মুখে খই ফোটালেও মাঠে নেই বিএনপির শীর্ষ নেতারা

0
39
Print Friendly, PDF & Email

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে দুই বছর ধরে আন্দোলন করছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। সরকারের শেষ সময়ে এক দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। কিন্তু শীর্ষ নেতারা মাঠে না থাকায় আন্দোলন ততটা বেগবান হচ্ছে না।

পঞ্চাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সরকার। এর পর থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নামে বিএনপি। হরতাল, পথসভা, বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কোনো আন্দোলনই সরকারের টনক নড়াতে পারেনি।

প্রথম দিকে জোরদার আন্দোলন না করলেও সরকারের মেয়াদ কমার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন জোরদার করতে শুরু করে বিএনপি। দাবি আদায়ে চলতি বছর বিরোধী দলীয় নেত্রী জনসভা থেকে দুই দফা সময় সীমা বেঁধে দেয়ার পরও সরকার তাতে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। তারপরও দাবি আদায়ে জোরালো কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি তারা বিরোধী দল। উল্টো আন্দোলন দমনে সরকার হার্ডলাইনে চলে যায়। বিরোধী দলের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা ও একাধিক নেতাকে গ্রেফতার করে আন্দোলনের গতিকে অনেকটা স্তব্ধ করে দেয় সরকার। মুখে খই ফোটালেও আন্দোলনের সময় মাঠে নামেন না বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতারা।

২৫ অক্টোবর রাজধানীসহ সারাদেশে সমাবেশ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল। ওই কর্মসূচিতে ঢাকার নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কম থাকলেও বিভাগীয়, জেলা ও থানা পর্যায়ে নেতাকর্মীদের ঢল নেমেছিল। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রথম দফায় টানা ৬০ ঘণ্টা হরতালের ডাক দেয়১৮ দলীয় জোট। এর পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আবারো টানা ৬০ ঘণ্টার হরতাল এবং ও দ্বিতীয় সপ্তাহে টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতালসহ তিন দফায় ২০৪ ঘণ্টার হরতাল পালন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এরপরও সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনে কর্ণপাত না করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানা যায়, আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হবে, এমনটা ধরে নিয়েই বিএনপি পূর্বে ‘নরম’ কর্মসূচি দিয়ে ছিলো। ২৫ অক্টোবরের পর্যন্ত ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চার বিভাগীয় রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেটসহ নরসিংদী জেলায় খালেদা জিয়ার জনসভা।

নাম প্রকাশে অনইচ্ছুক দলের দায়িত্বশীল নেতা বলেন, মাঠ পর্যায় নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা রাখতে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়া দরকার। তা না হলে কর্মীরা মনোবল হারাতে পারেন। আর এ সুযোগে সরকার বিএনপিকে গুরুত্ব না দিয়ে একদলীয় নির্বাচন করার পথে যেতে চাইবে।

পূর্ব ঘোষিত গত ২৫ অক্টোবরের পর থেকে দলীয় কর্মসূচিতে সরেজমিনে দেখা গেছে কেন্দ্রীয় ঘোষিত দলের কর্মসূচি পালন করতে তৃণমূল নেতা কর্মীদের মাঝে গতি এলেও কেন্দ্রীয় নেতারা মাঠে নেই। আন্দোলনে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিত তৃণমূল নেতা কর্মীদের মাঝে চরম হতাশা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এমন কি কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের যে সব নেতা কর্মী গ্রেফতার, আহত ও মামলায় আসামি হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের খোঁজ খবর নেয়নি বলে তৃণমূল নেতারা অভিযোগ করেন।

এ ব্যাপারে দলীয় সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় নেতারা আন্দোলনে নিজেদের স্বক্রিয়ভাবে জড়িত না করায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক শীর্ষ নেতার ওপর ক্ষ্ব্ধু হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া। রাজধানীতে আন্দোলন জোরদার না হওয়ায় কয়েক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছেন বেগম জিয়া।

প্রথম দফার পর হরতালের পর পরের দুই দফা হরতালে রাজধানীতে তেমন প্রভাব না পড়লেও তৃণমূলে ছিল ভিন্নরূপ। তৃণমূলে অনকেটা সফল হরতাল পালিত হওয়ায় রাজধানী অনেকটা সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে এ কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতি প্রায় ছিলো না বললেই চলে। যে কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশার পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। অতীতে ঢাকার রাজপথের আন্দোলনে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার বলিষ্ট ভূমিকা লক্ষ্য করা গেলেও বর্তমানে সক্রিয় নয়। এমন কি স্থায়ী কমিটির এক সদস্যকে কোথাও মাঠে নামতে দেখা যায়নি।

তিন দফার হরতালে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যাদের মাঠে দেখা গেছে তারা হলেন- চট্টগ্রামে ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খন্দকার। বরিশালে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবুর রহমান সারওয়ার, সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল, রাজশাহীতে যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু ও সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে। খুলনায় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কুষ্টিয়ায় সাবেক এমপি মেহেদী আহম্মেদ রুমি, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি অধ্যক্ষ সোহবার উদ্দিন, নরসিংদীতে শিক্ষা সম্পাদক খায়রুল কবির খোকনকে হরতালে মাঠে দেখা গেছে।

অপরদিকে সংসদ ভবন এলাকায় সব হরতালেই সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপিসহ সংসদ সদস্যদের মিছিল করতে দেখা গেছে।

তৃতীয় দফা হরতাল ডাকার পর বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল আওয়াল মিন্টু এবং চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার এড়াতে আত্ম গোপনে চলে যায়। হরতাল সফল করতে তৃণমূল নেতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হয়।

এদিকে আলোচনা হলে দুই রাজনৈতিক পক্ষেই ছাড় দেয়ার বিষয়টি আসতে পারে। এ আশায় বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কয়েক দিন ধরে আবারো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে টেলিযোগাগের মাধ্যমে সংলাপের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলে জানা যায়।

বিএনপির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২০৪ ঘণ্টার হরতালকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ১৮ দলের নিহত হয়েছেন ২৪ জন। এসব ঘটনা সব রাজধানীর বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি দলের লোকদের হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজারের অধিক নেতাকর্মী। আর বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রায় দুই লাখের বেশি নেতাকর্মীকে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ৯৮ জনকে সাজা দিয়েছে।

শেয়ার করুন