সীতাকুণ্ডে নৈরাজ্য যে কারণে

0
55
Print Friendly, PDF & Email

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে যানবাহন ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়াসহ সামপ্রতিক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্য বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি আরো বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মহাসড়ক কেন্দ্রিক ঠিকাদারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে ডাকাত চক্রের তত্পরতা বৃদ্ধি ও বড়দারোগাহাটে স্থাপিত যানবাহনের ওজন পরিমাপের স্কেলের দখল নিয়ে বিরোধ। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সমপ্রতি সীতাকুণ্ডে বিভিন্ন অশুভ চক্রের সাথে মুখোশধারী লোকজনেরও তত্পরতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বিএনপি ও জামায়াত শিবির তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সামনে রেখে যানবাহন ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, মহাসড়কে ব্যারিকেড ইত্যাদি কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। কিন্তু মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের ব্যাপারে কেউ তাদের পরিচয় সরাসরি প্রকাশ করছে না। মুখ খুলছে না পুলিশও। সীতাকুন্ড উপজেলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কাশেম মাস্টারের সাথে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরীর বিরোধ রয়েছে। একইভাবে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরো একাধিক গ্রুপিং রয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ একাধিক নেতার পরিবারের অনেক সদস্য জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে এলাকাবাসী জানায়।

সীতাকুন্ড উপজেলা শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এবং এখানে দেশের একমাত্র শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডসমূহ থাকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এ সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সাথে জড়িত। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরিবার গত পাঁচ বছর ধরে সকল ধরনের ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে শুধু বিরোধী দলের নেতা-কর্মীই নয়, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো জানায়, সীতাকুন্ডে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হিসেবে তুলে ধরার জন্য দলমত নির্বিশেষে অনেকেই অপরাজনীতিতে জড়িত রয়েছেন। এর সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে জানা যায়। বিশেষ করে বিএনপির এক নেতা এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হওয়ায় এবং আগামী নির্বাচনে তিনি বিএনপির সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ায় স্থানীয় সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের সাথে তার সখ্য রয়েছে। তার লোকজন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ এ সকল কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে জেলা পুলিশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জানান। তবে জামায়াত-শিবির ফ্রন্ট লাইনে থেকে সহিংসতা ও নৈরাজ্যের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বলে জানা গেছে। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এর সুফল ভোগ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাটে জড়িত মুখোশধারীরা একাধিক রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান। তাছাড়া রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের সাথে সাথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ছিনতাই ও লুটপাটের ঘটনায় একাধিক ডাকাত দলও জড়িত রয়েছে বলে জানা যায়। নৈরাজ্য প্রতিরোধে সীতাকুণ্ডের ১৩টি পয়েন্টকে স্পর্শকাতর হিসাবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এসব স্থানে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মো. ইলতুিমশ গতকাল শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সীতাকুণ্ডে নানা অশুভ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জামায়াত-শিবিরের তত্পরতার পাশাপাশি ডাকাতিসহ নানা অপকর্ম বেড়েছে। সমপ্রতি মহাসড়কে কাভার্ড ভ্যানের চাকা কেটে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করছিল একটি চক্র। পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর তারা ডাকাতি করার জন্য গাড়িতে আগুন দিয়েছিল বলে স্বীকার করে।

তিনি আরো বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় সড়ক সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছে। এ কারণে যানবাহন ধীর গতিতে চলাচল করায় সুযোগসন্ধানীদের ‘পোয়াবারো’ হয়েছে। পিকেটিংয়ের নাম করে বাস ট্রাক থামিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতি করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। রাস্তায় প্রচুর যানবাহন থাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষেও দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়া সম্ভব হয় না।

জানা গেছে, মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রোর কাজ বাগিয়ে নেয়ার জন্য বছরখানেক আগে যুবলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে কোন্দল শুরু হয়। এর জের ধরে পৌর যুবলীগ নেতা এনামুল হক এনামকে খুন করে প্রতিপক্ষ। এ ঘটনার পর যুবলীগের সন্ত্রাসীরা এয়াকুব নগর গ্রামে আশ্রয় নিতে গেলে গ্রামবাসী তাদের আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেন। এর প্রতিশোধ নিতে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এয়াকুব নগর গ্রামে পুলিশের ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ক্যাডাররা ব্যাপক তাণ্ডব চালায় বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেন। এসময় সন্ত্রাসীরা এলাকায় ব্যাপক গুলিবর্ষণ করে।

হামলাকারীরা নজরুল নামে এক ব্যক্তির মোটর সাইকেল নিয়ে যাওয়া ছাড়াও একরাম সওদাগরের দোকান থেকে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মালামাল, হারুনের ঘর থেকে ১৬ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন লুটপাট করে। এলাকায় ছাত্রলীগ যুবলীগ ক্যাডারদের হাত থেকে বাজারের সবজি ও মাংস বিক্রেতারাও রক্ষা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হারুন নামে এক বাসিন্দা জানান, পুলিশের ভয়ে গ্রামের সব পুরুষ এখন বাড়িছাড়া। পুরুষ শূন্য বাড়িঘরে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা এসে নারীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।

এদিকে পশ্চিম আমিরাবাদ গ্রামে গত সোমবার রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে সরকার সমর্থক দলের লোকজন ব্যাপক গুলিবর্ষণ, লুটতরাজ, ভাংচুরের ঘটনা ঘটায়। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে সীতাকুণ্ড উপজেলার এক প্রভাবশালীর ইন্ধনে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

গতকাল শনিবার আমিরাবাদ গ্রাম ঘুরে গুলিবর্ষণসহ ব্যাপক সহিংসতার আলামত দেখা যায়। গ্রামবাসী অভিযোগ করেন বিভিন্ন বাড়ির দরজা জানালা ভেঙে দুর্বৃত্তরা ঘরে প্রবেশ করে আলমারি, শোকেস ভেঙে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালঙ্কার লুট করে। গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুল হক (৮০) জানান, পুলিশ ও ছাত্রলীগের মুখোশধারী কর্মীরা নগদ ২৫ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে। এছাড়া পুলিশ আরিফ হোসেন নামে তার ১৫ বছর বয়সী নাতিকেও আটক করেছে।

রেহানা বেগম (৭০) জানান, পুলিশ তার গলার চেইন, ৫টি মোবাইল ফোন ও নগদ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। সালেহ আহমদ ড্রাইভারের বাড়ির জাহানারা বেগম (৬০) জানান, তার দুই ছেলেই বিদেশে থাকে। কেউ রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। তবুও পুলিশ আসামি ধরার নাম করে তার বাড়িতে হামলা করে। গুলিতে তার বাড়ির জানালা ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম বদিউজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর সীতাকুণ্ডে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

শেয়ার করুন