জামায়াতের নেতারা জেলে রাজপথে সক্রিয় কর্মীরা

0
100
Print Friendly, PDF & Email

দেশের প্রধান ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর বেশির ভাগ শীর্ষ নেতা জেলে কিংবা আত্মগোপনে। কিন্তু রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় কর্মীরা। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শীর্ষ নেতাদের বিচার ও দলের নিবন্ধন বাতিলকেন্দ্রিক উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এককভাবে নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। পাশাপাশি ১৮ দলীয় জোটের কর্মসূচি বাস্তবায়নেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে দলটির কর্মীরা। রাজপথের আন্দোলনে এ পর্যন্ত অসংখ্য নেতাকমী হতাহত ও গ্রেফতার হলেও কর্মীদের মধ্যে পিছুটান লক্ষ করা যায়নি। সর্বশেষ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহল থেকে জোরালো প্রশ্ন ওঠা এবং বিরোধী দলের নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের পক্ষে দেশ ও বিদেশে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠায় জামায়াতের নেতাকর্মীদের মনোবল আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাকে জামায়াত তাদের অবিচল ও ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল হিসেবেই দেখছে। শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে অনেকটা নিষিদ্ধ অবস্থার মধ্যে থেকে প্রতিকূলতার মধ্যেই মাঠের কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা জামায়াতকে সাংগঠনিকভাবে আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী করে তুলেছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। একই সাথে দাওয়াতি কার্যক্রমসহ সাংগঠনিক নিয়মিত কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে বলে নেতারা দাবি করছেন। জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে দলটির সর্বশেষ অবস্থা ও কার্যক্রমের বিষয়ে এসব তথ্য জানা যায়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্টের রায় ও রাজপথের আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের সরব উপস্থিতির বিষয়গুলো সাম্প্রতিক সময়ে সর্বমহলে বহুল আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে এই সরকারের আমলেই প্রথমবারের মতো এককভাবে বেশ কয়েক দফায় হরতাল পালনের মধ্য দিয়ে জামায়াত রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের শক্তি সামর্থ্যরে জানান দিয়েছে। রাজপথে প্রতিবাদ বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে দুই শতাধিক নেতাকর্মী নিহত এবং অসংখ্য আহত হওয়ার পরও রাজপথে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতির বিষয়টি সর্বমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জামায়াত জোটের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রভাগে থাকার মধ্য দিয়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। সরকারে মেয়াদের শেষলগ্নে নির্দলীয় সরকার প্রশ্নে আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়েও জামায়াতকর্মীদের রাজপথে অংশগ্রহণ জোটের মধ্যেও বেশ প্রশংসিত। প্রথম সারির নেতাদের অনুপস্থিতিতেও জামায়াত প্রতিকূলতা মোবাকেলা করে সাংগঠনিকভাবেই তার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বলে দৃশ্যমান। দলটির সাবেক আমির অধ্যাক গোলাম আযম, আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির মাওলানা এ কে এম ইউসুফ, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মাওলানা আবদুস সুবহান, সেক্রেটরি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ ১০ শীর্ষ নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের ইতোমধ্যেই ট্রাইব্যুনালে মামলার রায় হয়েছে। তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন এবং তাদের মধ্যে একজনের আপিলেরও রায় হয়েছে। এর বাইরে সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনীম আলম, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ আরো বেশ কয়েকজন নেতা করাবন্দী। ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, কর্মপরিষদ সদস্য ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো: তাহের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য হামিদুর রহমান আজাদ এমপি, মাওলানা আব্দুল হালিম, নূরুল ইসলাম বুলবুলসহ অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতারা বাইরে থাকলেও দীর্ঘ দিন ধরে আত্মগোপনে। মগবাজারের জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, পুরানা পল্টনের মহানগর কার্যালয় ও শিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয় গত সাড়ে তিন বছর ধরে বন্ধ। দীর্ঘ দিন প্রকাশ্যে কোনো সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেন্দ্রীয় নেতাদের এক জায়গায় বসে সিদ্ধান্ত নেয়ারও সেভাবে সুযোগ হচ্ছে না। এরই মধ্যে একাধিক নেতা কয়েক দফায় জেল খেটে এসে এখন আত্মগোপনে রয়েছেন। এই অবস্থায়ও দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত চেইন অব কমান্ড আগের মতোই শুধু বহালই নেই, রাজপথে কর্মসূচি বাস্তবায়নে অন্য শরিকদের চেয়েও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কযেকজন নেতা এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে মহাজোট সরকারের চরম বৈরিতার শিকার হয়েও জামায়াত যে তার নীতি আদর্শকে অটুট রেখে তার অবস্থানকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছে এটা কম কথা নয়। তিনি বলেন, এটা জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসকেই কেবল বাড়িয়ে দেয়নি, এর মধ্য দিয়ে জামায়াতের শক্তি-সামর্থ্যও গ্রহণযোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এতে নেতাকর্মীদের মনোবল যেমন চাঙ্গা হয়েছে, তেমনি তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, সততা ও নিষ্ঠার কারণে জনসম্পৃক্ততাও অনেক বেড়েছে। মানুষ আগের চেয়ে জামায়াতকে আরো বেশি সহযোগিতা করছে এবং জামায়াতের রাজনীতির ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও ওই নেতাদের দাবি। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য জানান, দাওয়াতি কার্যক্রমসহ কোনো কাজই থেমে নেই। জামায়াত নিয়মতান্ত্রিক আদর্শিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী একটি দল। সরকার জামায়াতকে অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করার মতো অবস্থায় রাখলেও জামায়াত রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার যে ঘোষণা দিয়েছিল তা-ই অনুসরণ করেছে। তিনি বলেন, এই সরকারের আমলে জামায়াতের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন হয়েছে জামায়াতের ইতিহাসে এত জুলুম-নির্যাতন আর আসেনি। তার পরও জামায়াত চরম ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাকেলা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জামায়াতের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ও আন্দোলন অব্যাহত আছে এবং থাকবে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয় নিয়ে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক মহলের গভীর উদ্বেগ প্রকাশের ঘটনা জামায়াতের দীর্ঘ দিনের দাবিকে সত্য প্রমাণ করেছে বলেই মনে করছেন নেতারা। তাদের মতে বিচার নিয়ে জামায়াত যেসব অভিযোগ ও আশঙ্কা করে আসছিল সেগুলো ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে ওঠায় দেশ-বিদেশে বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জামায়াত ন্যায়বিচার পাবেÑ এমনটিই নেতার আশা করছেন। এ দিকে হাইকোর্টের রায়ে নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি নিয়ে এই মুহূর্তে জামায়াত চিন্তিত নয় বলে জানান নেতারা। তাদের মতে, বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। এ জন্য বিচারপ্রক্রিয়া পুরো শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জামায়াতের নিবন্ধন যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকবে। এখানেও তারা ন্যায়বিচারের আশা করছেন এবং নিবন্ধিত দল হিসেবে নির্বাচন করতে জামায়াতের কোনো অসুবিধা হবে না বলেই মনে করছেন। ১৮ দলীয় জোটে জামায়াত যেভাবে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে সেটা অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতেও জামায়াত জোটগতভাবে এগিয়ে যাবে ও ভূমিকা পালন করে যাবে বলে জানান নির্বাহী পরিষদের আরেক সদস্য। তিনি বলেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য ১৮ দলের যে দাবি সেটা দেশের মানুষ গ্রহণ করেছে এবং দেশ-বিদেশে সেই দাবির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সেই দাবিকে উপেক্ষা করলে তা তাদের জন্যই অশুভ পরিণতি ডেকে আনবে। তবে যেভাবেই হোক দেশের বর্তমান অস্থির ও প্রতিকূল পরিস্থিতির অবসান ঘটবে এবং দেশে সব দলের জন্য সমান রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার মতো পরিস্থিতি ফিরে আসবে বলে আশা করছেন জামায়াতের নেতারা।

শেয়ার করুন