের ঢাকায় আসা, থাকা-খাওয়া এবং সমাবেশের দিন কোথায় অবস্থান করবেন এই পুরো বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব পালন করছেন স্ব স্ব জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কর্মসূচি সফল করতে বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় নেতারা দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা শুরু করেছেন। ঢাকা আসা এবং কর্মসূচি সফল করা নিয়ে নানা কৌশল নেয়া হচ্ছে। কিভাবে গ্রেফতার এড়িয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের থাকা-খাওয়াসহ কোনো বিষয়ে দেখভাল করার জন্য কেন্দ্রীয় বা মহানগরীর কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।

তবে বড় জমায়েতের মূল টার্গেট ঢাকার আশপাশের অন্তত ৯টি জেলা। ওই জেলাগুলো থেকে অন্তত ৫ লাখ লোক ঢাকায় আনতে চায় তারা। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোকে সে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঢাকামুখী নেতাকর্মীদের সমবেত হতে বাধা দেয়া হলে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে নেতাকর্মীরা।

এদিকে মার্চ ফর ডেমোক্রেসি সফলে মরিয়া জামায়াতসহ জোটের অন্য শরিকরাও। ১৮ দলের পাশাপাশি বিএনপি সমর্থক বিভিন্ন পেশাজীবীদেরও ব্যাপক অংশগ্রহণে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়াও হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ঢাকায় সমবেত করতে গোপনে কাজ করা হচ্ছে। সারা দেশ থেকে হেফাজত কর্মীরাও যোগ দিতে ঢাকার পথে রওয়ানা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি যুগান্তরকে বলেন, রোববারের কর্মসূচি সফল করতে ইতিমধ্যেই খুলনা মহানগরী ও জেলার নেতাকর্মীরা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছেন। বাসে-লঞ্চে যে যেভাবে পারেন তারা ঢাকায় যাচ্ছেন।

রোববারের কর্মসূচি ও পরবর্তী আন্দোলন সম্পর্কে কেন্দ্রের কোনো নির্দেশনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলের চেয়ারপারসন ঢাকা যাওয়ার ডাক দিয়েছেন এরপর কেন্দ্র থেকে কারও নির্দেশনার প্রয়োজন পড়ে না। নেত্রীর ডাকে নেতাকর্মীরা ঢাকায় যাচ্ছেন। তবে ২৯ ডিসেম্বরের পরে কি হবে বা কোন ধরনের কর্মসূচি রয়েছে এই ব্যাপারেও কেন্দ্র থেকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

জানতে চাইলে বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম (ভিপি সাইফুল) যুগান্তরকে বলেন, ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো বগুড়া জেলায় নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। নেত্রীর নির্দেশে ঢাকায় যেতে তারা প্রস্তুত। বগুড়া জেলা থেকে সর্বাধিকসংখ্যক নেতাকর্মী ঢাকায় যাবে বলে আশা করেন তিনি।

শেয়ার করুন