ঠিকানা জালিয়াতি করে এক হাজার কনস্টেবল নিয়োগ

0
53
Print Friendly, PDF & Email

পুলিশঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা সাজিয়ে এক হাজার লোককে পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ হয়েছে ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুয়া জমির দলিল ও জাল নাগরিক সনদের ভিত্তিতে অন্য জেলার লোকদের ধামরাই উপজেলার বাসিন্দা দেখিয়ে কনস্টেবল পদে এঁদের নিয়োগের ব্যবস্থা করেছে একটি চক্র। এর সঙ্গে পুলিশের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কনস্টেবল প্রথম আলোকে জানান, চাকরি দেওয়ার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এ হিসাবে এক হাজার প্রার্থীর কাছ থেকে ৩০-৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর আশপাশের লোকজন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে তাঁরা পুলিশের চাকরির জন্য দরখাস্ত করেন কম। এ কারণে ঢাকার কোটা পূরণ হয় না। এই সুযোগে চক্রটি অন্য জেলার লোকদের ধামরাইয়ের বাসিন্দা সাজিয়ে অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার পরও যদি কারও নাম-ঠিকানা ভুয়া হয় বা প্রমাণিত হয় যে তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন, তাহলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশের নিয়োগবিধি অনুসারে কনস্টেবল পদে নিয়োগের সব ক্ষমতা জেলা পুলিশ সুপারের। নিয়োগের জন্য একটি কমিটি হলেও সেই কমিটির প্রধান থাকেন পুলিশ সুপার। প্রার্থী বাছাই, নিয়োগ ও চাকরি-পরবর্তী নাম-ঠিকানা যাচাইসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন জেলা পুলিশ সুপার। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আবেদনকারীদের নিজ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। আবেদনে জাল কাগজ বা ভুল তথ্য দেওয়া অপরাধ বলে গণ্য হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকা জেলা থেকে তিন বছরে (২০১১ থেকে ২০১৩) নিয়োগ পেয়েছেন এক হাজার ১২৯ জন। ঢাকা জেলায় পাঁচটি উপজেলা। কিন্তু শুধু ধামরাই উপজেলা থেকেই চার দফায় এক হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়।

ধামরাই উপজেলার কনস্টেবল নিয়োগের এই অস্বাভাবিক সংখ্যা জানার পর এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে ‘তথ্য অধিকার আইন’ অনুসরণ করে চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে আবেদন করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো তথ্য দেননি। এরপর ২৭ মে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করা হয়। সেখানেও ব্যর্থ হয়ে ১০ জুলাই তথ্য কমিশনে অভিযোগ করা হয়। তথ্য কমিশন এ ব্যাপারে শুনানির জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের হাজির হতে বলার পরপরই ধামরাই থানার ওসি যাবতীয় তথ্য প্রথম আলোর হাতে তুলে দেন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ধামরাই উপজেলা থেকে কনস্টেবল পদে ২০১১ সালে নিয়োগ পেয়েছেন ২২৯ জন। ২০১২ সালে দুই দফায় নিয়োগ পান ৫৬৮ জন। সর্বশেষ ২০১৩ সালে নিয়োগ পান ২০৩ জন। এঁদের সবাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের বাসিন্দা বলে দেখানো হয়।

পুলিশের দেওয়া তথ্য নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ধামরাই উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের আটটি গ্রামে নিয়োগপ্রাপ্তদের নাম-পরিচয় ও ঠিকানা ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। বাকি ১১টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে খোঁজ করা হয়। যেসব গ্রামে অনুসন্ধান চালানো হয় সেগুলো হলো রোয়াইল ইউনিয়নের দধিঘাটা ও আটিমাইটান, সোয়াপুর ইউনিয়নের আনন্দনগর ও ঈশান নগর, সানডা ইউনিয়নের শোলধন, গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের অর্জুন নালাই, কুশুরা ইউনিয়নের গারাইল ও রামদাইল। এসব গ্রাম থেকে ৩৫০ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানের সময় স্থানীয় লোকজন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র তিনজনকে ওই এলাকার বলে শনাক্ত করেছেন। বাকি ৩৪৭ জনকে গ্রামবাসী চেনে না। এমনকি এসব গ্রামে নিয়োগপ্রাপ্তদের কোনো বাড়িঘর বা অন্য স্থাবর সম্পদ আছে এমন তথ্যও কেউ বলতে পারেননি।

অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে পাওয়া গেছে চমকপ্রদ সব তথ্য। যেমন, পুরো উপজেলায় নিয়োগ পাওয়া এক হাজার লোকের মধ্যে জনাবিশেক লোক ধামরাই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। বাকি সব লোক অন্য জেলা বা উপজেলার বাসিন্দা। যে গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে, সেই গ্রামে কোনো হিন্দু পরিবারই বাস করে না।

রোয়াইল ইউনিয়নের সদস্য সারোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপর অতিথি পাখির মতো কিছু লোক এলাকায় আসা-যাওয়া শুরু করেন। স্থানীয় দালালের মাধ্যমে জমির দলিল ও নাগরিকত্ব সনদ জোগাড় করে চলে যান। এরপর আর তাঁদের দেখা যায় না।

একই ইউনিয়নের আরেক সদস্য শহীদুল আলম খান বলেন, কনস্টেবল পদে চাকরিপ্রার্থী কিছু লোক কয়েক বছর আগে ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকা কিছু জমি কিনেছিলেন। একশ্রেণীর দলিল লেখক টাকার বিনিময়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। চাকরিপ্রার্থীরা সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি দলিল করে সেই জমি মালিককে ফেরত দিয়ে দেন। এতে জমি প্রকৃত মালিকেরই থেকে যায়। মাঝখানে একটি দলিল পেয়ে যান চাকরিপ্রার্থীরা।

সানড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. খালেদ মাসুদ খান বলেন, ধামরাইয়ে একটি দলিল লেখক চক্র আছে। চাকরিপ্রার্থীরা অর্থের বিনিময়ে তাঁদের মাধ্যমে জমির দলিল এবং স্থানীয় ইউপি সদস্যদের কাছ থেকে নাগরিকত্ব সনদ সংগ্রহ করেন। সেই সব কাগজপত্র উপস্থাপন করে নিজেদের ধামরাই এলাকার লোক পরিচয় দিয়ে চাকরি নেন।

ঢাকা জেলার একজন পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেন, রাজধানীর পাশের এই উপজেলার বাসিন্দারা কনস্টেবল পদে আবেদন করেন না। এ কারণে অন্য জেলার লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে ওই নিয়োগের পেছনে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয় বলে তিনি স্বীকার করেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, জেলা পুলিশ সুপাররাই মূলত এসব নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

জানা যায়, জালিয়াতি করে এক হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়ার সময়ে তিন পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এঁরা হলেন বর্তমানে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি ইকবাল বাহার, ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমান ও ঢাকা জেলার বর্তমান পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। এঁরা পুলিশ বাহিনীতে ‘আওয়ামী পন্থী’ বলে পরিচিত।

যোগাযোগ করা হলে ইকবাল বাহারের পরিবার থেকে বলা হয়, তিনি বিদেশে আছেন। মিজানুর রহমান ও হাবিবুর রহমান একই ধরনের বক্তব্য দেন। তাঁরা বলেন, জমির দলিল ও নাগরিকত্ব সনদ দেখে তাঁদের ধামরাইয়ের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এঁদের সব তথ্য যাচাই করেছেন। যাচাই-বাছাই করে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি সঠিক তথ্য উপস্থাপন না করেন, তাহলে তাঁকেই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধার জাল সনদে কনস্টেবল পদে ২৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন ইকবাল বাহার। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা নোয়াখালী পুলিশ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নিতে গেলে এই জালিয়াতি ধরা পড়ে। তাঁদের ২৩ জনকে তখন গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছিলেন যে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তাঁরা চাকরি পান। তবে ওই সময় ইকবাল বাহার প্রথম আলোর কাছে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

ঢাকা জেলা থেকে চলতি বছরে সর্বশেষ নিয়োগ পান ২৫৮ জন। এঁদের ২০০ জনের বাড়ি গোপালগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকায়। বর্তমান জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান তাঁদের নিয়োগ দিয়েছেন। হাবিবুর রহমান নিজেও গোপালগঞ্জের বাসিন্দা।

শেয়ার করুন