স্কাইপ পরীক্ষার ফল ভিসা প্রসেসিং সবার নাগালে

0
93
Print Friendly, PDF & Email

আনোয়ারা খাতুন। হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জের কাকাইলছেও গ্রামের এক গৃহবধূ। স্বামী থাকেন প্রবাসে। একমাত্র সন্তানের জন্মের পর টেলিফোনে খবর পেয়ে প্রবাসে থাকা স্বামীর কি উচ্ছ্বাস। সেই উচ্ছ্বাস আরও বেড়ে যায় যখন ই-মেইলে ফুটফুটে বাচ্চার ছবিটাও পেয়ে যান হাতের কাছে। প্রত্যন্ত এলাকায় বাড়ি হওয়ার পরও তাকে এই সুযোগটি এনে দিয়েছে ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র। শুধু রহিমা নয়। গ্রামের লাখ লাখ মানুষের কাজকে সহজ করে দিয়েছে এই ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র।

অনেক সন্দেহ আর অনিশ্চয়তার মাঝে যাত্রা শুরু করা ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র এখন গ্রামের মানুষের পরম নির্ভরতার স্থান। স্বাস্থ্য কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর এক সময়ের ডাকঘরটি যেভাবে গ্রামের মানুষের কাছে আপন বা প্রিয় স্থান, তারচেয়ে বেশি আপন এখন এই ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র। কারণ গ্রামাঞ্চলে জন্ম নিবন্ধন, ছবি প্রিন্ট করা, চাকরির আবেদন আর কম্পোজসহ প্রতিদিনের অতি প্রয়োজনীয় কাজ সারার আশ্রয়স্থল এই তথ্য কেন্দ্র। বর্তমান সরকারের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান ডিজিটাল বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রান্তিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর থেকে যাত্রা শুরু করে ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র। হবিগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার অনেক ইউনিয়ন পরিষদের ছিল না নিজস্ব কোনো অফিস ভবন। অনেক জায়গায় ছিল না বিদ্যুতের ব্যবস্থা। তারপরও জেলার ৭৭টি ইউনিয়নেই চালু করা হয় ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র। যাদের ভবন ছিল না তারা কোনো বাড়িতে বা গ্রামের অন্য কোথাও এবং ৭টি ইউনিয়নে সোলার প্যানেল বসিয়ে চালু করা হয় এই ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র। প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য নিয়োগ দেয়া হয় ২ জন করে উদ্যোক্তা। যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা কাজ শুরু করেন। শুরুতে কাজের তেমন গতি না থাকলেও এখন সেখানে বহুমুখী কাজ হয়। অনেক উদ্যোক্তার আয়ের পরিমাণ এখন এত বেশি যে অনেকে তা দেখে ঈর্ষাও করেন।

১১ নভেম্বর ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রের ৩ বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়। এ উপলক্ষে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আইসিটি শাখার সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা যায়, ওইদিন পর্যন্ত জেলার ৭৭টি ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের ১০২ জন উদ্যোক্তা পরিচালক ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭১৭ জন গ্রামীণ মানুষকে তথ্য সেবা দানের মাধ্যমে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার ২০৯ টাকা আয় করেছেন।

ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রের উদ্যোক্তা পরিচালকরা ইন্টারনেট সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে ই-মেইল প্রদান, পাসপোর্ট প্রেরণ, অনলাইনে ভিসা ফরম পূরণ, জন্ম নিবন্ধন, আউটসোর্সিং কাজ, ফটোকপি, লেমিনেটিং, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেন।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফরম পূরণ ও চাকরির আবেদন ফরম পূরণ ও বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল জানতে তথ্য কেন্দ্রগুলো গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে মালয়েশিয়া ও হংকংয়ে সরকার টু সরকার পদ্ধতিতে লোক পাঠানোর জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রগুলোর প্রসার বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রের উদ্যোক্তা পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় করেছেন মাধবপুর উপজেলার বাঘাসুরা ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রের উদ্যোক্তা পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, গ্রামের মানুষকে জন্মনিবন্ধন, বিদেশে পাসপোর্ট প্রেরণ, ভিসা প্রসেসিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে সেবাদানের পাশাপাশি এখান থেকে বেকার যুবকদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারছি।

জেলার একেবারেই প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত নবীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বড়বাকৈর ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রের উদ্যোক্তা পরিচালক আহমেদ রেজা জানান, তার ইউনিয়নে অনেক বেশি প্রবাসী। তারা স্কাইপের মাধ্যমে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। এছাড়াও ফরম পূরণ ও ফল জানার জন্য জনগণ তার কাছে আসেন। তিনি চেয়ারম্যান ও সচিবের সহযোগিতার কথাও স্মরণ করেন।

ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রগুলোর ভালো দিকের পাশাপাশি কিছু অনিয়মের খবরও পাওয়া যায়। কয়েকজন চেয়ারম্যান ইউনিয়নের ল্যাপটপটি নিয়ে যান নিজের বাড়িতে। অনেক সচিব ও চেয়ারম্যান উদ্যোক্তার আয়ে কৌশলে ভাগ বসান। বিশেষ করে বিদেশে লোক প্রেরণের নিবন্ধনকালে যে ৫০ টাকা করে আদায় করা হতো তার একটি অংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন। আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কাকাইলছেও ইউনিয়নের উদ্যোক্তা জজ্জিবন দাশকে চেয়ারম্যান নুরুল হক ভুইয়া কাজ থেকে বিরত রেখে সচিবকে দিয়ে ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র পরিচালনা করছেন। জজ্জিবন দাশ জানান, সচিব প্রণতিশ দাশ আমার কাছ থেকে কাজ শিখে কৌশলে ২ মাস আগে কাজে আসতে না করেন। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মনীন্দ্র কিশোর মজুমদার জানান, জনগণকে হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অংশ হিসেবে জেলার ৭৭টি ইউনিয়নে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র চালু হয়েছে। তথ্য কেন্দ্রের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন স্থানে হলেও জেলা প্রশাসনের আইসিটি শাখার সঙ্গে সব যেন বিনি সূতোর মালায় গাঁথা। সরকারি বিভিন্ন তথ্য এই মালার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই চলে যায় প্রত্যন্ত এলাকায়। আর গ্রামের স্থবির জনপদে এই তথ্য কেন্দ্র এনে দিয়েছে নতুন প্রাণের স্পন্দন।

শেয়ার করুন