রাজনীতির ‘রহস্য মানব’ কাজী জাফর

0
117
Print Friendly, PDF & Email

সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদকে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা ‘রহস্য মানব’ বলে থাকেন। তাদের যুক্তি, তিনি কখন কী করেন তা বোঝা বড় দায়। পার্টির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাঁধে চেপে কুমিল্লা-১১ আসনে জয়ের অভিসন্ধি নিয়ে মাঠে নেমেছেন প্রবীণ এই নেতা।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ২০০১ সালে (বিএনপি নেতৃত্বাধীন) চারদলীয় ঐক্যজোটের গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা, আবার ঐক্যজোট থেকে বেরিয়ে (আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন) মহাজোটে গিয়ে ২০০৮ সালে নির্বাচন করা; এখন আবার মহাজোটকে লাথি মেরে বিএনপির সঙ্গে ভিড়ে যাওয়াসহ নানান রাজনৈতিক ভাঙা-গড়ার কারিগর এই জাতীয় নেতা।

এর আগে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তার নিজের দল ইউনাইটেড পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি নিজ দল ভেঙে পাঁচটি দল নিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিয়ে গঠন করেন জাতীয় পার্টি। এক পর্যায়ে তার আয়ত্বে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পদটিও।

জানা গেছে, চারদলীয় জোটে উদ্যোক্তা এরশাদ ছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় ছিলেন কাজী জাফর আহমদ। তখন তার লক্ষ ছিল কুমিল্লা-১১ আসনটি নিজের দখলে নেয়া। কিন্তু সব কৌশল ভেস্তে যায় এরশাদ চারদলীয় জোট ত্যাগ করায়। এরপরেও পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের সিদ্ধান্তে মহাজোটে যোগ দেয় জাতীয় পার্টি। তখন থেকেই কাজী জাফর এরশাদবিরোধী হয়ে উঠেন।

চলতি বছরের শুরু থেকে এরশাদকে বুঝাতে থাকেন, মহাজোট ছেড়ে দিয়ে ১৮ দলে যোগ দেয়ার জন্য। এরশাদ মোটামুটি রাজিও ছিলেন। কিন্তু ‘সরকারের চাপে’ এরশাদ সবাইকে নিয়ে সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেন। সবই ঠিক ছিল, শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধী ও বিএনপিপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি কাজী জাফরের। আবার সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে এরশাদের সমালোচনা করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন কাজী জাফর আহমদ।

একটি সূত্র জানায়, ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় কুমিল্লা-১১ আসন নিয়ে স্বপ্ন দেখেন তিনি। বিএনপির সঙ্গেও নাকি এ বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তাই তিনি নতুন উদ্যমে রাজনীতির কৌশল আঁটছেন।

প্রসঙ্গত, ৮৫ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়ার আগে সাত দলভুক্ত ইউপিপি দলের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় কাজী জাফর এক জনসভায় বলেছিলেন, স্বৈরাচারী এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবো না। টেনেহিঁচড়ে তাকে ক্ষমতা দিয়ে নামানো হবে বলেও হুমকি দিয়েছিলেন।

জাতীয় পার্টিতে কাজী জাফর যোগ দেয়ার একদিন আগে সুনামগঞ্জ বিএনপির নেতা ক্যাপ্টেন অব. আ. হালিম চৌধুরী এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। তখন ‘এরশাদের গোয়ালে আর একটি রাম ছাগল যোগ দিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন এই রহস্য মানব। ওই বক্তব্যের পরদিনই দুপুরের মধ্যে সেই গোয়ালেই যোগ দিয়ে বিতর্কিত হন কাজী জাফর আহমেদ।

সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকা কাজী জাফর আহমেদকে মাঝে মাঝেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। জাপার চেয়ারম্যান এরশাদ তার চিকিৎসার খরচ চালানোসহ সব ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র ১৮ দলের নেতারা তাকে দেখতে যাননি। তবে এবারের বিশেষ রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রক্রিয়ায় হাসপাতালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা তার সঙ্গে দেখা করেছেন।

জানা গেছে, কাজী জাফরের এরশাদবিরোধী বক্তব্যের পর থেকে মোট ১৮ বার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। ফলে রাজনৈতিক মহলে চলছে জল্পনা কল্পনা। অনেকেই ধারণা করছেন, তার নেতৃত্বে আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়তে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি। আর সেই জাতীয় পার্টি যে ১৮ দলকেই সমর্থন দেবে তাও একপ্রকার নিশ্চিত। তবে এবারের প্রক্রিয়ায় তার নিজ নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লা-১১ আসনে কী হবে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছুদিন।

পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাজী জাফরকে নিয়ে একেক সময় একেক কথা বলেন। প্রথমে বললেন, কাজী জাফরের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি নেয়া হবে না। তিনি আমার সঙ্গেই থাকবেন। আবার মঙ্গলবার বনানী চেয়ারম্যান কার্যালয়ে বলেছেন, জাফর দলে না থাকলে আর কিছু করার নেই। জাতীয় পার্টিতে জাফর কোনো ফ্যাক্টর না।

প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, “আমি (স্যার) এরশাদকে বলছি, তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন।”

কী কারণে বহিষ্কার করার জন্য চাপ দিয়েছেন জিজ্ঞাসা করলে দেলোয়ার বলেন, “কাজী জাফর জাতীয় পার্টি করেন না। তিনি বিএনপি করেন। স্যার আমার কথা শুনলে আজ এ ঘটনায় ঘটতো না।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, “আসলে কাজী জাফর হচ্ছেন এক বিচিত্র রহস্য মানব। তিনি সব সময় বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাকে অনেক আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা উচিত ছিল।”

শেয়ার করুন