ইন্টারনেটের গতি ও ব্যান্ডউইথ বিক্রি তেলেসমাতি

0
54
Print Friendly, PDF & Email

আমরা অনেকেই প্রযুক্তির খুঁটিনাটি বুঝি না। বুঝি ইন্টারনেটের গতি। ধীরগতিতে ত্যক্তবিরক্ত। থ্রিজি নিয়ে যত হইচই, তার সেবা সাধারণ জনমানুষ কতটুকু পাবে- সেটাও নিশ্চিত নয়। টেলিটকের গ্রাহক সেবা কুৎসিত রকমের বাজে হলেও, গতি ভালো। বেসরকারি অপারেটররা থ্রিজি নিয়ে বিশাল হইচই করছেন। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের আগেই দেখছি, দাম অনেক বেশি।

ইন্টারনেটের গতি নিয়ে কথা বলতে গেলেই আমাদের কিছু বক্তব্য শুনতে হয়।
ক. গতি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
খ. ’৯১-এর বিএনপি সরকার বিনামূল্যে সাবমেরিন কেবল সংযোগ নেয়নি, নিরাপত্তার অজুহাতে।
গ. ’৯৬-এর শেখ হাসিনা সরকার সাবমেরিন কেবলের সংযোগ নিয়েছেন। নিতে হয়েছে অর্থের বিনিময়ে।

এই তিনটি বক্তব্যই পুরোপুরি সত্য। এই সত্যতা মাথায় রেখেই ইন্টারনেটের বর্তমান গতি নিয়ে কথা বলছি। থ্রিজি এসেছে, ফোরজি আসবে, এই প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েই কিছু কথা বলতে চাইছি।

১. বাংলাদেশের কাছে এখন মোট ২৬০.৬ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ আছে। আমরা এখন ব্যবহার করি কোনো হিসাবে ১৭ গিগাবাইট, কোনো হিসাবে ২৬ গিগাবাইট। ধরে নিলাম সর্বোচ্চ ৩০ গিগাবাইট ব্যবহার করছি। ২৬০.৬-৩০=২৩০.৬ গিগাবাইট আমাদের মজুদ রয়ে গেছে। যার কোনো ব্যবহার নেই। আমাদের যে ইন্টারনেটের গতি, সেটা হচ্ছে ৩০ গিগাবাইটের গতি।

আমি নিশ্চিত, আপনারা অনেকেই মনে করছেন আমি ভুল লিখছি, ভুল বা অসত্য তথ্য দিচ্ছি। না, ভুল তথ্য নয়। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটাই বাস্তব এবং সত্য তথ্য।

২. ২৩০ গিগাবাইট কেন মজুদ করে রেখেছি, কেন ব্যবহার করছি নাÑ এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কারও কাছে আছে বলে আমার জানা নেই। এর সামান্য কিছু অংশ চুরি করে ব্যবহার করা হয় ‘ভিওআইপি’র কাজে। আপনাদের যাদের মোবাইলে বিদেশ থেকে ফোন আসে, দেখবেন ৯৯% নাম্বার ওঠে টেলিটকের। রাষ্ট্রের ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে ফাঁকি দিয়ে কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করছে। ভিওআইপি’র এই চক্রে কে জড়িত আর কে জড়িত নয়… এখন সে বিষয়ে কিছু নাই বা বললাম। তবে ২৩০ গিগাবাইটের খুব সামান্য অংশই এ কাজে ব্যবহার হয়।

৩. প্রথমাবস্থায় বাংলাদেশের হাতে ছিল ১৬০.৬ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ। পরে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) থেকে লোন নিয়ে আরও ১০০ গিগাবাইট যোগ করা হয়। এখন আইডিবি থেকে লোন নিয়ে আরও কমপক্ষে ১০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ কেনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। হাতে এত বিশাল পরিমাণ মজুদ রেখে লোন নিয়ে আরও ব্যান্ডউইথ কেনার তাৎপর্য কি?

৪. তাৎপর্যের একটি তথ্য জানা গেল সম্প্রতি। তথ্যটি জানিয়েছে ভারতের গত ১৩ আগস্ট সংখ্যায় ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানির (বিএসসিসিএল) সঙ্গে ভারতের টাটা টেলিকমিউনিকেশনের ব্যান্ডউইথ বিক্রির একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে, যা নিয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনা অনুযায়ী টাটা বাংলাদেশের কাছ থেকে ১০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ ক্রয় করবে, বছরে ১ কোটি ডলারের বিনিময়ে। ১ কোটি ডলার মানে ৬১ কোটি রুপি বা ৮০ কোটি টাকা। ১০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথের দাম বাংলাদেশের বাজারমূল্য অনুযায়ী প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

৫. সাপ্তাহিক এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিটিসিএলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছি, কেন আমরা ব্যান্ডউইথ ব্যবহার না করে মজুদ রেখে দিয়েছি। উত্তর এসেছে, আরও ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, হবে… অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে…। অবকাঠামো উন্নয়ন হয়ে গেলেই আরও ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি বোগাস কথা। দেশের প্রায় সোয়া তিন কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করে। এছাড়া আরও যারা ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, তারা এখন আরও অধিক পরিমাণ ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করতে পারেন। তাদের ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিন্তু তারা পাচ্ছেন না। অবকাঠামো উন্নয়ন বলতে বিটিসিএল কি বোঝাতে চায়, সেটাই পরিষ্কার নয়। কেবল টানা বা যা কিছুই বেঝাতে চাক না কেন, বাস্তবতা হলো তারা সত্য বা সঠিক কথা বলছেন না। সঠিক তথ্য মানুষকে জানাচ্ছেন না।

৬. টাটার কাছে ব্যান্ডউইথ বিক্রির বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য বিটিসিএলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সাবমেরিন কেবল কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের বৈদেশিক যোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তা শেখ রিয়াজ সাপ্তাহিককে বলেন, ‘আমরা একটা প্রপোজাল ভারত সরকারকে দিয়েছিলাম। তাদের কাছ থেকে এর কোনো জবাব এখনও পাইনি। আমরা কোনো চুক্তির খবর জানি না।’

‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বিএসএনএল ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বিএসসিসিএলের মধ্যে ইতোমধ্যে আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য তারা ই-মেইলের মাধ্যমে দু’দেশের দুটি কোম্পানির সঙ্গেই যোগাযোগ করে কোনো উত্তর পাননি।
ভারতকে যে এ রকম একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, সেটা স্বীকার করছে আমাদের বিএসসিসিএল।

৭. বাংলাদেশ ব্যান্ডউইথ কিনেছে আইডিবির কাছ থেকে লোন নিয়ে। যদি এটা স্বল্প সার্ভিস চার্জের লোন হয় তবে এটার সার্ভিস চার্জ .৭৫% থেকে ১.৭৫%। আর উচ্চ হলে এর সার্ভিস চার্জ হতে পারে ৪% থেকে ৫%। সঠিক সার্ভিস চার্জ এবং লোনের মোট পরিমাণ লেখার শেষ সময় পর্যন্ত জানতে পারিনি। ইআরডি থেকে জানার চেষ্টা করছি। পরিমাণ কমবেশি যাই হোক, সার্ভিস চার্জ কমবেশি যাই হোক- বাংলাদেশের জনগণের জন্য কেনা ব্যান্ডউইথ অব্যবহৃত পড়ে থাকবে কেন? কেন বাংলাদেশের মানুষ তার সুফল পাবে না?

৮. বাংলাদেশের বাজারমূল্যে যার দাম ১০ হাজার কোটি টাকা। ৫ হাজার কোটি টাকা দাম ধার্য করলে বাংলাদেশেরই অনেক প্রতিষ্ঠান এই পরিমাণ ব্যান্ডউইথ কিনবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে যা নিশ্চিত হওয়া গেছে। মাত্র ৮০ কোটি টাকায় কেন সেটা ভারতকে দেয়ার আলোচনা চলছে? কেন সব কিছু এত গোপনে হচ্ছে?

৯. সংবিধান অনুযায়ী দেশের মালিক জনগণ। সাবমেরিন কেবলের মালিকও জনগণ। রাষ্ট্র বা সরকার আছে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে। সেই ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থেকে কেন লুকোচুরি করা হচ্ছে? যদি ভারত বা অন্য কোনো দেশের কাছে ব্যান্ডউইথ বিক্রি বা লিজের উদ্যোগ নেয়া হয়, সেটা প্রকাশ্যে স্বচ্ছভাবে নেয়া হোক। বিক্রি বা লিজ দিলে বাংলাদেশের মানুষের কি লাভ হবে, সেটা জানার অধিকার নিশ্চয়ই জনমানুষের আছে। আর যদি এমন কোনো উদ্যোগ না নেয়া হয়ে থাকে সেটাও পরিষ্কার করা জরুরি। ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’ মানসম্পন্ন একটি পত্রিকা। তারা ভুল বা অসত্য তথ্য দিয়ে রিপোর্ট করেছে বলে মনে হয় না। তারা বলছে টাটা এই ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করবে আসাম ত্রিপুরা… প্রভৃতি রাজ্যগুলোতে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হবে ১০ বা ২০ বছরের জন্য।

১০. জনগণের অর্থে কেনা ব্যান্ডউইথ অব্যবহৃত রেখে কি করে ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কি? যে কারণে বিএনপি সরকার সাবমেরিন কেবলের সংযোগ নেয়নি, বর্তমান সরকারও কি একই রকম নিরাপত্তাজনিত জুজু’র ভয়ে ‘মজুদ তত্ত্বে’ বিশ্বাস করছে? পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে কি কোনো দুষ্টচক্র? জনগণকে বঞ্চিত করে এই চক্র ভোগ করছে বা করতে চাইছে জনসম্পদ?
এ বিষয়ে পরিষ্কার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।

শেয়ার করুন