‘দীপু মনির ভ্যানেটি ব্যাগে যাদু আছে’

0
56
Print Friendly, PDF & Email

মোহাম্মদ মোক্তার শেখ, চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের এক অখ্যাত নেতা। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণসংযোগকালে মহজোট প্রার্থী ডা. দীপু মনির ভ্যানেটি ব্যাগ ও মোবাইল বহন করতো সে। দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর ভাগ্য খুলে যায় মোক্তারের। দায়িত্ব পান মন্ত্রীর পিএ হিসেবে। প্রায় দু’বছর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থাকার পর হঠাৎ করেই আকাশ-কুসুম কল্পনার মতোই মোক্তারের ঠাঁই হয়ে যায় ইউরোপের অভিজাত দেশ ইটালীর দূতাবাসে। এখন পর্যন্ত মোক্তার সেখানেই সস্ত্রীক বহাল তবিয়তে। দীপু মনির ভ্যানেটি ব্যাগ বহনকারী চাঁদপুরের আরেক ভবঘুরে ছাত্রলীগ কর্মী সোহেলও এখন মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত। তাই তো অনেকেই বলে বেড়ান- ‘দীপু মনির ভ্যানেটি ব্যাগে যাদু আছে, বহনের সুযোগ পেলেই জীবন পাল্টে যায়’।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন চাঁদপুরের মকসুদ। দীপু মনির আস্থাভাজন নেতার বন্ধু হওয়ার সুবাদে তাকে প্রেষণে নিয়ে আসা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মকসুদ দায়িত্ব পান মন্ত্রীর এপিএস হিসেবে। দোর্দন্ড প্রভাবে দাবড়িয়ে বেড়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রীর ঘন-ঘন বিদেশ সফরের ব্যস্ততায় সে’ই হয়ে ওঠেন ‘ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী’।
রীতি বা প্রথা অনুযায়ী মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার নেতা-কর্মী, জনপ্রতিনিধি, পেশাজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ সর্বস্তরের জনগণের সাথে যোগাযোগ, অভাব-অভিযোগ শোনা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ সর্বোপরি এলাকাবাসীর সাথে মন্ত্রীর সেতুবন্ধন সৃষ্টি করাই ছিলো তার কাজ। অথচ মকসুদ তার সুবিধাভোগী কিছু লোক ছাড়া অন্য কাউকে মন্ত্রীর কাছে ঘেঁষতে’ই দেননি। ফলশ্রুতিতে নবম সংসদ নির্বাচনপূর্ব সময়ের জনপ্রিয় নেত্রী ডা. দীপু মনি এখন জনবিচ্ছিন্ন। এতোসব অপকর্মের পর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, চাকরিজনিত শাস্তি ও জনরোষ থেকে বাঁচতে এপিএস মকসুদ মন্ত্রীকে ম্যানেজ করে স্বপরিবারে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে। কূটনৈতিক বিষয়ে পড়াশোনা বা অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাকে পদায়ন করায় খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই অসন্তোষ দেখা দেয়। হতবাক চাঁদপুরবাসীও।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেয়ার আগ মুহূর্তে তথ্য ক্যাডার থেকে প্রেষণে আসা পিআরও চাঁদপুরের মনিরুল ইসলাম কবিরকে দীপু মনি লন্ডন দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে গেছেন। এ নিয়েও রয়েছে নানা অসন্তোষ।
মন্ত্রী থাকাকালে দীপু মনির চাঁদপুরস্থ কথিত এপিএস এডভোকেট সাইফুদ্দিন বাবুর (বিহারী বাবু) টিআর-কাবিখাসহ নানা প্রজেক্টের অর্থ-চাল-গম-ঢেউটিন লুটতরাজে নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুর-হাইমচরের মানুষের ক্ষোভ এখন চরমে। মন্ত্রীর সুপারিশকৃত কোন কাগজ বা আবেদনপত্রে সিল দিতেও টাকা নিতো সে। ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি বহু বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করে বিহারী বাবু শহরের মেথা রোডে গড়েছেন বহুতল ভবন। পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত এই বিহারী বাবুর পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সময় চাঁদপুরে আটকাপড়ায় আর দেশে ফিরে যেতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি পরিবারের সদস্যকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এপিএস হতে দেখে চাঁদপুরের শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ অপমানিত ও লজ্জিত হয়েছেন।
এভাবেই দীপু মনির বদান্যতায় রাস্তার ভবঘুরে ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মী ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দেশের দূতাবাসে কর্মরত। গত ৫ বছরে ছাত্রলীগের কয়েক ডজন নেতা-কর্মী ইউরোপ-আমেরিকার একাধিক দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ-পদায়ন-বদলীর ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে প্রচুর অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন দেশের ভিসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ট্রাভল এজেন্সীর কাছে কমিশন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মন্ত্রীকে ব্যবহার করেছেন। আর নিজেরা বাগিয়ে নিয়েছেন প্রচুর টাকা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি চাঁদপুরের উন্নয়নে ব্যাপক বরাদ্দ আনার ক্ষেত্রে রেকর্ড সৃষ্টি করলেও বাস্তবে কাজ হয়েছে যৎসামান্য। এছাড়া বরাদ্দকৃত উন্নয়ন প্রকল্প ইউনিয়নভিত্তিক বণ্টনের ক্ষেত্রেও চরম পক্ষপাত ও বৈষম্য করা হয়েছে। এ নিয়ে বঞ্চিত ইউনিয়নগুলোর নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের মাঝে চরম অসন্তোষ রয়েছে।
ঢাকা বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জে আর ওয়াদুদ টিপুকে চাঁদপুরের মানুষ না চিনলেও দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর জেলাবাসীর উপর তিনি খবরদারী শুরু করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাই হওয়ার সুবাদে ডা. টিপু প্রশাসনকে বাধ্য করে নিজ নামে শহরের ওয়ারলেস বাজার এলাকায় সরকারি জমি বরাদ্দ নেন। চাঁদপুর-হাইমচর নদীভাঙন রোধে প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রীর ভাই ডা. টিপুর পার্সেন্টিজ গ্রহণ ও কাজে অংশীদার হওয়ার জনশ্রুতি রয়েছে। সেই সাথে চাঁদপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলী, পদোন্নতি ও স্বপদে বহালের ক্ষেত্রে মন্ত্রীর ভাই ডা. টিপু তার আস্থাভাজন এডভোকেট জসিমউদ্দিন পাটওয়ারী, জাহিদুল ইসলাম রোমান ও সাইফুদ্দিন বাবুকে নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও প্রশাসনে রয়েছে অসন্তোষ।
চাঁদপুরের দুর্নীতিবাজ জেলা প্রশাসক প্রিয়তোষ সাহা ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনুর শাহীন খান দীপু মনির ছত্রছায়ায় চাঁদপুরে ঘুষের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। পরবর্তীতে ঐ বিতর্কিত কর্মকর্তা প্রিয়তোষ সাহাকে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ও তার পিএস নিয়োগ করে জেলাবাসীর কাছে আরো বেশি বিতর্কিত হয়েছেন।
গত ৫ বছর বিতর্কিত ক’জন নেতা-কর্মী পরিবেষ্টিত ডা. দীপু মনি এখন চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছেও নতুন মুখের মতো। চাঁদপুর-হাইমচরের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের তেমন ভালো-মন্দ খোঁজ-খবর না নিয়ে নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকা, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর করে নিজ এলাকায় সময় না দেয়ায় নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে আছেন তিনি। শুধু তাই নয়, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ এবং হাইমচর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোন্দলের অন্যতম ইন্ধনদাতা হিসেবে তিনি চিহ্নিত। গত ৩/৪ মাস যাবত তৃণমূল নেতা-কর্মীরা তার সামনেই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এ ব্যাপারে বক্তব্য দেন তারা। ফলে আগামী ১০ম সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হলে দীপু মনির নির্বাচিত হওয়াটা দুরূহ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তার ঘনিষ্ট নেতা-কর্মী এবং ভাইয়ের বিভিন্ন অপকর্মের ফলে আগামী নির্বাচনী পার হওয়াটা অসম্ভব বলে নেতা-কর্মীরা অনেকটা নিশ্চিত হয়ে আছেন। এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী না বদল হলে এবং ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে আসলে মহাজোটের প্রার্থীর হার প্রায় নিশ্চিত বলে এলাকায় আলোচনা চলছে।

শেয়ার করুন