জাতিসংঘের সবুজ সংকেত পেয়েছে সরকার!

0
91
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে চুপ হয়ে আছে জাতিসংঘ। সংস্থার মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ঢাকা মিশনের পক্ষকাল অতিবাহিত হলেও এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক না পাঠানোর ঘোষণা দিলেও অভিভাবক সংস্থাটি এখন পর্যন্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারিগরি সহযোগিতা দেয়ার বিষয়টি পাইপলাইনে রেখেছে। এছাড়া সঙ্গত কিছু কারণে জাতিসংঘের পাশাপাশি গত কয়েকদিনে ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপও হ্রাস পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারানকো ফিরে যাওয়ার পর জাতিসংঘের ঢাকাস্থ মিশন প্রধান নেইল ওয়াকারও গত কয়েকদিন দু’দলকে সমঝোতায় আনার ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেননি। পক্ষান্তরে শান্তি মিশনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে এক ব্যাটালিয়ন সেনা চেয়েছেন বান কি মুন। আর কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড মওকুফের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি বলে জানিয়েছেন তিনি। এ বাস্তবতায় নির্বাচনসহ সবকিছুকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সরকার। ফলে কূটনৈতিক মহল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এরই মধ্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সবুজ সংকেত (গ্রিন সিগন্যাল) পেয়েছে সরকার! তবে ঢাকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা বিষয়টি নিয়ে এখনই মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, চলতি বছরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দেশের প্রধান দুই জোট পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেয়। আগস্টের পর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে বিরোধী জোট রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে গেল কয়েক মাস ধরে ঢাকার কূটনীতিকরা দৌড়ঝাঁপ করলেও নভেম্বরের শুরু থেকে তারা রাজনৈতিক বিষয়টি পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে দেয়।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক সংকট সমাধান বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সশরীরে ঢাকা না এলেও অনেক আগে থেকেই সরব ছিলেন। গত মে মাসে সংস্থার সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর দ্বিতীয় দফা সফর শেষে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে চিঠি দেন বান কি মুন। চিঠিতে তিনি সহনীয় পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার কথা বলেন। এরপর গত ২৩ আগস্ট দুই নেত্রীকে টেলিফোনে আবারো সংলাপের আহ্বান জানান বান কি মুন।

গত ২৬ অক্টোবর দুই নেত্রীর মধ্যে টেলি সংলাপের পর তাকে সংলাপের সূচনা উল্লেখ করে বান কি মুন আবারো দুই নেত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা পাঠান।

গত ২৯ নভেম্বর তিনি আবারো চিঠি লেখেন প্রধান দুই নেত্রীকে। চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের তাগিদ দেন।

কূটনীতিকদের মতে, দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি এবং সামাজিক কার্জক্রমে বিঘœ ঘটলে সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার আহ্বানের পাশাপাশি ছিল ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা। ফলে জাতিসংঘ সমঝোতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়।

ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সংকট সমাধানের তাগিদ অব্যাহত রাখেন। তবে আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে এবং বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি থেকে সরে না আসায় কূটনীতিকদের কোনো আহ্বানই কাজে আসেনি।

সূত্র মতে, সংকট সমাধানে ঢাকাস্থ কূটনীতিকরা যখন একে একে ব্যর্থ হচ্ছেন ঠিক তখনই জাতিসংঘ উদ্যোগ নেয় নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক সংকট সমাধানের। শুরু হয় জাতিসংঘ মিশন। এরই অংশ হিসেবে গত বছর ১০ ডিসেম্বর প্রথম দফায় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত এবং সংস্থার রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকায় আসেন। ৩ দিনের সফরে তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানান এবং মন্তব্য করেন সংলাপের সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বেশকিছু বিষয় সর্বমহলে দৃশ্যমান হয়েছে। তারানকো ঢাকা ছাড়ার দিন বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেন। এতদিন পালাক্রমে দুই নেত্রীকে জাতিসংঘ মহাসচিব ফোন করলেও ১২ ডিসেম্বরের ফোনটি তিনি শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীকেই করেছেন। এ ফোনে কি কথা হয়েছে জানা না গেলে অনেকের মধ্যে কৌতূহল ছিল। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন বান কি মুন।

এ বিষয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আবুল মোমেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারানকোর বাংলাদেশ সফরের পুরো বিষয়টি তিনি জানেন।’

মোমেন জানান, আলাপচারিতায় বান কি মুন বলেন, বাংলাদেশে সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে জাতিসংঘের কিছু বলার থাকবে না। এটাই জাতিসংঘের প্রত্যাশিত বিষয়।

বাংলাদেশের এ স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ ও সংলাপের সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টিই ছিল তার লক্ষ্য। কারো মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার কোনো সুপারিশ করেননি তিনি।

বাংলাদেশ সফর নিয়ে তারানকো যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তাতে দুই নেত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয় উল্লেখ করেছেন বলে জানান মোমেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের সূচনাকে একটি বড় ধরনের অর্জন বলে মনে করছেন বান কি মুন। তারানকো তার প্রতিবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার অবস্থানকে তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানই আগামী দিনের সংকট সমাধানের পথ বলে তারানকো প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছেন। তবে প্রতিবেদনটি গতকাল পর্যন্ত মহাসচিবের দফতর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।

সূত্র বলছে, এম এ মোমেনের দেয়া বক্তব্যই প্রমাণ করে জাতিসংঘের কাছ থেকে সরকার একটি সবুজ সংকেত পেয়েছে, যার কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে নির্বিঘেœ এগিয়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার এক কূটনীতিক বলেন, এত দূরে যাওয়ার দরকার নেই, মঙ্গলবার যখন বান কি মুন ফোন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে শান্তি মিশনের জন্য এক ব্যাটালিয়ন সেনা চেয়েছেন তখনই মনে হয় সরকারের প্রতি জাতিসংঘ এখনো আস্থাশীল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপও কমে গেছে। কূটনীতিকদের একটি বড় অংশ বড়দিনের ছুটিতে দেশের বাইরে রয়েছেন। ফলে ঢাকায় যারা আছেন তারাও তেমন একটা দৌড়ঝাঁপ করছেন না।

কারণ হিসেবে ইউরোপীয় জোটভুক্ত ঢাকার এক দূতাবাসের কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনের বাকি আর বেশিদিন নেই, এর মধ্যে দুই দলের সমঝোতার কোনো লক্ষণও নেই, ফলে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো লাভ নেই। এছাড়া মনে করা হয়েছিল এরই মধ্যে জাতিসংঘ পুরো বিষয় নিয়ে অবস্থান জানাবে কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা হয়নি। ফলে সরকারতো নিজের মতো করে এগোবেই, কারণ হয়তো তারা কোনো ধরনের সবুজ সংকেত পেয়েছেন।

শেয়ার করুন