বিলবোর্ডে প্রচার এবার নৌকায় ভোট প্রার্থনা

0
115
Print Friendly, PDF & Email

জিরো পয়েন্টে তাকালেই জানা যেত ঢাকা থেকে সড়কপথে বিভিন্ন জেলার দূরত্ব কত। এখন আর তা সম্ভব নয়। নির্বাচনী প্রচারণার বিলবোর্ডে ঢাকা পড়েছে প্রয়োজনীয় সব তথ্য। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এখন শোভা পাচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রতীকের স্লোগানসংবলিত বিলবোর্ড, প্ল্যাকার্ড ষ ছবি: প্রথম আলোজায়গাটার আনুষ্ঠানিক নাম নূর হোসেন চত্বর। আর চত্বরের ঠিক মাঝে আছে জিরো পয়েন্ট। সেখানে সড়কপথে রাজধানী থেকে বিভিন্ন জেলার দূরত্ব লেখা থাকে। কিন্তু সবকিছুই এখন ঢেকে গেছে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী প্রচারণায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশাল ছবিসহ নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে চারটি কাঠের ফ্রেমের ফেস্টুন।

সিটি করপোরেশনের সাহস নেই এগুলো সরানোর। আর এভাবেই রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের বিলবোর্ড কিংবা স্থাপনাগুলোতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক ‘নৌকা’র ছড়াছড়ি। বিলবোর্ড ছাড়াও সড়ক বিভাজন, বিদ্যুতের খুঁটি, বিভিন্ন ভাস্কর্যের গায়েও শোভা পাচ্ছে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার। সেখানে আছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নানা আকারের ছবি।

পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ব্যক্তি মালিকানাধীন বিলবোর্ড দখল করে সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরেছে। নৌকায় ভোট দিলে কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে কী লাভ তা উল্লেখ করা হয়েছে এসব ব্যানার-বিলবোর্ডে।

জিরো পয়েন্টের পিলারগুলো ঢেকে টাঙানো ব্যানার-ফেস্টুন-কাটআউটের সবগুলোই যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের। যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। ছাত্রলীগেরও অনেক ব্যানার-ফেস্টুন দেখা গেছে নগরজুড়ে।

জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান আচরণবিধি অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার আগে প্রচার-প্রচারণার বিষয়ে আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই। তবে এটা নৈতিকভাবে ঠিক নয়। এ ছাড়া দেশে এখন নির্বাচনকালীন সরকার দায়িত্ব পালন করছে। এ সময় এভাবে প্রচার ক্ষমতার অপব্যবহারও বটে।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ৪০৭টি বিলবোর্ডের অনুমোদন দিয়েছেন। অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য কাউকে ভাড়া দিয়ে থাকলে সেটা তাদের জানা থাকে না। জিরো পয়েন্ট ঢেকে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা ট্রাক ভরে ভরে এসব ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে দেন। আবারও সেখানে ব্যানার টানানো হয়।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর আসাদগেটের উল্টোদিকে রাস্তার পাশের একটি বিলবোর্ড ঢেকে দিয়েছে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানা আওয়ামী লীগ। বিলবোর্ডজুড়ে এক পাশে শেখ হাসিনা এবং অন্য পাশে জাহাঙ্গীর কবির নানকের মোনাজাতরত পোস্টার। মাঝখানে নৌকার প্রতীক দিয়ে ভোট চাওয়া হয়েছে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচন কমিশন ঠিক করে দিয়েছে যে এবার প্রার্থীরা ভোটারপ্রতি আট টাকা খরচ করতে পারবেন। তফসিল ঘোষণার আগে এভাবে নিজ নিজ প্রতীক ও সম্ভাব্য প্রার্থীর ছবিসংবলিত প্রচারে নির্বাচনী ব্যয় শুরু করা অসমীচীন।

বিজয়সরণিতে বিমানের প্রতিকৃতি ঢেকে গেছে বাঁশ, কাঠ আর পাটের তৈরি কয়েক ফুট লম্বা নৌকায়। এটি বসিয়েছে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়। এই নৌকার ওপর টানানো হয়েছে একটি ব্যানার। এতে ‘নৌকায় ভোট মানে’ শিরোনামে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ফার্মগেট চত্বরের ভেতরে স্থাপন করা ভাস্কর্যের মাঝখানেও একইভাবে নৌকার প্রতীক বসিয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচারপত্র টানানো হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের উত্তর-পূর্ব কোণের বেশ বড় আকারের একটি বিলবোর্ডে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একটি ব্যানার স্থান পেয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরীসহ নেতাদের ছবি শোভা পাচ্ছে। ব্যানারটি বিলবোর্ডের পুরোটা ঢেকে দিতে পারেনি। ফাঁকা অংশটুকুতে দেখা গেছে ক্লিয়ার শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন।

সিটি করপোরেশন থেকে বিলবোর্ডের অনুমোদন নিয়ে ব্যবসায় নিয়োজিত একাধিক ব্যক্তি তাঁদের ভাড়া দেওয়া বিলবোর্ড দখল হয়ে যাওয়ার কথা জানান। তবে কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাঁরা জানান, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগ দখল করার পর বলছে পরে টাকা দেওয়া হবে। আর সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নামে দখল করা বোর্ডগুলোর বিষয়ে কথা বললে অনুমোদন বাতিলের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

একজন বিলবোর্ড ব্যবসায়ী বলেন, যুবলীগের নেতারা তাঁর বিলবোর্ড দখল করার পর যোগাযোগ করলে জানানো হয়, তিন মাসের জন্য নেওয়া হয়েছে, পরে টাকা দেওয়া হবে। আরেক ব্যবসায়ী বলেন, কয়েক মাস আগে যখন সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচার করার জন্য বিলবোর্ড দখল করা হয়, তখনো কোনো টাকা দেওয়া হয়নি।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ১৫ ফুট চওড়া এবং ৩০ ফুট লম্বা বিলবোর্ডই বেশি। অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বর্গফুটের জন্য সিটি করপোরেশনকে বছরে ১৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। সঙ্গে রয়েছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট।

শেয়ার করুন