নির্বাচন থেকে পালানোর পথ খুঁজছেন এরশাদ

0
86
Print Friendly, PDF & Email

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ নির্বাচন থেকে পালানোর পথ খুঁজছেন। সারাদেশের সাধারণ মানুষের মনোভাব এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মানসিকতা বুঝতে পেরে তার মধ্যে এ বোধদয় হয় বলে জানা গেছে। দলের মাঠ পর্যায়ের হাজার হাজার নেতাকর্মী পাতানো নির্বাচনে অংশ নিতে নারাজ। যারা এখনো বনানীর অফিসে এরশাদের পেছনে নির্বাচনী শ্লোগান দিচ্ছেন তাদের অধিকাংশেরই গণসম্পৃক্ততা নেই এবং নিজ এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক নেই। কাজী জাফর আহমদ তার অবস্থানে অটল রয়েছেন। মাওলানা মুজিবুর রহমান যুক্তিবাদী গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে এরশাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও গতকাল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয়নি এবং দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই বলে মন্তব্য করেছেন। জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল এক নেতা ইনকিলাবকে বলেন, স্যার (এরশাদ) নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যদি নিরপেক্ষ নির্বাচন না হয় এবং আওয়ামী লীগ কারচুপির চেষ্টা করে তাহলে সবাই মিলে নির্বাচন বর্জন করবো। এ বক্তব্যের মধ্যেই এরশাদের নির্বাচন বর্জনের পথ খোলা রেখেছেন।
এইচ এম এরশাদ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন- তফসিলে মনোনয়নপত্র পেশের যে শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে তা অবাস্তব। এই তারিখ পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। তফসিল ঘোষণার দিন থেকে মনোনয়নপত্র পেশের শেষ তারিখের মধ্যে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় থাকা উচিত। এখানে মাত্র এক সপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সব দলের পক্ষে প্রার্থীদের কাছ থেকে মনোনয়নের আবেদন গ্রহণ, তাদের সাক্ষাৎকার নেয়া কিংবা মনোনীত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করার পর ২ ডিসেম্বরের মধ্যে মনোনয়ন দাখিল করা অসম্ভব ব্যাপার। সেখানে ২ ডিসেম্বরের মধ্যে মনোনয়ন দাখিল শেষ করা যাবে কীভাবে? গতকাল তিনি বলেন, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয়নি। ডিসি-এসপি-জজ-ডাক্তার সবাই দুই দিকে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কখনোই ছিল না। আমার তো কোনো লোক নেই। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না।
জানা গেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে জাতীয় পার্টির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনো বিভ্রান্তি রয়েছে। বিরোধীদলের জ্বালাও পোড়াও কর্মসূচির মধ্যে যারা প্রার্থী হবেন তারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। প্রচারণায় অংশ নিলে গণরোষে পড়তে হবে এটা এরশাদকে জানানো হয়েছে। একজন নেতা জানান, এরশাদের পেছনে যারা শ্লোগান দিচ্ছেন এদের শতকরা ৯০ জনের সঙ্গে জনগণ দূরের কথা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গেও সম্পর্ক নেই। কয়েকজন নেতা দলীয় কর্মীদের রোষানলে পড়ার ভয়ে নিজ এলাকায় যান না। আবার অনেকেই রয়েছেন তারা নমিনেশন পেলে এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করবেন। এইচ এম এরশাদ বিক্ষুব্ধ কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে দেখা করার পরও গতকাল তিনি (কাজী জাফর) বলেছেন, দেশের জনগণ চায় সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন। এ অবস্থায় দলের নেতাকর্মীরা পাতানো নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এরশাদকে বেছে নেবেন না অন্য কিছু করবেন সে সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন।
জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন নেতা জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জনগণের বিপক্ষ্যে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে নারাজ। কারণ তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানিয়ে দিয়েছেন ৫ বছর আওয়ামী লীগ যুবলীগ, ছাত্রলীগ শুধু জনগণের জন জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছেন। মহাজোটের শরিক হওয়ার পরও জাতীয় পার্টির নেতাদের কোনো সুযোগ দূরের কথা সম্মান দেখানো হয়নি। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা পিঠ এগিয়ে দিতে পারে না। দল করেন তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও নমিনেশনপত্র গ্রহণ করেছেন এমন এক নেতা বলেন, ৫ বছর চেষ্টা করে এরশাদ সাহেব রুহুল আমিন হাওলাদারকে মন্ত্রী করতে পারেননি। শেখ হাসিনা নাকি রুহুল আমিন হাওলাদারকে ঘৃণা করেন, বিএনপির দালাল বলেন। এরশাদের সুপারিশে একজনকেও চাকরি নিয়ে দিতে পারেননি। এরশাদের অনেক ডিও লেটার ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। সেই আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে মন্ত্রী-উপদেষ্টা মিলে জাপা থেকে ৭ জনকে নিল এর মাজেজা এরশাদকে বুঝতে হবে। গ্যাঁড়াকলে না পড়লে শেখ হাসিনা এতোগুলো মন্ত্রী জাতীয় পার্টি থেকে নিতেন না। ওই নেতা জানান, গত কয়েকদিনে সারা দেশে এরশাদের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে। যারা মন্ত্রী হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ঝাড়– মিছিল হয়েছে। কয়েকটি জেলায় জাতীয় পার্টির অফিসে আগুন দেয়া হয়েছে। এরশাদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তার লাঙ্গলের ভোটব্যাংক খ্যাত রংপুরেও সুবিধা করতে পারবেন না। গত কয়েকদিনে এটা তিনি ভালোভাবেই বুঝে গেছেন। আর কাজী জাফর আহমদ যদি তার অবস্থান অটুট রেখে ১৮ দলীয় জোটের সঙ্গে যান তাহলে কমপক্ষে ১০ জন প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ কেন্দ্রীয় কমিটির অর্ধশত নেতা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা তার সঙ্গে চলে যাবেন। কারণ দেশের রাজনীতি পরিষ্কার হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ জোর করে নির্বাচন করার চেষ্টা করলেও কোনো স্বৈরাচার গণআন্দোলনে টিকতে পারেনি আওয়ামী লীগও পারবে না। ফলে সময়ের হেরফের হলেও সামনে বিএনপি সরকারে যাবে। এ অবস্থায় কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে গিয়ে অনেকেই এমপি হবেন এবং সরকারে যাবেন। এ সব বুঝে এরশাদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কি না তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করছেন। সূত্রের দাবি পরিস্থিতি অনুধাবন করে সামনে এরশাদ নির্বাচনে থাকবেন না নির্বাচন বর্জন করবেন সেটা বোঝা যাবে। তবে যারা এইচ এম এরশাদের সঙ্গে রাজনীতি করছেন এবং করেছেন তাদের মতে শেষ পর্যায়ে এসে হয়তো এরশাদ নির্বাচন বর্জন করবেন। কারণ জনগণের বিপক্ষে তিনি থাকবেন না। আরেক নেতার বক্তব্য জাতীয় পার্টিতে থাকা আওয়ামীপন্থীরা এরশাদকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করলেও শেষ মুহূর্তে এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন।
শুক্রবার জাপার প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার
আগামী ২৯ নভেম্বর শুক্রবার গুলশান-১-এ ইমানুয়েল কনভেনশন সেন্টারে সকাল ১০টা থেকে জাতীয় পার্টির সকল মনোনয়ন প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হবে। এই দিনেই মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়নের চিঠি প্রদান করা হবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের অবরোধ কর্মসূচির কারণে ২৭, ২৮ ও ৩০ নভেম্বর তারিখের নির্ধারিত সাক্ষাৎকার স্থগিত করে ২৯ নভেম্বর একদিনে সকল প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন