নেপথ্য সংলাপ এখন ওপেন সিক্রেট

0
36
Print Friendly, PDF & Email

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যে শনিবার রাতের ‘গোপন বৈঠক’ নিয়ে এক ধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। মির্জা ফখরুল সরাসরি বৈঠকের কথা অস্বীকার করায় এবং সৈয়দ আশরাফ এ ব্যাপারে এখনও মুখ না খোলায় মূলত এই ধোঁয়াশার সৃষ্টি। অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গতকাল রবিবার আলোচিত এই বৈঠকের কথা স্বীকার করেছেন, আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ.স.ম হান্নান শাহ গতকাল দুপুরে বৈঠকের কথা স্বীকার করে বিকেলে তা প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘটনায় পুরো বিষয়টি আরো রহস্যাবৃত হয়ে উঠেছে। তবে গোপনে হওয়া এই বৈঠকের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, সরকারি ও বিরোধী দলের মুখপাত্রদ্বয়ের মধ্যে যে কথা হয়েছে-তা নানা আলামতেই স্পষ্ট। এটিকে তারা বলছেন, আনুষ্ঠানিক না হলেও নেপথ্যে এই ধরনের সাক্ষাত্ ও কথাবার্তা চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আবহ তৈরি করবে।

মির্জা ফখরুল অস্বীকার করলেও এবং সৈয়দ আশরাফ নিশ্চুপ থাকলেও বিএনপি-আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র ইত্তেফাককে নিশ্চিত করেছে, শনিবার রাতে রাজধানীর বনানীতে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের বাসায় প্রায় এক ঘণ্টা এই দুই নেতা বৈঠক করেন। বৈঠকে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়েই আলোচনা হয়। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব এবং বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থাপিত ‘নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা’র ফর্মুলা নিয়ে তারা নিজ নিজ যুক্তি-তর্ক তুলে ধরেন। বিএনপিসহ ১৮ দলের পক্ষে মির্জা ফখরুল একটি লিখিত প্রস্তাবও হস্তান্তর করেন আশরাফের কাছে।

বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশরাফ-ফখরুলের গোপন এই বৈঠকের বিষয়টি এখনই প্রকাশ করতে রাজি নয় দলটি। নেপথ্যে আলোচনার পর যখন ইতিবাচক একটি পর্যায়ে পৌঁছাবে তখনই তা প্রকাশ করার বিষয়ে দলটির নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। আর যদি গোপন বৈঠকেও মোটামুটি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে পুরো বিষয়টিকেই চেপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে দলটির। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, শনিবারের বৈঠকের বিষয়টি সরকারি মাধ্যমেই ফাঁস হয়েছে। সরকার যে সংলাপের বিষয়ে আন্তরিক এবং দুই দলের মুখপাত্র সংলাপ করেছেন- তা প্রমাণ করতেই এভাবে অঙ্কুরেই বিষয়টি প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে বলে বিএনপির সন্দেহ।

ফখরুলের ‘না’, আশরাফের ‘হ্যাঁ’

সূত্রমতে, বৈঠকে ফখরুল প্রথমে নির্দলীয় সরকারের পক্ষে অটল থাকেন। আশরাফ বারবারই বলেছেন ‘ওই ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এখন আর সম্ভব নয়’। বিএনপিকে ‘সর্বদলীয়’ সরকারে যোগদানের কথা বলেন তিনি। এসময় ফখরুল তাকে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান পদে শেখ হাসিনা থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। তবে আশরাফ বলেন, এখানে ছাড় দেয়া সম্ভব নয়, শেখ হাসিনাই সরকার প্রধান থাকবেন, আপনারা মন্ত্রিসভায় আসুন, কতজন মন্ত্রী চান, কোন্ কোন্ মন্ত্রণালয় চান তালিকা দিন, আমি এটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব। ফখরুলকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরো বলেছেন, মন্ত্রিসভায় যোগ দিলে আপনারা চাইলে প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনও পরিবর্তন করা হবে।

এসব প্রস্তাবের জবাবে আশরাফকে ফখরুল বলেছেন, আগে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানের বিষয়টি ফয়সালা করুন, বাকিগুলো কোনো সমস্যা নয়। এসময় ফখরুল এখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করার জন্যও অনুরোধ জানান। এছাড়া সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সরকার বহাল থাকার পর সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও প্রস্তাব দেন ফখরুল। সূত্র জানায়, সৈয়দ আশরাফ ও মির্জা ফখরুল দু’জনই এভাবে প্রস্তাব পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। পরে উভয়েই একমত হন যে, তারা নিজ দলীয় প্রধানের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন, এরপর আবার তারা বসবেন। এরকম সিদ্ধান্তের মধ্যদিয়েই শেষ হয় শনিবার রাতের বৈঠক।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফখরুল শনিবার রাতেই আলোচনার বিষয়ে দলীয় প্রধানকে অবহিত করতে ছুটে যান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, যেহেতু আশরাফের সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক কোনো অগ্রগতি নেই এবং এটা কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকও ছিল না, সে কারণে আপাতত বিষয়টি গোপন রাখা হবে। দলীয় চেয়ারপারসনের পরামর্শেই ফখরুল গণমাধ্যমকে বলেছেন ‘আশরাফ সাহেবের সঙ্গে আমার কোনো সংলাপ হয়নি। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

এদিকে, আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে- সৈয়দ আশরাফও ফখরুলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি গতকাল বিকেলে গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেছেন। গতকাল বিকেলে সৈয়দ আশরাফের বাসায় যোগাযোগ করা হলে তার ব্যক্তিগত একজন কর্মচারী ইত্তেফাককে জানান, বিকেল ৩টায় তিনি গণভবনে গেছেন। জানা গেছে, আশরাফের কাছ থেকে জানার পরেই গতকাল গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশে বলেছেন ‘নির্বাচনকালীন সরকারে আসুন, আপনি যে যে মন্ত্রণালয় চাইবেন সেগুলোই দেয়া হবে।’

আশরাফ উদ্দিন নিজান

যা বললেন

এদিকে, যার বাসায় বহুল আলোচিত এই গোপন বৈঠকটি হয়েছে, বিএনপির সেই সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিজান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘যারা সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা ও নির্বাচন চান না, তারাই বিষয়টি নিয়ে বেশি কথা বলছেন। আমরা সংলাপ চাই, সমঝোতা চাই, সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। সে কারণে দু’দলের মধ্যে দেখা-সাক্ষাত্ এবং কথাবার্তা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।’ আশরাফ-ফখরুলের বৈঠকের বিষয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন ‘বর-কনের বিয়ে ঠিক হওয়ার আগেও অনেকগুলো ধাপ থাকে, দেখাদেখি হয়, প্রাথমিক কথা শুরু হয়, পরস্পরের কথায় মিল হলে তারপর পর্যায়ক্রমে তা চূড়ান্ত পরিণতি পায়, কিন্তু শুধু দেখাদেখি হলেই তো সেটিকে বিয়ে বলা উচিত নয়। একইভাবে রাজনৈতিক বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও দুই প্রধান দলের মধ্যে একেবারেই প্রাথমিক বিষয়গুলো নিয়ে গণমাধ্যম যেভাবে হইচই শুরু করেছে, তা সামগ্রিক প্রক্রিয়াটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এক প্রশ্নের জবাবে আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন ‘যেহেতু ফখরুল সাহেব অস্বীকার করেছেন এবং আশরাফ সাহেব কিছু বলেননি, আমিও কিছু বলছি না, সুতরাং এর বাইরে কে কী বললো তা আমলে নেয়া উচিত নয়। কারণ তথ্যমন্ত্রী এবং বিএনপিরও যারা বৈঠকের বিষয়ে কথা বলছেন, তারা কীভাবে জানলেন বৈঠক হয়েছে কী হয়নি। আর ফলপ্রসূ হওয়া না হওয়ার বিষয় তো আরও পরের কথা।

হান্নান শাহ্’র দুপুরে স্বীকার,

বিকেলে ভিন্ন ব্যাখ্যা

প্রধান দুই দলের মুখপাত্রের গোপন বৈঠক নিয়ে প্রথমে মুখ খুলেও পরে আবার বিবৃতি দিয়ে সেটির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ.স.ম হান্নান শাহ। রবিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘গুলশানের একটি বাসায় আশরাফ-ফখরুলের বৈঠক হয়েছে বলে আমি পত্রপত্রিকায় দেখেছি। তবে ওই বৈঠকে উল্লেখ করার মতো কোনো ফলাফল হয়নি। বৈঠকে কোনো এজেন্ডাও ছিল না।’ এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে হান্নান শাহ বলেন ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মধ্যে যে কথিত আলাপ হয়েছে বলে বক্তব্য দিয়েছি তা গণমাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় হান্নান শাহ বলেন, ‘মূলত, আমি আজ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত উল্লিখিত দু’জন নেতার বৈঠকের খবরটির পরিপ্রেক্ষিতেই বক্তব্য দিয়েছি। পরে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের নিকট থেকে বৈঠকের বিষয়টি ভিত্তিহীন নিশ্চিত হয়ে তা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে জানিয়েছি, যা কিছু গণমাধ্যম প্রচার করেছে।’ বৈঠকের খবরটি ‘অসত্য এবং নিছক গুজব’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, এ বিষয়ে আর কেউ যাতে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে সেজন্য আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি।’

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের অস্বীকারের পরেও আ.স.ম হান্নান শাহ বৈঠকের বিষয় স্বীকার করে বক্তব্য দেয়ায় দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। মির্জা ফখরুল গতকাল দুপুরেই হান্নান শাহকে ফোন করে বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং বক্তব্য প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। এরপরেই বিএনপির দপ্তর থেকে ওই বিবৃতি প্রচার করা হয়।

বৈঠক হয়েছে, আরও হবে: ইনু

আওয়ামী লীগের কেউ এ বিষয়ে কথা না বললেও তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, আশরাফ-ফখরুল বৈঠক হয়েছে এবং এমন বৈঠক আরো হবে। গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের বৈঠক সুষ্ঠু রাজনৈতিক আবহ তৈরি করতে সাহায্য করবে।

ইনু আরও বলেন, সংলাপের দরজা বন্ধ হয়নি। সমঝোতার সুযোগ এখনো আছে। আমার বিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন।

শেয়ার করুন