‘ আল্লাহ না চাইলে আমাকে ঝোলাতে পারবে না’

0
71
Print Friendly, PDF & Email

“বিচারক ও তাদের চ্যালাচামুণ্ডারা নিজেরা উল্টো ঝুলে পড়লেও আমাকে ঝোলাতে পারবে না।” আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির রায়ের পর গণমাধ্যমে দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে এই উক্তি করেছেন আলবদর নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দীন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জন্য লন্ডন-প্রবাসী এই যুদ্ধাপরাধীর এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি সৈয়দ নাহাস পাশা।

হুয়াট ডু ইউ ফিলঅ্যাবাউট দ্যা ভিকটিম? দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে ’৭১-এ বুদ্ধিজীবী হ্ত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততা পুরোপুরি অস্বীকার করেন মঈনুদ্দীন।

এই অভিযোগে তাকে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল।

সাক্ষাতকারে তিনি তার কাজের, ব্যক্তিগত জীবনের এবং পূর্ব লন্ডন বসবাসকালের কথা বলেছেন।

তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা নিয়ে স্বাধীনতার পর সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রকাশিত ‘বানোয়াট গল্পকাহিনীতে’ প্রভাবিত হয়েই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বজনরা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

“আমি [২৫শে মার্চের] মিলিটারি অ্যাকশনের পরে একরকমের প্রটেস্ট হিসেবেই আমার রাজনৈতিক দায়িত্বগুলো থেকে ইস্তফা দিয়েছি।”

সাজাপ্রাপ্ত অপর যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে মুঈনুদ্দীন বলেন, “দেশের নামিদামী লোক, শ্রদ্ধাভাজন আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ`, ইসলামী নেতা এক-আধ জন আছেন যারা দীর্ঘদীন ধরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে জাল জোচ্চুরি মাধ্যমে এসব রায় হাসিল করা হয়েছে।”

ট্রাইবুনালের বিচারে তিনি সম্পর্কিত ছিলেন না দাবি করে এই আল বদর নেতা জানান, ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন না তিনি।

সাক্ষাৎকার

প্রশ্ন: আপনার ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপনার বক্তব্য …

উত্তর: দেখুন, এ প্রহসনের বিচার আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়, এটা তো অনেক আগেই ঠিক হয়ে আছে। যখন গোয়েন্দারা গতবছর তাদের রিপোর্টও প্রসিকিউশনের কাছে সাবমিট করে নাই, তখনই আপনারা দেখেছেন যে, স্কাইপ আলোচনায় বিচারক এবং তার সঙ্গী-ষড়যন্ত্রকারীরা বসে বসে আলাপ-আলোচনা করছিল যে আমাকে কী সাজা দেয়া যায়। কেইস তখন পর্যন্ত কোর্টেও আসে নাই। এই ধরনের আদালত থেকে আপনি এর বেশি আর কী আশা করতে পারেন?

মুসলমান হিসেবে আমি তো অতীতের সেইসব মৃত্যুঞ্জয়ী মহাপুরুষদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই যে, “হায়াৎ-মওত, জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত জমিনে হয় না, আসমানে হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের যদি অভিপ্রায় এটা না হয় যে এভাবে আমার মৃত্যু হবে, তবে এসব বিচারক ও তাদের চ্যালাচামুণ্ডারা নিজেরা উল্টো ঝুলে পড়লেও আমাকে ঝোলাতে পারবে না।”

প্রশ্ন: আপনার বিরদ্ধে সে সমস্ত অভিযোগ- যেমন, আপনি আলবদর বাহিনীতে ছিলেন, আপনি জামায়াতের ইসলামের ছাত্রসংঘে সংশ্লিষ্ট ছিলেন সেসময় …

উত্তর: মোটেই নয়, আমি আলবদর বা অন্য কোনো বাহিনীতে কখনো অবশ্যই ছিলাম না। তবে হ্যাঁ, ছাত্রজীবনে আমি ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্য ছিলাম। আমি মিলিটারি অ্যাকশনের পরে একরকমের প্রটেস্ট হিসেবেই আমার রাজনৈতিক দায়িত্বগুলো থেকে ইস্তফা দিয়েছি।

প্রশ্ন: মিলিটারি অ্যাকশন বলতে আপনি বাংলাদেশে…

উত্তর: ২৫ শে মার্চের ব্যাপারে…

প্রশ্ন: ২৫ শে মার্চের পর থেকে আপনি কি দায়িত্ব ছেড়ে দেন?

উত্তর: ২৫ শে মার্চের পরেই আমি সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেই।

প্রশ্ন: আপনি কেন আপনার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো আইনজীবী নিয়োগ করেননি? আপনি একে প্রহসনের বিচার বলছেন, বা আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে আপনার-আমাদের প্রত্যেকেরই মৃত্যু কীভাবে হবে সেটা আল্লাহ জানেন। আপনি কেন আইনজীবী নিয়োগ করেননি?

উত্তর: কীভাবে আইনজীবী নিয়োগ করব? প্রথমত, আইনজীবী নিয়োগ করতে হলে তো কাউকে কোর্টের পক্ষ থেকে নোটিস জারি করতে হবে। আমি এখানে কোনোদিন আমার নাম বা পরিচয় গোপন করি নাই, আপনি সেটা নিজেই জানেন, আপনি তার সাক্ষী। আমি এখানে ওপেন এবং ট্রান্সপারেন্ট লাইফ লিড করি। সবার সামনে খোলাখুলি জীবনযাপন করছি। এই আদালত কোনোদিন আমার কাছে অথবা আমার উকিলদের কাছে কোনো ধরণের নোটিস জারি করেনি, চেষ্টাও করেনি। আপনি কীভাবে আইনজীবী নিয়োগ করবেন?

প্রশ্ন: আপনি বলতে চান যে, আপনার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ হয় নাই বা বাংলাদেশ সরকারের কোনো যোগাযোগ হয় নাই?

উত্তর: একেবারেই না।

প্রশ্ন: এখানকার দূতাবাসের মাধ্যমেও কোনো যোগাযোগ হয় নাই?

উত্তর: দূতাবাসের মাধ্যমে বা সরাসরি আমার ঠিকানায় বা আমার দেশের ঠিকানায়, কোনোভাবেই যোগাযোগ করা হয়নি। তারা যদি একতরফা বিচার করতেই চায় তাহলে তারা বিচার করবে, আমি আইনজীবী কীভাবে নিয়োগ করব?

প্রশ্ন: তাহলে আপনি বলতে চান যে তারা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নাই বলেই আপনি আইনজীবী নিয়োগ করেন নাই?

উত্তর: অফকোর্স। আপনি যদি কোর্টের নোটিস না পান, কীভাবে আইনজীবী নিয়োগ করবেন?

প্রশ্ন: এই যে বিচার প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালে আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলি … অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদের ভাগ্নী মাসুদা হক রত্না, এ মামলার প্রথম সাক্ষী। তিনি বলেছেন যে, আপনি গিয়াসউদ্দিন সাহেবের বাসায় দুবার যান, যে বাসায় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন মাসুদা। দ্বিতীয়বার বাসা তল্লাশি করার সময় মাসুদার সঙ্গে আপনার বাকবিতণ্ডা হয় বলেও সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি। তিনি আপনাকে আগে থেকেই চিনতেন বলেও সাক্ষ্য দিয়েছেন। এব্যাপারে আপনার মন্তব্যটা কী?

উত্তর: প্রথমত, আমি আগেই বলে রাখতে চাই, এই সমস্ত সাক্ষী-সাবুত, প্রমাণাদি আমার কাছে আগে পেশ করা হয়নি। আমি আগে এসব দেখিনি। আমি শুধু মিডিয়াতে, আপনাদের মাধ্যমে এসমস্ত খবর পাচ্ছি। সুতরাং আমার উকিলের কাছেও এটা পেশ করা হয়নি, আমার কাছেও এটা পেশ করা হয়নি। আমার উকিলদের মত ছিল যে … এর স্পেসিফিকসে আমি যাব না … প্রথম কথা হচ্ছে- যারা নিজেদের আপনজন হারিয়েছে, তাদের লস, তাদের অনুভূতিতে আমি কোনোভাবে আঘাত করতে চাই না। এটা সত্যিই তাদের জন্য বেদনাদায়ক, এটা আমি স্বীকার করি। কিন্তু ‍এর সঙ্গে আমি এ-ও বলব যে, এ সমস্ত কথার কোনো সত্যতা নাই। মাসুদা রত্না আমাকে চিনলেও চিনতে পারেন। আমি তাকে ঠিক মনে করতে পারছি না, আমি চিনতে পারছি না। হয়তো তিনি আমাকে চিনতে পারেন এবং তিনি যে এ কথাগুলি বলেছেন…

প্রশ্ন: যে আপনার সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছে…

উত্তর: যদি হতো, আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন, এধরনের চাক্ষুষ প্রমাণ যদি কারো কাছে থাকে, তাহলে ঘটনার পরপরই তো তাদের উচিত ছিল কোথাও মামলা দায়ের করা, অথবা অন্তত থানায় একটা এজাহার করা। ৪০ বছরে কেউ কোনো থানায় এজহার পর্যন্ত দায়ের করতে পারল না, এর কারণটা কী? সংবাদপত্রের বানানো বানোয়াট গল্পকাহিনীর মাধ্যমে এরা নিজেরা কনভিন্সড হয়ে পরে এসব বিশ্বাস করতে শুরু করে, এটাই আমার বিশ্বাস। আমার তো এ সম্পর্কে কোনো, অন্য কোনোকিছু মনে নেই, আমি জানিও না। এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট।

প্রশ্ন: বাকবিতণ্ডার বিষয়টাও আপনার মনে নাই?

উত্তর: আমি তাদের বাড়িতেই কোনোদিন যাইনি, বাকবিতণ্ডা তো দূরে থাক। আগেও না,পরেও না।

প্রশ্ন: সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদ সাক্ষ্য দিয়েছেন, তার ও তার মামা সামনে চোখ বেঁধে সেলিনা পারভীনকে তুলে নিয়ে যান আপনারা। তার মামা যিনি কিনা তখন কলেজে পড়তেন, আপনি তো দৈনিক পূর্বদেশে চাকরি করতেন তখন, তো সেই সূত্রেই তাকে চিনতেন। সুমন দাবি করেছেন যে, দৈনিক পূর্বদেশ থেকে তাদের বাসার ঠিকানা অপহরণকারীদের জানানো হয়। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

উত্তর: আপনার এ প্রশ্নই আমার ওই থিওরি প্রমাণ করে যে, কীভাবে বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রমূলক সাংবাদিকতা হয়। এক শ্রেণির লোকের তৈরি গল্প লোকদেরকে প্রভাবিত করেছে। এধরনের একটা ঘটনা ঘটলে অপরাধে যারা ভুক্তভোগী তারা প্রথম মামলা করে। পরে পত্রিকায় এ সম্পর্কে খবর বের হয়। এখানে হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টা। প্রথমে পত্রিকায় খবর দেখে পরে ভুক্তভোগীরা মনে করতে শুরু করেছেন যে, সম্ভবত এ লোকই দায়ী। এটা একটা হাস্যকর ব্যাপার নয় কি?

প্রশ্ন: আপনি আশরাফুজ্জামান খানকে চিনেন? না কি আপনার স্মরণ …?

উত্তর: হ্যাঁ, আশরাফুজ্জামান খানকে চিনতাম।

প্রশ্ন: এখানে বলা হয়েছে যে, মানে ট্রাইব্যুনালে বলা হয়েছে যে, সাক্ষী বলেছে, অধ্যাপক সিরাজুল হক খানকে অপহরণের সময় আপনি ও আশরাফুজ্জামান খান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সাক্ষ্য দিয়েছেন, তার [সিরাজুল হক খানের] ছেলে এনামুল হক খান। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন তিনি। পরে পত্রিকায় ছবি দেখে তিনি আপনাকে চিনতে পারেন। আপনি বলেছেন যে পত্রিকাগুলোর [তথ্য ঠিক নয়]…।

উত্তর: পত্রিকায় এ সমস্ত কল্পকাহিনী বের হওয়ার পরে আমি দেশ ছেড়েছি, তার আগে নয়। তখনও আমি দেশেই ছিলাম। আর বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হবে কোত্থেকে যদি ভুক্তভোগীরা কোনো মোকদ্দমা না করে? আমার কথা হলো- আমি বারবার বাংলাদেশেও গিয়েছি, কোনোদিন আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি কেন? এধরনের কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ লোকদের হাতে থাকলে আমি কী করতাম? আমি পরদিন গিয়ে থানায় এজাহার করতাম, মোকদ্দমা দায়ের করতাম। এখনও তাই করা হয়। কিন্তু এ সমস্ত, এতোগুলো লোক, তারা কেউ কোথাও কোনো একটা মোকদ্দমা করার প্রয়োজনবোধ করলেন না কেন, এটা কি কেউ তাদের জিজ্ঞাসা করেছে? কথা হচ্ছে যে, এই ধরনের অভিযোগের যদি প্রপার ট্রায়াল হতো, যদি সঠিকভাবে জেরা হতো, তাহলে বাকিগুলোর মতো এগুলোও জেরার সামনে টিকতো না। কারণ এগুলো সব বানানো কথা। এগুলা লোকেরা পত্রিকার গল্প থেকে শুরু করে নিজেরা বিশ্বাস করা শুরু করেছে- এই হচ্ছে ঘটনা।

প্রশ্ন: আপনি কি পত্রিকায় প্রকাশের পরে প্রতিবাদ করেছেন?

উত্তর: প্রতিবাদ করার তো কোন অবস্থা ছিল না। দেশে যে পাগলামি চলছিল তখন, আমার কাছে লোকদেরকে ‘ইনটিমিডেইট’ করে, ভয় দেখিয়ে কতগুলা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। এমন রিপোর্ট আমার কাছে আছে।

প্রশ্ন: আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আপনার [ওপর] রিপোর্টটি ভয় দেখিয়ে ছাপা হয়েছে … ?

উত্তর: হ্যা, এই ধরনের খবরও আছে।

প্রশ্ন: এই যে…শহীদ সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফার ভাই আ ন ম গোলাম রহমান দুলু সাহেবকে জানিয়েছেন, তার ভাইকে খোঁজার জন্য পূর্বদেশের বার্তা সম্পাদকের নির্দেশে আপনি নিজেই তার সঙ্গে পুরানা পল্টনে ইসলামী ছাত্রসংঘের অফিসে, রমনা থানায় ও মোহাম্মদপুরে ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে যান। ফিজিক্যাল সেন্টারের সামনে পৌঁছালে আপনি রিকশা থেকে নেমে গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় গেটের বাইরে দাঁড়ানো ‘মিলিশিয়ারা’ আপনাকে দেখে ‘অ্যাটেনশন’ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিল। বেশ দাপটের সঙ্গেই সেদিন ট্রেনিং সেন্টারে ঢুকেছিলেন আপনি। রিকশায় বসে মিলিশিয়াদের সঙ্গে আপনার কথোপকথন শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি। সেমসময় আপনার মুখ থেকে আশরাফুজ্জামান খানের নামও শুনেন তিনি।

উত্তর: প্রথম কথা হচ্ছে, আমি শুরুতেই বলে নিতে চাই, কিছু সাংবাদিক আছেন, যারা আমার পরম শ্রদ্ধেয় … আ ন ম গোলাম মোস্তফা তাদের একজন। এর সঙ্গে আছেন কামাল লোহানী, আছেন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, বার্তা সম্পাদক ছিলেন; আর সলিমুল্লাহ ভাই। এদের হাতে আমার প্রকৃত সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। এদেরকে আমি সবসময় শ্রদ্ধা করছি, এখনও করি। এদের কোনো ক্ষতি আমার পক্ষ থেকে হতে পারে- এটা অকল্পনীয়।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, এরা উল্টো এই সমস্ত কাহিনী বিশ্বাস করেননি। আপনি … আপনাকে বলছিলাম যে, আমাদের পত্রিকায যখন আতিকুর রহমান প্রথম স্টোরি তৈরি করে … এটা এহতেশাম হায়দার চৌধুরী- তার নিজের ভাই ভিকটিম হওয়া সত্ত্বে তিনি- পূবর্দেশে ছাপতে অস্বীকার করেন বলে আমি খবর পেয়েছি। তিনি … কথা বিশ্বাস করেননি। পরে অস্ত্রধারী লোকদেরকে দিয়ে উনাকে ভয় দেখিয়ে কয়দিন পরে উনাদের পত্রিকায় ছাপা হয়।

ঠিক সেভাবে লোহানী ভাই। ডেভিড বার্গম্যান আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন। সেখানে আপনারা দেখেছেন, আমার কোনো সুপেরিয়রের ইন্টারভিউ করা হয়নি। আতিকুর রহমান আমার সমসাময়িক রিপোর্টার ছিলেন। কিন্তু আমার উপরে যারা ছিলেন তাদের ইন্টারভিউ ছিল না।

পরে যখন আমি মোকদ্দমা করি চ্যানেল ফোরের বিরুদ্ধে। তখন তারা আনএডিটেড ফুটেজ আমার কাছে সারেন্ডার করে। তার মধ্যে খুঁজে পেলাম লোহানী ভাইয়ের লম্বা ইন্টারভিউ করেছেন, দুইবার করে।ডেভিড বার্গম্যান সেখানে বিভিন্নভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমার বিরুদ্ধে বলাবার চেষ্টা করেছে যে, এসব ব্যাপারে আমি দায়ী ছিলাম। তিনি অস্বীকার করেছেন এসব বলতে।বরং তিনি বারবার আমার প্রসংসা করেছেন- আমার সাংবাদিক যোগ্যতার, মেধার।বাঙালিত্বের ব্যাপারে আমি যে তাদের সাথে একমত ছিলাম- এসব ব্যাপারে প্রশংসা করেছেন।

তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করেছেন কঠিনভাবে। কিন্তু আমার ব্যাপারে তিনি একমত হননি। এটা তো অনেক দিন পরের ব্যাপার। এটা তো ঘটনার বিশ বছর পরের ব্যাপার। সুতরাং এসব শ্রদ্ধেয় অগ্রজদের আমি কোনো ক্ষতি করবো, কোনোভাবেই সে প্রশ্ন ওঠে না।

এ ফুটেজ কিন্তু আমার কাছে আছে, লোহানী ভাইয়ের সেই ইন্টারভিউ এখনও আমার কাছে আছে।

কথা হচ্ছে, হ্যাঁ, এই ধরনের কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাকে তার পরিবারকে সাহায্য করার জন্য, সত্যি কথাই, এতেশাম ভাই আমাকে বলেছেন। তার কথায়, সলিমুল্লাহ ভাইয়ের কথায় আমি গেছি। তারা আমাকে যে জায়গায় দুলুকে নিয়ে যেতে বলেছেন সেখানে দুলুকে আমি নিয়ে গেছি রিকশায় করে। আমার সাধ্যমতো আমি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। বাকী ওখানে সে কী অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে দেখেছে না দেখেছে তা তার কল্পনা, এর মধ্যে কোনো সত্যতা নেই।

প্রশ্ন আপনি ’৭১-এ পূর্বদেশে ছিলেন? পূর্বদেশে সাংবাদিকতা করতেন?

উত্তর: হ্যাঁ

প্রশ্ন: আপনি মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছাত্র ছিলেন। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ভাই লুৎফুল হায়দার চৌধুরীর শান্তিবাগের বাসা থেকে নাকি তাকে নিয়ে গেছেন? মুখ বাঁধা অবস্থায়… টান মেরে আপনার মুখের কাপড় খোলা হয়েছে। এই সাক্ষ্য এসেছে …

উত্তর: কথা হচ্ছে, ইফতেখার হায়দার চৌধুরী বোধ হয় ভদ্রলোকের নাম। যদি তার কাছে এ ধরনের চাক্ষুষ প্রমাণ থাকত, তবে কেন থানায় কোনো এজাহার করেনি? তখন এটা তার জন্য করা সম্ভব ছিল না?

কথা হচ্ছে, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক ছিলেন। তার ভাই এতেশাম চৌধুরী আমার বার্তার সম্পাদক ছিলেন। তাদের সবাইকে আমি শ্রদ্ধা করতাম।আমি কোনোদিন তাদের কারো বাসায় যাইনি। শান্তিবাগের বাসা তো দূরে থাক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসাতেও কোনোদিন আমাকে যেতে হয়নি। এসমস্ত বানোয়াট কথার কোনো মানে নেই।

প্রশ্ন: আপনার দেশে বাড়িতে যখন আপনি যান … আপনি বলেছেন অনেকবার দেশে গেছেন। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে যখন যান- একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেছেন- তখন আপনি কোরবানির ঈদের নামাজ পর্যন্ত পড়তে পারেননি। আপনাকে পুলিশ প্রটেকশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে সময়।এটা কতটুকু সত্যি?

উত্তর: এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ জিয়াউর রহমানে সময় আমি বাংলাদেশে যাইনি। এটা প্রথম মিথ্যা কথা। আমি প্রথম বাংলাদেশে গেছি ১৯৮২ সালে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে। তারপর বেশ কয়েকবার প্রতি সরকারের সময় আমি বাংলাদেশ সফর করেছি। কখনো পুলিশ প্রটেকশনে আমি বাংলাদেশে যাইনি।

বরং প্রথমবার দেশে যাবার পর কিছু লোক, অল্প কয়েকজন মিছিলের অভিনয় করে, পুলিশ ডেকে আমার বাড়িতে পাঠিয়েছিল। তারা আমার জানতে গিয়ে আমার বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখে মাফ চেয়ে বিদায় হয়ে গেছে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে- আমার ঈদগাহে নামাজ না পড়াটা বাজে কথা।ওই ঈদগাহটা আমাদের পরিবারের ওয়াকফ করা। যুগ যুগ ধরে ঈদগাহের প্রথম সারি আমাদের পরিবারের জন্য নির্ধারিত ছিল।সর্বপ্রথম ইসলামী আন্দোলনে অংশ নেয়ার পরে আমি এটার প্রতিবাদ করি। আমি বলি এটাতো ঠিক নয় যে, আমাদের পরিবারের সদস্যরা প্রথম সারিতে নামাজ পড়বে আর বাকি সবাই পিছে।

… আমি বা আমার পরিবারের কেউ নামাজ পড়তে যাব আর কেউ বাধা দিবে সেটা হতেই পারে না।আমি দেশে দুইবার ঈদের নামাজ পড়েছি, একবার ঈদগাহে আরেকবার আমাদের বাড়ির সামনের মসজিদে।

প্রশ্ন: আপনি বিভিন্ন জায়গায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাকিস্তান সমর্থন করা কোনো অপরাধ ছিল না…

উত্তর: প্রথম কথা হচ্ছে পাকিস্তান তখন ‘সভরেইন কান্ট্রি’ [সার্বভৌম রাষ্ট্র] ছিল, এটাকে সমর্থন করা আইনত দণ্ডনীয় ছিল না। কিন্তু আমি প্র্যাগমেটিক, যুক্তিবাদী মানুষ। আমি অহেতুক, অন্যায় এবং অবাস্তব স্বপ্ন নিয়ে বসে থাকতে চাই না। আমি এগিয়ে যেতে চাই, পিছনে যেতে চাই না। এই জন্যই আমি বাংলাদেশকে গ্রহণ করেছি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছি।বাংলাদেশে আমার নাগরিকত্ব কখনো বাতিল হয়নি।আমার নাগরিকত্ব ছিল আগের মতোই। তবু আমি দরখাস্ত করে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছি। ব্রিটেনের হোম অফিস থেকে বাংলাদেশের হোম মিনিস্ট্রিতে তারা পাঠিয়েছেন।এখানে পাসপোর্ট নিয়েছি, বাংলাদেশে সফর করেছি। বাংলাদেশকে আমি ভালবাসি। ওই দেশের মাটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে। দেশের উন্নতি অগ্রগতির সঙ্গে আমার মনে যথেষ্ট টান আছে।সবচেয়ে বড় দুঃখে বিষয়- যে ব্যাপারে আমার স্কিল ছিল, দক্ষতা ছিল, আমার মুরব্বিরা… যাদের কাছে আমি সাংবাদিকতা শিখেছি তারা অন রেকর্ড বলেছেন- আমার মেধার কথা, সেই মেধা দিয়ে আমি দেশের সেবা করতে পারিনি। এটা একটা বড় দুঃখ। কিন্তু এখনো যেভাবে পারি বাংলাদেশকে সাহায্য করি, বাংলাদেশের উন্নতিতে ‘কন্ট্রিবিউট’ করার চেষ্টা করি।

এবং এটা আমি করতে থাকব। সরকার ভিন্ন ব্যাপার। কোনো সরকারকে আপনি সমর্থন করতে পারেন, কোনো সরকারের বিরুদ্ধে থাকতে পারেন। বর্তমান সরকারের বিষয়ে সারা দুনিয়া একমত যে এটা এক রকমের ডেমক্রেটিক ডিকটেটরশিপ। করাপ্ট এবং আনএকসেপ্টেবল। এটা আমার কথা নয়, এটা দেশের ভিতরে বাহিরে অনেক লোক বলেন। দেশ আর সরকার এক জিনিস নয়।

প্রশ্ন: অন্যান্য যুদ্ধাপরাধী যাদের রায় হয়েছে- এসমস্ত রায় সম্পর্কে আপনার অভিমতটা কী?

শেয়ার করুন