আরেক দফা ডিগবাজির ক্ষেত্র তৈরিতে ব্যস্ত এরশাদ : বিএনপির সঙ্গে জোট করতে প্রার্থী তালিকা হস্তান্তর

0
56
Print Friendly, PDF & Email

উপর্যুপরি ডিগবাজির পর এখন আরেক দফা ডিগবাজির প্রাথমিক ক্ষেত্র তৈরিতে ব্যস্ত বিশ্ববেহায়া এইচ এম এরশাদ। এবার তিনি নির্বাচন বর্জনের চিন্তাভাবনা করছেন এবং এ বিষয়ে তিনি ইঙ্গিতও দিয়েছেন। অন্যদিকে তিনি বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনের লক্ষ্যে দীর্ঘ এক বছর ধরে আসন
ভাগাভাগির সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার পর অতিসম্প্রতি নির্বাচিত প্রার্থীর তালিকা দু-দুবার পাঠিয়েছেন। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৮ দলীয় জোটের দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছেন, আমি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় ভেবেছিলাম অন্যরাও নির্বাচনে অংশ নেবে। সব দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, কিন্তু তা হয়নি। উল্টো দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন লাশ পড়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন করা সম্ভব কিনা এ নিয়ে আমার দলের প্রার্থীর মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আমি নিজেও মনে করি বর্তমান পরিবেশে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এ অবস্থা বহাল থাকলে আমরা নির্বাচনে যাব না।
গতকাল বারিধারার একটি হোটেলে সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এসব কথা বলেন। ‘তাহলে জাতীয় পার্টি কি আগামী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এরশাদ বলেন, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনের এখনও এক মাস পাঁচ দিন বাকি। তবে নির্বাচন কমিশন অবাস্তব তফসিল ঘোষণা করেছে। মনোনয়ন দাখিলের জন্য মাত্র ৬ দিন সময় দিয়েছে। আগামী ২ ডিসেম্বর মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন। আমার দলের অনেক প্রার্থী এখন ঢাকার বাইরে। অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে তারা ঢাকায় ফিরতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। ঢাকায় ফিরলেও মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারবেন কিনা এ বিষয়টিও অনিশ্চিত। অন্যদিকে এখনও নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত হয়নি। এসব কিছু মিলিয়ে এখন আমাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঠিক হবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে জাতীয় পার্টি থেকে গতকাল এরশাদ এবং কাজী জাফর পরস্পরকে বাহিষ্কার করেছেন।
মতবিনিময়ের সময় এরশাদ জানান, দলের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমেদকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এইচ এম এরশাদ বলেন, কিছুক্ষণ আগে কাজী জাফর আহমেদকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন তিনি আর জাতীয় পার্টির সঙ্গে নেই। তিনি বলেন, কাজী জাফর আহমেদ গুরুতর অসুস্থ হয়েছিলেন। তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। আমি প্রায় ৩০ লাখ টাকা জোগাড় করে তাকে থাইল্যান্ডে চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছিলাম। সুস্থ হয়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, আপনি আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। যতদিন বেঁচে থাকি আপনার সঙ্গেই থাকব। কিন্তু এখন তিনি প্রতিদিন আমার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিচ্ছেন। এ অবস্থায় তাকে আর দলে রাখা যায় না। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
অন্যদিকে কাজী জাফর আহমেদ গতকাল দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এরশাদকে দল থেকে বহিষ্কার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি এরশাদকে সব দলীয় কাজকর্ম থেকে বিরত থাকার আবেদন জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন।
চিঠিতে কাজী জাফর আহমেদ বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সাথে আপনাকে অবহিত করা যাচ্ছে যে, আপনি জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা ২০(১)(ক) সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘনের কারণে পার্টির ঐক্য, সংহতি ও মর্যাদা বিনষ্ট করেছেন। গঠনতন্ত্রের ধারা ২০(৩) বিধানকে সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে পার্টির প্রধান নীতিনির্ধারণী সংস্থা হিসাবে পার্টির নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন এবং পার্টির সকল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে প্রেসিডিয়ামের ক্ষমতাকে লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে অবৈধভাবে তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারে যোগদান করেছেন। এতে আপনি নিজে স্বৈরাচারী সরকারের সহযোগী হিসাবে দলের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
তিনি বলেন, গঠনতন্ত্রের ২০(১)(ক) ধারায় অবশ্য প্রতিপালনীয় শর্ত হিসাবে পার্টির চেয়ারম্যান পার্টির ঐক্য, সংহতি ও মর্যাদার প্রতীক হিসাবে কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও আপনার বহুমুখী স্ববিরোধী কার্যাবলি এবং লজ্জাজনক আচরণ দলের ঐক্য ও সংহতিকে বিনষ্ট করেছে। দেশের সর্বত্র আপনার বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল, জুতা নিক্ষেপসহ থুতু নিক্ষেপের ঘটনায় প্রবল জনরোষ দলের মর্যাদাকে বিনষ্ট করেছে। যা সর্বজনস্বীকৃত বিষয় বিধায় আপনি বর্ণিত ধারা মোতাবেক দলের বিরুদ্ধে এবং লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেকে জনধিকৃত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
কাজী জাফর আহমেদ বলেন, ভাবতে অবাক লাগে যে, একদিকে আপনি আপনার বারবার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে একতরফা নির্বাচনে যাওয়ার তোড়জোর শুরু করে দিয়েছেন। অন্যদিকে আপনার কথিত অসাংবিধানিক সরকারে ৭ জন মন্ত্রীকে আসনস্থ করেছেন। যা পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা ৮(৪) অনুযায়ী অবৈধ এবং আপনার কারণে উক্ত ৭ জন সংসদ সদস্যের গঠনতন্ত্রের বর্ণিত ধারা অনুযায়ী দলের প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল হয়ে গেছে। অন্যদিকে একই সময় আপনি বিএনপির সাথে দীর্ঘ এক বছর ধরে আসন ভাগাভাগির সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার পর অতিসম্প্রতি বিএনপির কাছে আপনার স্বনির্বাচিত প্রার্থীর তালিকা দু-দুবার পাঠিয়েছেন। রাজনৈতিতে এ ধরনের লজ্জাজনক ঘটনার কোনো নজির আছে বলে আমার জানা নেই।
তিনি বলেন, আপনি দীর্ঘদিন ধরে দলের নীতি ও শৃঙ্খলাবোধ লঙ্ঘন করে তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়ে দলকে স্বেচ্ছাচারী সংগঠনে পরিণত করেছেন। গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারাকে ক্রমাগত লঙ্ঘন করে আপনি বিভিন্ন সময়ে একাধিক সিনিয়র নেতার ক্রমাগত বহিস্কার করেছেন। তাছাড়া কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে গঠনতন্ত্রকে এরশাদতন্ত্রে পরিণত করেছেন। আপনি এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেগম রওশন এরশাদকে চার-চারবার বহিষ্কার করেছেন। আমাকে অগঠনতান্ত্রিকভাবে তিনবার বহিষ্কার করেছেন। অতি সম্প্রতি যুগ্ম মহাসচিব ইকবাল হোসেন রাজু এবং আরিফ খানকে বহিষ্কার করেছেন। আপনার এহেন খামখেয়ালিপনা শুধু অগণতান্ত্রিক নয়, বরং চরমভাবে স্বেচ্ছাচারিতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ বটে। কেননা গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারায় পার্টির চেয়ারম্যান তার বিশেষ ক্ষমতায় যে কোনো ব্যক্তিকে অপসারণের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানকে অবশ্যই প্রেসিডিয়ামের সঙ্গে আলোচনার শর্ত পূরণ করতে হবে। কিন্তু আলোচ্য ঘটনাগুলো দ্বারা আপনি প্রেসিডিয়ামকে হেয় ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এক ব্যক্তির দলে পরিণত করে জাতীয় পার্টিকে জনবিচ্ছিন্ন করে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসকদের তল্পিবাহক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই কথা অনস্বীকার্য যে বারবার আপনার রাজনৈতিক ডিগবাজি, আদর্শহীনতা এবং সমস্ত দলকে আপনার আজ্ঞাবহে পরিণত করে ক্ষমতা ত্যাগের ২৩ বছরের মধ্যে আমাদের প্রাণপ্রিয় দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেনি।
তিনি বলেন, ওপরে উল্লিখিত অবস্থাধীনে আপনাকে গঠনতন্ত্রের ৩৭ ধারা মোতাবেক দলের চেয়ারম্যান পদ হতে অপসারণটি অবিলম্বে জাতীয় কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশনে গৃহীত হবে। গঠনতন্ত্রের ৩৭(৪) ধারা মোতাবেক আপনাকে অপসারণপূর্বক ৩৭(৫) ধারায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে জাতীয় পার্টির সুমহান মর্যাদা, ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রষ্ঠিত করা হবে। আপনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান পদে থাকার সকল প্রকার অধিকার হারিয়েছেন। আপনাকে দলের সকল পর্যায়ে কোনো প্রকার অংশগ্রহণ করা হইতে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

শেয়ার করুন