বিফল অন্তরালের সংলাপ : বিএনপি ছাড় দিলেও অনড় সরকার

0
50
Print Friendly, PDF & Email

সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে বিফলে যাচ্ছে অন্তরালের সংলাপ। সমঝোতার আশায় বিএনপি ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করলেও আওয়ামী লীগে সাড়া নেই। এ পরিস্থিতিতে টানা অবরোধ-হরতালের চিন্তা-ভাবনা করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট।
সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আশায় অন্তরালের সংলাপে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে কিছুটা ছাড় দিতে সম্মত হয়েছিল বিরোধী জোট। জোটের মুখপাত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লিখিতভাবে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে জানিয়েছেন। শুধু শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দুই জোটের নির্বাচিত এমপিদের মধ্য থেকে মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব দেয় বিরোধী জোট। এ প্রস্তাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দুই মহাসচিবের মধ্যে সমঝোতা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত দু’দিনে সরকারপক্ষ কোনো সাড়া দেয়নি। এমনকি দুই পক্ষের ছাড়ের বিষয় নিয়ে গত সোমবার সন্ধ্যায় আরো একদফা আলোচনা হয়। ওইদিন মির্জা ফখরুল ও সৈয়দ আশরাফের মধ্যে এ ধরনের বৈঠকের কথা শোনা গেলেও মূলত তাদের মধ্যে ফোনে কথা হয়। কথোপকথনে দুই দিন সময় চায় সরকারপক্ষ। এ সময়ে নির্বাচনী শিডিউল ঘোষণা না করার আহ্বান জানালে নির্বাচন কমিশনের ‘স্বাধীনতা’র অজুহাতে সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায় সরকারপক্ষ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতেই অবরোধ কর্মসূচির পথ বেছে নেয় বিরোধী জোট।
সূত্র জানিয়েছে, সোমবারের ওই কথোপকথনের পর বিএনপি চেয়ারপারসন ও ১৮ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে সার্বিক পরিস্থিতি বর্ণনা করেন মির্জা ফখরুল। সরকারকে আরেক দফা সময় দিয়ে খালেদা জিয়া দু’দিনের অবরোধ কর্মসূচি নির্দিষ্ট করেন। সোমবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে টানা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অবরোধ ঘোষণার সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী শিডিউল স্থগিতের দাবি জানান।
সারাদেশে কড়া অবরোধ পালন হলেও দু’দিনেও সরকারের টনক নড়েনি। এ পরিস্থিতিতে বিরোধী জোটের টানা অবরোধ আরও ১২ ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে।
সূত্র জানায়, এ সময়ের মধ্যে সরকার সমঝোতায় এগিয়ে না এলে শুক্র ও শনিবারসহ আগামী সপ্তাহে টানা হরতাল-অবরোধ চালিয়ে যেতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ফোনে অনুরোধ করছেন বিএনপির সিনিয়র নেতাদের। বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে। শুধু শুক্রবার বিরতি দিয়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিচ্ছেন অনেক নেতা। আর এ কারণেই অবরোধে সারাদেশে নিহতদের গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি শুক্রবার পালনের ঘোষণা দিয়েছে ১৮ দল। তবে জোটের শীর্ষ নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে তৃণমূলের দাবি পৌঁছানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তার নির্দেশনা পেলেই পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে। তবে দাবি না মানলে আগামী রোববার থেকে টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির পরিকল্পনা আগেই নেয়া আছে বলে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
এদিকে, অবরোধে দেশজুড়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় অবস্থানে ১৮ দলের শীর্ষ নেতারা আরও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের ভূমিকায় তারা যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘দুই দিনের অবরোধে প্রমাণ হয়েছে দেশবাসী এ অবৈধ সরকারের সঙ্গে নেই। বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।’
সারাদেশের মতোই রাজধানী ঢাকায় কার্যকর অবরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। এজন্য দলের বেশ ক’জন শীর্ষ নেতা কাজ করছেন। আগামী সপ্তাহেই সর্বশক্তি নিয়োগ করা হবে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘সর্বত্র জনতার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। এবার রাজধানী দখলে নেয়ার অপেক্ষায় জনতা।’ অন্তরালের সংলাপ ও সমঝোতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আপস করতে জানেন না। জনতার লড়াইয়ে সরকারকে আপস করতে বাধ্য করা হবে।’
সমঝোতা প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘১৮ দলীয় জোট সংলাপ ও সমঝোতায় আগ্রহী। আর এ সমঝোতার দাবি সামনে রেখেই অবরোধ কর্মসূচি চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া পাচ্ছি না।’
এদিকে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিঠি দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে গতকাল বুধবার যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তাকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। প্রকাশিত সংবাদের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা, বানোয়াট। বিএনপির বিরুদ্ধে এটা সরকারের কূটকৌশলের অংশ।
জনাব রিজভী আমার দেশ-কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে সব দলের অংশগ্রহণের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলেই কেবল দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমান অবৈধ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রশ্নই আসে না। যারা এ ধরনের কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তারা একতরফা নির্বাচনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বলে থাকে।
প্রসঙ্গত, গত ২২ অক্টোবর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে চিঠি লিখেছিলেন। ফিরতি ফোনে চিঠি প্রাপ্তির কথা জানান সৈয়দ আশরাফ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে জবাব দেয়ার কথা বলেন তিনি। কিন্তু লিখিত জবাব না দিয়ে এরই মধ্যে কয়েক দফা তাদের মধ্যে ফোনে কথোপকথন হলেও সঙ্কট সমাধানে কোনো সংলাপে বসতে পারেননি তারা। সর্বশেষ গত ২১ নভেম্বর সেনাকুঞ্জে মির্জা ফখরুলকে সামনে পেয়ে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে সংলাপে বসতে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই আহ্বানের প্রেক্ষিতে গত ২৩ নভেম্বর বনানীর একটি বাড়িতে মির্জা ফখরুল ও সৈয়দ আশরাফের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের সত্যতা নিশ্চিত না করলেও সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে অন্তরালে আলোচনা চলছে বলে এ প্রতিবেদককে জানান মির্জা ফখরুল। আর সে আলোচনার ফল হিসেবেই নির্বাচন কমিশন শিডিউল ঘোষণা পেছানোর কথা বলেছিল। পরে সমঝোতায় প্রধানমন্ত্রীর অনাগ্রহের কারণেই নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করানো হয়।

শেয়ার করুন