অলির দরকষাকষি প্রধানমন্ত্রীতে আ.লীগ রাষ্ট্রপতিতে বিএনপি

0
34
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নিয়ে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি কি জাপা প্রেসিডেন্ট এরশাদের পথ ধরছেন নাকি আওয়ামী লীগের প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন বর্জন করবেন- এই দুই প্রশ্নের কঠিন নির্বাচনী সমীকরণ সামনে রেখে দু’দলের কাছে কদর বেড়েছে বিএনপির এই দলছুট নেতার।
গত সংসদ নির্বাচনে ‘কুলা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে একটি মাত্র আসনের টিকিট পেলেও এখন অলির এলডিপির দরজায় নাড়া দিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নানা লোভনীয় অফার।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নেয়ার শর্তে অলির এলডিপিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেয়া হয় ১২টি আসনে প্রার্থিতা ছাড় ও সকল নির্বাচনী ব্যয়ের অফার। সেই সঙ্গে এলডিপি থেকে একজন সিনিয়র মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী ও দু’জন উপদেষ্টার প্রস্তাব। আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের মাধ্যমে শেখ হাসিনার এই প্রস্তাবের বিপরীতে অলি দিয়েছেন দুই শর্ত। প্রথম শর্ত তাকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী করতেহবে। আর দ্বিতীয় শর্ত ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি আসনে ছাড় দিতে হবে।

তবে প্রধানমন্ত্রী ইস্যুতে আওয়ামী লীগ নেত্রী রাজি না হলেও নানাভাবে তাকে নিজেদের পক্ষে নিতে হাছান মাহমুদের পর অলির বাসভবনে পাঠান আওয়ামী লীগের জৈষ্ঠ্য এক নেতাকে, যিনি যুক্ত হয়েছেন সদ্যগঠিত নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায়। এরপরও অলি তার দাবিতে অনঢ থাকায় বিষয়টি নিয়ে নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার।

সূত্রে জানা যায়, ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম এই শরিক দলকে বাগিয়ে নিতে সরকার যখন এই খেলায় মেতেছে, সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব পাওয়ার পর ঠিক এর একদিন পরই গত বুধবার রাতে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কাছে পাল্টা প্রস্তাব পাঠিয়েছেন এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি। অলির বার্তা নিয়ে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল যান বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে।

এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহদুদুর রহমান চৌধুরী এবং সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম ছিলেন এ প্রতিনিধি দলে। তিন সদস্যের এই প্রতিনিধি দল বেগম খালেদা জিয়ার কাছে তুলে ধরেন আওয়ামী লীগের লোভনীয় এই প্রস্তাব।

এর পর তারা ১৮ দলে থাকার আগ্রহ জানিয়ে জুড়ে দেন কিছু শর্ত। এর মধ্যে রয়েছে ১৭টি সংসদীয় আসনের তালিকা। এ তালিকার মধ্যে ১৪ জন রয়েছেন গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলের সাংসদ। রয়েছেন বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। এম রধ্যে বেগম জিয়ার কাছে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কর্নেল অলিকে রাষ্ট্রপতি করার নিশ্চিয়তা চেয়ে বসেন এলডিপির প্রতিনিধি দলটি। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়ে’ বিএনপির সঙ্গ এলডিপিকে একীভূত করতেও আপত্তি থাকবে না বলে উল্লেখ করেন তারা। বৈঠক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এসময় বেগম খালেদা জিয়া অলির বার্তা নিয়ে যাওয়া এ প্রতিনিধি দলের কথা শুনলেও তেমন আশার বাণী শোনাননি। তিনি বলেন, ‘এখন এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময় আসেনি। দেশের সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে কিনা তার কোনো নিশ্চিয়তা নেই। সময় এলে তখন এলডিপির অবস্থান অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে।’

বেগম জিয়ার এমন বক্তব্যে এলডিপি প্রতিনিধি দলটি হতাশ হলেও এসময় বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এলডিপির দাবির প্রেক্ষিতে প্রতিনিধি দলকে বলেছেন এক বাক্যের একটি লাইন, ‘এলডিপি’র মূল্যায়ন হবে তা গ্যারান্টেট’।

সরকারের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল অলির বার্তা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কাছে গিয়ে উল্লেখিত প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক শাহাদাত হোসেন সেলিম।

তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে পার্টিরি চেয়ারম্যানের কাছে একাধিক বার বিভিন্ন লোভনীয় অফার দেয়া হচ্ছে। এমনকি ১৮ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দিতে সরকার নানাভাবে ভয়ভীতিসহ চাপও দিচ্ছেন। এসব বিষয় আমরা বেগম জিয়াকে জানিয়েছি।’

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রস্তাবে কোনো দিকে যাচ্ছে এলডিপি এমন প্রশ্নের জবাবে কর্নেল অলির ঘনিষ্ট এই নেতা বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে ১৮ দলভুক্ত হতে গিয়ে কর্নেল অলিকে কারাগারে যেতে হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ হারাতে হয়েছে। এছাড়া দলের নানা স্তরের নেতাকর্মীদের সরকারের রোষানলে পড়ে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সরকারের এমন লোভনীয় প্রস্তাবের পর স্বাভাবিকভাবেই ১৮ দলীয় জোটের তৃতীয় বৃহত্তম শরিক হিসেবে আমাদের কিছু দাবিতো বিএনপিকে মানতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তবে সময় এখনো ফুরায়নি। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করছি বিএনপি এলডিপিকে তার যথাযথ মূল্যায়ন করবে।’

সম্প্রতি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্নেল অলিকে নিয়ে বিভিন্ন মুখরোচক খবর প্রকাশিত হলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন তিনি। সম্প্রতি বাংলামেইলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের একাধিক নেতা আমার কাছে এসেছেন। তারা আমাকে নির্বাচনে সিট দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন, এমনকি নির্বাচনের খরচ দেয়ার কথা বলেছেন। আমিও তাদের বলে দিয়েছি এই বিষয়ে আলোচনা করতে মোটেও আগ্রহী নই।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক অলি আহমদ বরং নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হলে সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনার দায়িত্ব আমি নেবো। একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করবো।’

শেয়ার করুন